left won in kerala
কেরলে বামেদের জয়। ছবি সৌজন্যে দ্য নিউজ মিনিট।
debarun roy
দেবারুণ রায়

শবরীর প্রতীক্ষা সাঙ্গ হল। কেরলের গ্রাম-শহরের স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থাগুলোর নির্বাচনে পাওয়া জনাদেশ খারিজ করল ধর্মান্ধতার রাজনীতি। সেই সঙ্গে আরও একবার প্রমাণ হল, কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ ও সুবিধাবাদী লাইনে মানুষের আস্থা নেই। গো বলয়ের রাজনীতিতে দড় ভাজপা যে কেরলের মানুষের মন বুঝতে ভুল করেছে তা-ও প্রমাণিত হল। সবরিমালা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পাশ কাটিয়ে ধুরন্ধর নামে খ‍্যাত বিজেপির সভাপতি অমিত বিক্রমে অযোধ্যা স্টাইলে আয়াপ্পানের বিগ্রহকে সামনে রেখে আঠারো শতকের ঠুলি পরাতে চেয়েছিলেন কেরলের ধর্মবিশ্বাসী মানুষের চোখে। কিন্তু সাক্ষরতায় একশো শতাংশের রাজ্য তাতে নারাজ। গণ্ডগ্রাম থেকে আধা শহর মফস্‌সলও বুঝিয়ে দিয়েছে, রামলালাকে নিয়ে অযোধ্যায় যা হয়েছে, যুবক বিগ্রহকে নিয়ে কেরলে তা হওয়ার নয়। তা ছাড়া ধর্মের অনুষঙ্গ মন্দিরের চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ। রাজনীতির আঙিনায় নয়।

আরও পড়ুন কেরলে শবরীর প্রতীক্ষা বিজেপির, হিন্দু ভোট সিপিএমের কবজায়

পঞ্চায়েত ও পুর‌সভা মিলিয়ে নানা স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার ৩৯ আসনের  উপনির্বাচনে ২১টিতে জয়ী সিপিএম ও বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা। বিন্দুমাত্র ধোঁয়াশা না রেখে গ্রাম শহরের ভোটাররা কংগ্রেসের ঝুলিতে দিয়েছে ১১টি আসন। এবং এই ভোট শুধু একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়, গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হয়েছে। ফলে উঠে এসেছে গোটা রাজ্যের মনোভাব। পঞ্চায়েত, পুরসভা বলে এই ভোটের ফল কখনোই উড়িয়ে দেওয়ার নয়। চলতি সরকারের নানা অবস্থান, বিশেষ করে সবরিমালা নিয়ে কোর্টের রায় অনুযায়ী প্রশাসনিক পদক্ষেপ করার মতো ঝুঁকি ইত্যাদির দরুণ বিতর্ক বড়ো আকার নেয়। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে অনেকেই রায় দেন। তৎসত্ত্বেও সিদ্ধান্তে অটল ছিল কেরল সরকার। এ ছাড়া বামমোর্চার ভেতরের টানাপোড়েনও ছিল সমর্থনভূমি ধসে যাওয়ার সংকেতে ঠাসা। এর পাশাপাশি বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ভোটে জেতার কোনো রাস্তাই ছাড়েননি। এ সব কারণেই কেরলের এই নগণ্য নির্বাচনও অর্থবহ।

আরও পড়ুন মায়াজাল চন্দ্রবাবুর : সায় মমতার, জোটে এ বার মায়াবতী?

এই নির্বাচনে রাজনীতি তো ছিলই।রাজনৈতিক ইস‍্যূর পাশাপাশি ছিল জোরালো সামাজিক বার্তা। রজঃস্বলা রমণীদের প্রবেশ  নিষিদ্ধ রেখে কিছু বছর আগে মন্দির কর্তৃপক্ষ যে ফরমান জারি করেছিল, সেটাই হয়ে গিয়েছে দেবতার সিলমোহর। সুপ্রিম কোর্টের রায় এই ধর্মান্ধতার অন্ধকারে নবজাগরণ আনে। এবং বাম সরকারের ভেতরে কারও কারও ভিন্নমত থাকলেও সিপিএমের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোর্টের রায় মেনে চলার নির্দেশ দেন মুখ‍্যমন্ত্রীকে। এবং বিজেপির পর কংগ্রেসও রক্ষণশীলদের কাছে মাথা নোয়ানোর পর সিপিএম নেতৃত্ত্ব কোণঠাসা হয়ে পড়লেও এই প্রগতিশীল সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। ফলে প্রমাণিত হয়, অনৈতিক পুরুষতান্ত্রিক প্রথার পেছনে কায়েমি স্বার্থকে সংবিধান ও আইনের শাসনই ধ্বংস করতে পারে। এবং আদালত ও সরকার এমন পদক্ষেপ করলে মানুষ তাকে স্বাগত জানায়। অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণে সাধারণের সায় থাকে না। যে কায়েমি স্বার্থের প্রশ্রয়ে এই ধরনের অন্ধত্ব কায়েম থাকে তার সঙ্গে সমাজের গরিষ্ঠ অংশের বা নিরন্ন, শিক্ষায় বঞ্চিত মানুষের  সম্পর্ক কম। সমাজের ওপর তলাতেই যে তাদের টিকি বাঁধা। এর প্রমাণ দিতেই অমিত শাহ সবরিমালা নিয়ে তথাকথিত আস্থার দোহাই পাড়েন এবং কংগ্রেসের প্রদেশ নেতৃত্বও পিছু হঠেন।

আরও পড়ুন অযোধ্যার কোলাহল থেকে দূরে নীরবে একাকি আডবাণী

অথচ হিন্দুত্ববাদীদের অযোধ্যা আন্দোলন নিয়ে কালে কালে উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেস নেতৃত্বের সমঝোতা ও সমর্পণের মনোভাব সব সময়ই জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ক্ষতি করেছে। পাশাপাশি পল্লবিত হয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি। স্বাধীনতার পরপর তৎকালীন হিন্দু মহাসভার বাবরি মসজিদ কেন্দ্রিক জিগিরের চাপে পড়ে মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থ ওই বিতর্কিত ইমারতের ভেতর রামলালার মূর্তি রাখেন। এ খবর শুনে রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে পন্থকে চিঠি লিখে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এ কাজের নিন্দা করেন এবং ভুল শোধরাতে বলেন। কিন্তু পন্থ জানান, নান‍্যপন্থা। আর ওই মূর্তি সরানো যাবে না। ওটা তো এখন মন্দির। নেহরুর ভবিষ্যদ্বাণী ফলেছিল। কিন্ত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে যেতে যেতে উত্তরপ্রদেশে এখন আঞ্চলিকদের কৃপাপ্রার্থী কংগ্রেস। দীর্ঘদিন রাজত্ব চালালেও শেষ পর্যন্ত সব চেয়ে বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পরেও রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ রাজীব গান্ধী চরম ভুল পদক্ষেপ করলেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের রাম মন্দিরের শিলান‍্যাস সমর্থন করলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটা সিংকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠালেন অযোধ্যায়। এবং তার পরের নির্বাচনে প্রচার শুরু করলেন অযোধ্যা থেকে।

পরের পর সমঝোতা ও হিন্দুত্বের প্রতি আত্মসমর্পণ কংগ্রেসের সমর্থন ভূমিতে ধস নামাতে থাকে। এই নীতির ইতি হয় বাবরি মসজিদ ধংসের ভয়ংকর ঘটনায়। প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিংহ রাওয়ের নির্দেশ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় বাহিনী নীরব নিষ্ক্রিয় থাকে আগাগোড়া। তাদের চোখের সামনেই ভেঙে পড়ে সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক ইমারত। এবং একই সঙ্গে ইলাহাবাদের আনন্দভবনের ঐতিহ‍্যবিস্মৃত উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেসি দুর্গ। ঐতিহাসিক ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে কংগ্রেস হাইকম‍্যান্ড। কিন্তু রাজ‍্যে রাজ‍্যে নেতৃত্ব এখনও সেই তিমিরে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here