chandi lahiri cartoonist
pankaj chattapadhyay
পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

ক্যালকাটা জার্নালিস্টস ক্লাবের ‘সাংবাদিক’ পত্রিকায় কার্টুন নিয়ে একটি লেখার জন্য কিছু রসদের দরকার ছিল। তারই সন্ধানে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। সেই সুবাদে বেশ কয়েক বার খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম মানুষটিকে। বিখ্যাত কার্টুনিস্টকে চিনতেন বহু মানুষ, কিন্তু মানুষ চণ্ডী লাহিড়ীকে ক’জন চিনতেন?

পাইকপাড়ায় আশুবাবুর বাজারের কাছে তাঁর বাড়ি। হাজির হয়েছিলাম ২০১৬-এর গ্রীষ্মের এক দুপুরে।  আমি অতি অতি সাধারণ এক মানুষ প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলাম কিংবদন্তি শিল্পীর। আমি দেখছি চণ্ডী লাহিড়ীকে অবাক চোখে, আমার দৃষ্টিতে রয়েছে শ্রদ্ধা। তিনি দেখছেন আমাকে, নিরহঙ্কার, অমায়িক মুখে লেগে আছে একাত্মতার এক চিলতে হাসি। আলাপচারিতার মাঝে কখন যে তিনি কাকু হয়ে গিয়েছেন! আর তাঁর জীবনের সহযাত্রিণী হয়ে গিয়েছেন কাকিমা।

সে দিন দরজা খুলে দিয়েছিলেন শুভ্রকুন্তলা কাকিমাই – তপতী লাহিড়ী, হাসিমুখে।

সে দিন চণ্ডীকাকু অনেক কিছু শুনিয়েছিলেন, শুনিয়েছিলেন কার্টুনের ইতিহাস, বিশ্বের এবং বাংলার। তিনি শুধু বলছিলেন না, যেন ছবি আঁকছিলেন। আর আমি শুধু বিমুগ্ধ শ্রোতা নই, দর্শকও।

চণ্ডীকাকু বলছিলেন, তিনি ইতিহাস লিখতে চাননি। নিজের মতো করে সংবাদকে ভেবেছেন। তার ওপর কার্টুন এঁকে আমাদের দেখিয়েছেন, ভাবিয়েছেন। তাঁর দেখা এবং দেখানো ভিন্ন গোত্রের। আমাদের সঙ্গে হয়তো মেলে না। তিনি বলেছেন, কার্টুন ঘটনার নথি বানায়, অবলা কথাকে বলে দেয়।

কথায় কথায় আলাপচারিতা অনেক দূর গড়িয়ে গেল। কাকিমা এলেন ঠান্ডা সরবতের গেলাস হাতে। নিজেও এক জন গুণী শিল্পী। এ যুগে এমন আতিথেয়তা পাওয়া যায়? “হ্যাঁ, পাওয়া যায় চণ্ডী লাহিড়ীর ঠিকানায়” – চণ্ডীকাকু বলেছিলেন। একটু থেমে বলেছিলেন, “কেন বল তো”? আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, এটা যে চণ্ডীমণ্ডপ। শুনে সে দিন কাকু-কাকিমা খুব হেসে উঠেছিলেন। মানুষটি শিল্পী হিসাবে অনেক অনেক বড়ো, আর মানুষ হিসাবে ছিলেন আকাশের মতো।

চণ্ডী লাহিড়ীর কথায়, ক্ষমতাসীনরা বেশির ভাগ সময়েই কার্টুন পছন্দ করে না। কারণ কার্টুন তাদের সমালোচনা করে। আর ক্ষমতাসীনরা সমালোচনা সহ্য করে না। ক্ষমতাসীন মানে সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান, নির্বাচিত প্রতিনিধি, মন্ত্রী, দলনেতা, রাজা।

তিনি যেমন বলেছেন তাঁর ‘কার্টুনের ইতিবৃত্ত’ বইয়ের ভূমিকায়— “যুগোত্তীর্ণ সব কার্টুনেই আছে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ভোরের পূরবী নয়। মেঘ গর্জনের সমতালে দীপক রাগিণী।”  তাঁর স্পষ্ট কথা, কার্টুনচিত্রীর পেশাটি রাজনীতির লোকেদের খুশি করতে পারে না।

তবে ব্যতিক্রম কি হয় না? তারও কাহিনি শুনিয়েছিলেন চণ্ডীকাকু।

তখনও অফিসে। রাত আটটা। চণ্ডী লাহিড়ী কার্টুন আঁকতে মগ্ন। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। চণ্ডীবাবু ফোন ধরতেই গুরুগম্ভীর কণ্ঠে একজন বললেন, “অজিত আছে?” চণ্ডীবাবু – “না, কিছু বলতে হবে?” সেই কণ্ঠ – “সকালে অজিতকে যে ওষুধটা দিয়েছিলাম ওটা না নিয়ে একটা নাম বলছি, লিখে নাও।”

চণ্ডী লাহিড়ী কিন্তু রেগে গেছেন ততক্ষণে। তাঁকে ‘তুমি’ করে ফোনের ওপার থেকে কথা বলা! যাক গে! পেন কাগজ নিয়ে বললেন, “বলুন ওষুধের নাম।” ওপার থেকে তিনি ওষুধের নাম বলে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার নাম কী?” “নাম জেনে কী হবে? আপনার কাজ মিটেছে?” “হ্যাঁ, তা মিটেছে। না, মানে জানতে চাইছিলাম গতকালের কাগজে সিএম-কে নিয়ে ছবিটা কে করেছিল তোমার কি জানা আছে? খুব ভালো হয়েছে। আমার খুব ভালো লেগেছে।”

“শুনুন মশাই, কার্টুনিস্টরাও বড়ো শিল্পী। শিল্পী তার কাজ করে যায়, তাতে কার পছন্দ হল কি হল না, তাতে তার কিছু যায় আসে না।” এই বলে ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখলেন চণ্ডী লাহিড়ী। একটু পরে অজিতবাবু এসে সব শুনে মাথায় হাত – “আরে করেছ কী চণ্ডী? আরে উনিই তো সিএম, মানে বিধানচন্দ্র রায়।”

চণ্ডীকাকু বলছিলেন। আমি আর কাকিমা শ্রোতা। শেষে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “ডাঃ রায়ের সঙ্গে পরে দেখা হয়েছিল?” “বার তিনেক” – একটু থেমে চণ্ডীকাকু বললেন, “উনি আমার কী নাম দিয়েছিলেন, জানো? Chandelier (শ্যান্ডেলিয়ার)। এই ইংরিজি শব্দটার মানে হল অনেকানেক উজ্জ্বল আলোর শাখা-প্রশাখা সঙ্গে নিয়ে এক বিরাট আলোকস্তম্ভ।”

আজ মনে হচ্ছে, এত বড়ো সত্যি অভিধা তাঁর ক্ষেত্রে আর বোধহয় হয় না। আজকের কাজ করে যাওয়া শিল্পীদের কাছে অকুতোভয়, নির্ভীক চণ্ডী লাহিড়ীর আরেক নাম Chandelier, আমার মতো অতি অতি সাধারণের চণ্ডীমণ্ডপ।

আজ এই দিনে রইল শুধু নীরবতায় নিবিড় শ্রদ্ধা। আর কাকিমা ও ক্যানসারের সঙ্গে লড়াকু তৃণার জন্য রইল সহানুভূতি।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here