(হায়দরাবাদে অস্কারের জন্য ছবি বাছাই কমিটির সদস্য ছিলেন ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায়। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের প্রাক্তনী এবং বিশিষ্ট সিনেমোটাগ্রাফার ইন্দ্রনীল, খবর অনলাইনকে জানিয়েছেন নিউটন যে একটি ১০০ শতাংশ মৌলিক সৃষ্টি তা নিয়ে কোন সংশয় থাকা উচিত নয়। দর্শক, পেশাদার এবং জুরি বোর্ডের মেম্বর হিসেবে কেন তিনি ভোট দিলেন নিউটনকে? কেন তিনি মনে করেন এ বছর যে কোনো আর্ন্তজাতিক মঞ্চে ভারতের সেরা বাজি হতে পারে নিউটন, এ নিয়ে আমাদের সঙ্গে তাঁর ভাবনা ভাগ করে নিলেন ইন্দ্রনীল।)

ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায়

বহুদিন পরে একটি ছবি দেখে আমার ঈর্ষা হল। এই ঈর্ষার সংগে অবশ্য কোনো নিরাপত্তাহীনতার বোধ ফাউ হিসেবে আসেনি। কারণ নিউটন দেখে আমার মনে হয়েছিল আহা আমি কেন এমন একটি ছবির সংগে আমি যুক্ত নই? ভালো কাজের সংগে যুক্ত থাকার খিদেটা আমার মধ্যে নতুন করে চাগিয়ে দিল নিউটন। আর একজন পেশাদার হিসেবে নিউটনের পক্ষে ভোট করার জন্য এটাই ছিল আমার প্রাথমিক কারণ। ছবিটি কেন আমার ভাল লেগেছে তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা এখানে করব।

৭-৫ ভোটে কান ঘেঁষে বেরিয়ে নিউটন পাড়ি দিয়েছে অস্কার। সেই যাত্রা আরো কঠিন হবে। প্রতিযোগিতা সেখানে অনেক বেশি, তবে আর্ন্তজাতিক মঞ্চে সফল হতে গেলে নিউটন-ই যে ভারতের সেরা বাজি হতে পারে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কেন? কারণ ছবিটি মৌলিক। হ্যাঁ ছবিটির মৌলিকত্ব নিয়ে আমার মনে কোন সংশয় নেই। বাছাই পর্ব শেষ হয়ে যাওয়ার পর এবং নিউটন অস্কার যাচ্ছে এ কথা ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর যে বিতর্কের জন্ম হল তা আমাদের-ও সংশয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। তবে কী ভুল হল বাছাই? নানান সূত্র থেকে একটি কথা ছড়িয়ে পড়ছিল, ইরানের ছবি ‘সিক্রেট ব্যালট’ অনুসরণে এই ছবি তৈরি হয়েছে। ছবিটি ইউটিউবে আছে, চাইলে দেখতে পারেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রমোদী মাত্রই ইরানের ছবি পছন্দ করেন, কিন্তু আমার সন্দেহ রয়েছে নিউটনের টিম আদৌ ‘সিক্রেট ব্যালট’ দেখেছে কী না। দুটি ছবির আঙ্গিকেই ভোট একটি অন্যতম উপাদান হিসেবে রয়েছে। এছাড়া কোনো মিল আছে বলে আমার মনে হয়নি। আপনারা দুটি ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে নিউটন মিস করবেন না।

বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নিউটন ছবির তিন অভিনেতা ও প্রযোজক

দেহ মনে খাঁটি ভারতীয় নিউটন, যার নায়কের নাম নূতন কুমার। এটা তো মানবেন নুতন হল ইংরেজিতে (NU-TON)। বেশ চমৎকার ভাবনা নয়? তো এই নিউটন ফিজিক্সে এম এস সি করেছে, সরকারি চাকরি পেয়েছে। বাবার ফিউডাল মনোভাবের সঙ্গে একটি মনোগ্রাহী দেশজ দ্বন্দ্ব দিয়ে নিউটনের চলচ্চিত্র অভিযান শুরু। সে সত্যি নতুন করে ভাবতে চায়। এই ভাবনা গতি পায় ইলেকশন ডিউটির ইনডাকশন মিটিং-এ। কর্মশালা পরিচালনা করতে আসা সাধারণ ক্লার্ক বংশীলাল তাঁকে বলেন প্রকৃতির নিয়ম সবার জন্য সমান। এই সাম্যের ধারণাকে সঙ্গী করেই দর্শক এবং নিউটন প্রবেশ করেন কথনের পরবর্তী পর্যায়। গল্প কথনের যে ভারতীয় ঐতিহ্য রয়েছে সেই ঘরানার একটি চিত্রনাট্য তৈরি হল অনেক দিন পরে। কিন্তু উপস্থাপনা ভীষণভাবে আধুনিক। যে বিষয় ও প্রশ্নগুলি সাধারণত এড়িয়ে যাওয়া হয় চলচ্চিত্র এবং ইলেক্টরাল পলিটিক্সে, সেগুলি ভীষণ শৈল্পিক ভাবে সাজিয়েছেন পরিচালক। আবারো বলছি এ গল্পের আত্মা ভারতীয়, ইরানের নয়। এ গল্পের চরিত্র ও প্রশ্নেরা ভারতীয়।

নকশাল অধ্যুষিত এলাকা। মাটির তলায় রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার, সেখানে উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে কোন এক অজানা অচেনা রিমোট কন্ট্রোলে, এলাকার আদিবাসীরা জানেন না মতদানের তাৎপর্য – একথা বলা হয়ে গেল কত সহজ, অনাড়ম্বর অথচ চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে। আশ্চর্য ছবির ছন্দ। চিত্রনাট্যের সঙ্গে সংগত করেছে এডিটিং এবং সিনেমাটোগ্রাফি। নিস্তব্ধ জঙ্গলের ভিতর কোনো আবহ সঙ্গীত নেই। অল্প শব্দ হলে চমকে উঠতে হয়, কী জানি কখন কী হয়। কিন্তু কিছুই হয়নি শেষ পর্যন্ত। আমরা হামলার ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকি, কিন্তু সে সব কিছুই হয় না। কারণ রাষ্ট্র বনাম মাওবাদীদের গল্প নয় নিউটন। গণতন্ত্রকে আগলে রাখার চেষ্টায় প্রায় ‘মেন্টাল’ হয়ে যাওয়া নিউটনকুমারের ঘাড় বেঁকে যায় শেষ দৃশ্যে। আমরা জানতে পারি ইভিএম মেশিন আগলে মাইন পাতা জঙ্গলে পাগলের মত দৌড়নোর জন্য নয়, তিনি পুরষ্কার পেয়েছেন রোজ নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময় অফিসে আসার জন্য। নিউটন কী তবে তাতেই খুশি হয়ে গেল? পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র কী নিউটনের ঘাড় বেঁকিয়ে ফেলতে পারল শেষ পর্যন্ত, না কি সে ফের প্রশ্ন করে উঠবে নতুন করে, কোনো এক নতুন ভোরে? এই সাসপেন্স বজায় রেখে ছবি শেষ হয়। অনবদ্য শেষ দৃশ্য, পুরো ছবির মতই মেদ বর্জিত। কোথাও এতটুকু বাদ দেওয়ার অবকাশ নেই। টানটান চিত্রনাট্যে রয়েছে ‘brevity of expression’ no ‘slogan mongering’.

ছবির প্রথমে ছত্তিশগড় এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কিছু তথ্য দেওয়া হয়, শেষের দিকে উন্নয়ন-এগিয়ে চলার প্রতীক হিসেবে কিছু ছবি দেখানো হয়েছে। ভালো করে ভোট হল না, উন্নয়ন হয়ে গেল। শুধু এই আভাস দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন পরিচালক। এ ক্ষেত্রে কী আরো একটু বিস্তারিত যাওয়া যেত? যে দর্শক উন্নয়ন সংক্রান্ত তর্ক ও বিকল্প ভাবনাগুলি সম্পর্কে সম্যক অবহিত নন, তাঁর জন্য আরো কিছুটা গভীরে হয়ত যাওয়া যেত। ছবির দুর্বলতা বলতে আমার এটুকুই মনে হচ্ছে। তবে পরিচালক হয়তো সচেতনভাবেই সেখানে ঢোকেননি। ছবিতে কোথাও কোন হিংসাদৃশ্য নেই। সেনা অফিসার পঙ্কজ ত্রিপাঠির পরিবার নিয়ে বাজার করার দৃশ্য, হিন্দির এম এ রঘুবীর যাদবের ইংরেজি ছবি ও জম্বি নিয়ে অবসেশন, উত্তর পূর্ব ভারতের সেনা কর্মী কৃষ্ণার ঠান্ডা বিনীত কথা বলার ভঙ্গিতে ধরা থাকল ভারতবর্ষ। মানুষের মুখ, দেশের মুখ। ইরান নয়, ভারত। শুধুমাত্র অসাধারণ চরিত্রায়ণের জন্য স্টান্ডিং ওভেশন পাবেন পরিচালক।

আরও পড়ুন: সাত বাংলা ছবির গর্জন পেরিয়ে পুজোয় বাঙালির দণ্ডকারণ্য যাত্রা নিশ্চিত করল নিউটন

সব শেষে মালকো। আদিবাসী, লোকাল ভোটকর্মী। ভোর সাড়ে পাঁচটায় প্রায়ন্ধকার বনপথে কীভাবে তিনি পৌঁছলেন ডিউটিতে রিপোর্ট করতে, কে জানে? মালকো মেয়ে। তিনি লোকাল, তাই বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পড়লেন না। জোর করে ভোট করানো হয়েছে এই অভিমানে মাংস ভাত খেলেন না। তবু তিনি কিন্ত টিমের অংশ হয়ে উঠলেন ধীরে ধীরে। একরাশ অভিমান নিয়ে হয়তো। ম্যাডাম কিন্তু শেষমেশ টিমের অপরিহার্য অংশ। অন্তত ছবি দেখে আমরা তাই বুঝলাম। অসাধারণ অভিনয় করেছেন প্রত্যেকে। মালকোর চোখ এবং হৃদয় কিন্তু ভূমিকন্যার, আদিবাসী নারীর। তাই ‘সিক্রেট ব্যালট’ আর ‘নিউটন’ কখনই এক হতে পারে না।

নিউটন ছবির পরিচালক অমিত মাসুরকর

আগেই বলেছি ছবির শেষটি খুবই সুচারু মনে হয়েছে আমার। মালকো আসেন নিউটনের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁদের সম্পর্ক কী এরপর নতুন মাত্রা পাবে? নাকি তাঁরা নতুন করে সন্ধান করবেন গণতন্ত্রের শিকড়? তা নিয়ে প্রশ্ন রেখে দিয়েই শেষ হল ছবি। তবে এ ছবির ভোট-ভাগ্য ভাল, গণতন্ত্রের নিয়ম মেনে সংখ্যাগরিষ্ট ভোটে জিতে গেল। আর পিছু নিল বিতর্ক।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন