ট্রেনে সামনে বসা সাদা যাত্রী গাল পাড়ে, হাড় কেঁপে ওঠে বই-কি !

0
538

nishan-chatterjee_editedনিশান চট্টোপাধ্যায়

নিউ ইয়র্কে যখন প্রথম আসি সালটা তখন ২০১০। ডেনমার্কের গভীর একাকিত্ব ছেড়ে এ শহর নিতান্ত মন্দ ছিল না। বিমানবন্দরের সহাস্য শিখ ট্যাক্সিওলা বাড়ি পৌঁছে দিয়ে দাড়ির ফাঁকে হেসে বললেন, “ওয়েলকাম টু নিউ ইয়র্ক”। এ জিনিস ইউরোপে দুর্লভ।

জীবনে এতদিন এক শহরে থাকার অভিজ্ঞতাও আমার এই প্রথম। আতঙ্কে ছিলাম, হাজারটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছিল, মনে হত প্রতি মুহূর্তে ‘এ আমার নয়, এ বড়ো অচেনা, এ বড়ো পর’। বাড়িওলা রাশিয়ান, তার বৌ থাই, আমি ভারতীয়। ডেনমার্কের অভিজ্ঞতা আমাকে বলেছিল, সব চেয়ে বেশি সমস্যা হবে রান্নার গন্ধ নিয়ে, কিন্তু এখানেও চমক। আমার খাবারের গন্ধে তাদের অসুবিধা তো হতই না, প্রকারান্তরে আমার একা লাগলে আমাকে নিয়ে রেস্তোরাঁ যাওয়া হত, দোকান-বাজারের জন্য গাড়ি লাগেনি, কারণ তারাই আমাকে নিয়ে যেত, বাইরে ঘুরতে গেলে আমার জন্য কিছু না কিছু উপহার আসত, রান্না করতে ভুলে গেলে ফ্রিজে খাবার রাখা থাকত।

বাইরে, আমেরিকার আর দশটা জায়গার মতো কথা বললেই ‘সে ইট এগেন’ ধেয়ে আসে না এবং শহরের মূল মন্ত্র ‘নো ওয়ান কেয়ারস’ (আদত কথাটা শুনতে আরও খারাপ, বাঙালির জন্য সমীচিন নয়।)

জ্যাকসন হাইট বাংলা বিজ্ঞাপনে উজ্জ্বল, তার দু’ পা দূরে চিনেপাড়া, তার গায়ে গা লাগিয়ে ‘মুক্ত তিব্বত’ দাবি, তার পাশে কোরিয়ান ‘চু তে’ চার্চ। আছে কিন্তু সবাই। ‘সাবান দিমু ডইলা’র সুরে এলভিস মিশে যাচ্ছে কফির পরতে পরতে ক্রিমের মতো। যাচ্ছে কিন্তু ঠিকই। হয়তো আলাদা করা যাচ্ছে না, কিন্তু আছে।

এ রকম ভাবেই গ্রীষ্ম বর্ষা শীত পেরোতে পেরোতে কখন আমিও শহরের অংশ হয়ে গেছি সেটা বুঝে উঠতে পারিনি। ঠিক যেমন ভাবে বোঝা যায় না ঘুম থেকে ওঠার স্পষ্ট মুহূর্ত, কিংবা ঠিক কখন শরতের শেষে শীত শুরু হল। আবিষ্কার করলাম, শহরের নিজস্ব কোনো ভাষা নেই, ভাষ্য যদিও আছে। ফ্লাশিঙের অন্তর্লীন ভাষা চৈনিক, করোনা’র স্প্যানিশ, জ্যাকসন হাইটের বাংলা, স-অ-ব মিলিয়েই শহর। ইংরাজিরও কোনো বাঁধা বুলি নেই, ব্রিটিশ কৌলিন্য ছেড়ে সে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে নিয়েছে নিজের আঙ্গিক।— আমার শহর!!

নিউ ইয়র্কের সমস্যা হল বাড়িভাড়া। ভাড়া বাড়ছে বাড়ছে, কোনো দিন আকাশ ছোঁবে নিশ্চয়ই, তার পরের দিন আকাশও লজ্জা পাবে! লোকজনের মাইনে নেই, থাকার জায়গা নেই, মোড়ে মোড়ে দৈন্য। মোড়ে মোড়ে গৃহহীন লোকজন। দারিদ্রের আরও প্রকট রূপ ল্যাটিন পাড়ায়, কালো পাড়ায়। যারা বাইরে থেকে আসছে তারা বাধ্য হচ্ছে সেখানে থাকতে কারণ ভাড়া কম, অতএব কালের নিয়মে ভাড়া বাড়ছে সেখানেও, এবং আদি বাসিন্দা অনেকেই উঠে যেতে বাধ্য হচ্ছে। নিউ ইয়র্কে ব্যাপারটা প্রকট হলেও বাকি দেশে একই সমস্যা চলছে অনেক দিন ধরেই।

৭০-এর দশকের আগে বাজারের বাঁধা বুলি ছিল, আমেরিকা দেখিয়ে দিয়েছে পুঁজিবাদই আসল পথ! মাও মাকু দূরে হটো, হাম হোঙ্গে কামিয়াব। পশ্চিমবাংলার পাড়াতে অবধি সায়েবি দাদারা দামি চশমার কোণ ঘেঁষে অপাঙ্গে দৃকপাত করে মুচকি হেসে বলতেন, “কি দিল তো দেখিয়ে?” গভীর দুঃখের বিষয়, সে দেখা আর দেখা হয়ে উঠল না। মার্কিন স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে ক্ষণজীবি ফানুসের মতো পুটুস করে নিভে গেল। তা হলে হল কি ঠিক?

highlight১৯৭০-এর পর থেকেই আমেরিকায় আসল মাইনে (মূল্যবৃদ্ধি হিসেব করে) আর বাড়েনি। কম বেড়েছে নয়, বৃদ্ধির হার কমে গেছে তা-ও নয়, স্রেফ বাড়েনি। অথচ সবাই জানত, আমেরিকা মানে, খাটো, ফল পাবে, তোমার চেয়ে তোমার ছেলে ভালো থাকবে, তার ছেলে আবার তার থেকেও ভালো থাকবে।

হয়নি!

প্রকারান্তরে সোভিয়েত ভিলেনের দরুণ বাম মাত্রেই ‘কমি’ এবং ‘কমি’ মাত্রেই রাশিয়ান চর ধরে নিয়ে সামাজিক আন্দোলনের সমস্ত অভিমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অজস্র কোম্পানি কর্মী-সংগঠন বেআইনি ঘোষণা করে এবং প্রচার চালাতে থাকে কেন সংগঠন উন্নয়ন-পরিপন্থী?

ফলত, যখন হাজারটা ব্যবসা এখন থেকে পাততাড়ি গোটাতে শুরু করে, তাকে রোখার কোনো ক্ষমতা মানুষের ছিল না! একটা গোটা দেশের জনতা ‘ওয়ার্কার’ থেকে ‘কনজিউমার’ হয়ে গেল। তাদের জামা হয় চিনে, ড্রেনের ঢাকনা আসে ভারত থেকে! তারা শুধু কেনে, কেনে এবং কেনে। ইহাই বর্তমান আমেরিকার মূলমন্ত্র! কিন্তু কিনতে গেলেও পয়সা লাগে, বাজারে চাকরি যখন নেই, তখন কিনবে কী করে? ধার নিয়ে অবশ্যই! প্রশ্ন হল, ধার শোধ হবে কী করে? সেখান থেকেই আসছে ২০০৮ এর মন্দা! যাই হোক সেটা নিয়ে লিখছি না আমি, সেটা নিয়ে পরে কোনো সময় বলা যেতে পারে।

এটুকু বোঝাই যথেষ্ট যে মানুষ সমস্যায় আছে. তারা জানে না সমস্যার উৎস কী। দিনগত পাপক্ষয়ের এবং নিজস্ব সমস্যায় তার বোঝার সময়টুকুও নেই! বাপ‌-দাদাকে দেখে সে জেনেছিল লেখাপড়া না করলেও চাকরি পাওয়া যায়, বাঁচা যায়, কিন্তু এখন আর যাচ্ছে না! কয়লাখনি বন্ধ, নতুন চাকরির কাজ করে দিচ্ছে সস্তার বেআইনি অভিবাসী, পড়ানোর চাকরির কেবল ১৭% বার্ষিক ঠিকের ভিত্তিতে চলে না! সব মিলিয়েই একটা ঘেঁটে ঘ দশা!

এখন, মানুষের নিজস্ব কিছু মানসিক ব্যাপার আছে, প্রথমত তার কৌতূহল অসীম, দ্বিতীয়ত সে সব কিছুর ব্যাখ্যা করতে চায়। এই দুইয়ের সমাধান জ্ঞানলাভ। জ্ঞানলাভের দু’টি উপায়, প্রত্যক্ষ ও পরের মুখে ঝাল খাওয়া। এবং শেষে যুক্তির উপর যুক্তি সাজিয়ে প্রমাণ! কৌতূহল নিরসন!

(আমরা, যারা অঙ্ক/দর্শন নিয়ে কাজ করি, তারা জানি যুক্তি জিনিসটা ঠিক অতটাও সহজ না! অপপ্রয়োগ অতি সহজ, এবং সামাজিক হারে হতে শুরু করলে অবশ্যম্ভাবী। )

এ ক্ষেত্রে মানুষের সমস্যাগুলো বাস্তব। তার ভাবার, পড়ার, বোঝার সময় নেই, তার বোধ তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক শিক্ষাব্যবস্থায়, যে ব্যবস্থা তাকে ২১ বছর বয়সেও ভগ্নাংশের যোগ করতে শেখায়নি। অতএব তার প্রত্যক্ষের দৌড় বেশি নয়। তা হলে, জ্ঞানলাভের উপায় কি?

যা ব্বাবা? টিভি ও গুণীজনের বাণী! গুণীজন কে?

যে সমাজের প্রকৃত ঈশ্বর টাকা (এক ইঞ্চিও বাড়িয়ে বলা নয়), সেখানে গুণীজন কারা বোঝাটা কি মুশকিল?

তার উপর দেশ জুড়ে কিলবিল করছে অচেনা লোকজন, তাদের ভাষা বুঝি না, তাদের খাবারের গন্ধ ভালো না, তাদের দেখতে কেমন যেন….. আর এই শালারা আসার পর থেকেই চাকরি কমে যাচ্ছে।..শালারা জিনিস বানিয়ে বেচবে আমাদের, আবার আমাদের বুকের উপর বসে খাবে — এই মত গুণীজনের মতের সমান্তরাল, অতএব ৩০ বছরের লালিত সমস্যা ঝেড়ে ফেলো এদের উপর (সমাধান তো হবেই না, সমস্যা বাড়বে সম্ভবত, সময় ভালো নয়)। তা ছাড়া সাদা হাজারটা লোকের মধ্যে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের বীজ সুপ্ত ছিল অনেক দিন, বাকিরা একই নিয়ম মেনে সাদাদের চেয়ে সামান্য কালো দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে, অবদমিত মানুষ একজোট হওয়ার বদলে পারস্পরিক খেয়োখেয়ি বেড়ে চলেছে।

highlightকানসাসে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার মারা গেলেন গুলিতে, কেন্টে শিখ ভদ্রলোক গুলি খেলেন (৯/১১ র সময়ও এর ব্যত্যয় হয়নি), আরো আরো… চলতেই থাকবে।… মানুষের বোধহয় ঘৃণা ও কৌতূহল দুই-ই অসীম।

আমাকে আগে হাজারটা লোক মেক্সিকান বলে ভুল করত। সেই মেক্সিকান, যারা শহরকে সচল রাখে অল্প পয়সায় কাজ করে, লাইন দেয় খাবারের ট্রাকের পেছনে, একটা ঘরে দশটা পরিবার নিয়ে থাকে! সাথে উদ্দাম আনন্দ, আর মায়াময় ভাষা। আমার মজাই লাগত!

আজকাল লাগে না. দু’দিন ট্রেনে দেখেছি সাদা লোক উলটো দিকে বসে ‘Another fucking mexican…get out of our country’ বলে গেছে। আরেক দিন এক মধ্যবয়স্ক মহিলা বাদামি সবার জাত তুলে গাল দিয়ে শেষপাতে বললেন, “mexican, I am watching you, mama is watching you, I am gonna slash your face with my knife, right here”, হাড় অল্প কেঁপে ওঠে বই-কি।

বছরখানেক আগে এ রকমই এক সকালে এক লাতিন মহিলা একজন বাঙালিকে ফেলে দিয়েছিলেন ৭ নম্বর ট্রেনের সামনে, ভদ্রলোক কুচি কুচি হয়ে গেছিলেন। উন্মাদ সেই মহিলা জানান, তিনি দেশকে হিন্দু ও মুসলিম মুক্ত করতে চান! সেই সকালে সুনন্দবাবু কি ভাবছিলেন জানি না! প্রেসে যাওয়ার অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যস্ততার মধ্যে বাদামি না-হওয়াটা খেয়াল ছিল না হয়তো! সে সময় এটা ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু এ ভাবেই বোধহয় শুরু হয়…।

আমি আজকাল আর ট্রেন দেখার জন্য ঝুঁকি না, পেছনে অন্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে দেখলেই আরও পেছনে সরে যাই, তর্কে যাই না, লোকজন পকেট হাতড়ালেই দৌড়োনোর জন্যে তৈরি থাকি।…. গোটা দেশ জুড়ে ঘৃণা বেড়ে উঠছে। .. আর আমার শহর কী রকম ববদলে যাচ্ছে।.. চোখ চলে না, বিষের কুয়াশায় রাস্তার আলোগুলোও ঝাপসা হয়ে আসে… আমার শহর বোধহয় আর আমার রইল না।

বাকি সব জায়গা নিয়ে আমার যে ভাবার সময় নেই!

(লেখক নিউইয়র্কের বারুখ কলেজের অঙ্কের শিক্ষক)

 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here