nirupam sen
debarun roy
দেবারুণ রায়

বর্ধমানের নেতা নিরুপম ছিলেন সিপিএমেই সমান্তরাল ধারার প্রবক্তা। কৃষক আন্দোলনের যে ধারা অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সিপিএমে এসে থিতু হয়েছিল তার ভগীরথ যদি হয়ে থাকেন হরেকৃষ্ণ কোঙার, নতুন প্রজন্মে ভাঙন রোখার পাশাপাশি সেই ধারাকে সংহত করার প্রযুক্তিবিদ হয়ে উঠেছিলেন নিরুপম সেন। কোনো ভাবেই এই দুই ব্যক্তিত্ব ও পটভূমির তুলনা চলে না। কিন্তু বাংলার কৃষক সংগঠনের রেজিমেন্টেড সৈনিক তৈরির পাঠশালাতেও দুই যুগের মধ‍্যে দুস্তর ফারাক। যে যুগে যেমন কর্মী মেলে সেই অনুযায়ীই দল ও সংগঠন চালায় সব পার্টিই। চল্লিশ-পঞ্চাশের মতো স্টলওয়ার্টরা তখনই বিরল প্রজাতি। তখন কোঙার তো বটেই মনসুর হবিবুল্লাহ বা বিনয় চৌধুরীরাও অমিল।

আরও পড়ুন ওঁকে আর কারও সঙ্গে মেলাতে পারিনি

ষাটের শেষে দলে শামিল হলেও সত্তরের সংকটকালেই জেলার আলোকবৃত্তে আসেন নিরুপম। সমকালীনদের মধ্যে নেতৃত্বের সব চেয়ে বেশি নীলনয়ন বালক। ফার্স্ট আ্যমং ইকুয়ালস। অবশ্যই জেলার পরিসরে। সংগঠক থেকে ক্রমশ তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন পার্টির ইচ্ছায়। জেলা সম্পাদক ও রাজ‍্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হওয়ার সময় থেকেই উত্তরণ তাঁর অনুসারী, তিনি উত্তরণের নন। ওঁর নিষ্ঠা ও অধ‍্যবসায় তো ছিলই। সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল পলিটিক্যাল আ্যকুমেন, যা সবকালেই সবার হয়ে ওঠেনি। এই রাজনৈতিক কুশলতাই নিরুপম করে তুলেছিল বর্ধমানের সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা একজন সিপিএম কর্মীকে। জেলা মানে বর্ধমান জেলা, যা ছিল দলের মূল পশ্চাদভূমি, সেই নেতৃত্বের নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠার পর আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। জেলার শীর্ষে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই যেমন তৈরি ছিল রাজ্যে ষৌথ নেতৃত্বের অংশীদারি, তেমনি আয়ত্তের মধ্যেই ছিল কেন্দ্রীয় কমিটি। দলের সংগঠন সম্পর্কে আগাগোড়াই ওয়াকিবহাল নিরুপমবাবু তত্ত্ব ও প্রয়োগের বিষয়ে যথেষ্ট সড়গড় থাকায় দলের দলের সর্বভারতীয় নেতৃত্বে ঠাঁই পেতে দেরি হয়নি। এবং পলিটব্যুরোর সদস‍্যপদ ছিল স্বাভাবিক পরিণতি। নিরুপমের বৈশিষ্ট্য ছিল জেলা, রাজ‍্য এবং কেন্দ্র এই তিন স্তরের নেতৃত্বের অনুমোদনকে সব সময়ই সঙ্গে নিয়ে চলা। যে কারণে সরকারে দীর্ঘদিন থাকলেও দলের ওপরতলার সঙ্গে বোঝাপড়ার সুর কখনও বেসুরো হয়নি। চূড়ান্ত বিতর্কিত ও জটিল ইস‍্যুতেও পার্টিকে পাশে পেয়েছেন। এটা খুব একটা সহজ ব‍্যাপার নয়।

১৯৯৬-তে কেন্দ্রে জ‍্যোতি বসুর নেতৃত্বে সরকার গঠনের প্রশ্নে জটিল অঙ্কের সরল সমাধানের নায়ক ছিলেন বাংলার যে পঞ্চপাণ্ডব, তাঁদের মধ্যে পঞ্চম ছিলেন নিরুপম। বাকি চার স্বনামধন্য নেতা হলেন, অনিল, বিমান, বিনয় ও শৈলেন। যাকে বসু বলেছিলেন ঐতিহাসিক ভুল।

রাজ্য সরকারে সংগঠনের হাতের রিমোট কন্ট্রোল বলে পরিচিত ছিলেন নিরুপম সেন। আবার পলিটব্যুরোয় ক্ষমতাসীন লবির কাছে বাংলার দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ আস্থাভাজন। প্রথম অবশ্যই অনিল বিশ্বাস। অনিলবাবুর সময়ের পরিসর ছিল অনেকটাই বিস্তৃত। সুরজিৎ ও কারাটের জমানা জুড়ে। নিরুপমবাবু সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে বিশেষ নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেন কারাট সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন। এই সময়টাই জুড়ে আছে ইউপিএ ১-এর শাসন, বাংলার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম এবং তারও আগে উল্লেখযোগ্য মনমোহন সিংয়ের ওপর থেকে বাম সমর্থন প্রত‍্যাহার ও বিধানসভায় রেকর্ড ২৩৫ পাওয়ার তিন বছরের মধ্যেই গ্রামবাংলায় পরিবর্তনের ঢেউ। দলে ও সরকারে সে সময় বিরাট তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল নিরুপম সেনের। লগ্নি নিয়ে শিল্পমন্ত্রী হিসেবে শেষ কথা বলতেন তিনি এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব মুখ‍্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না তাঁর। তা ছাড়াও সরকারের শিল্পমন্ত্রী ও দলের সর্বোচ্চ সংস্থার সদস্য হিসেবে সরকার, দল ও শিল্পমহলের মধ্যে মূল সেতু এবং সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি। কৃষক সংগঠনের কাজে ও দল-চালনায় অভিজ্ঞ নিরুপমবাবুর মতামত বিশেষ করে সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ছিল। বহু ফসলি জমি নেওয়া ও অনিচ্ছুক ৪০০ একরের চাষিদের বিষয়ে দল ও সরকারের অবস্থান তৈরি হয়েছিল অনেকটাই নিরুপমবাবুর রিপোর্টের ভিত্তিতে।

দ্রোহকালে দলের রাজনৈতিক লাইন রূপায়ণ এবং রণনীতি নেওয়াতেও রাজনীতির কুশলী শিল্প করায়ত্ত ছিল বাংলার তৎকালীন শিল্পমন্ত্রীর। প্রশাসনের পাশাপাশি পার্টি পরিচালনার বিপরীতমুখী ক্ষেত্রে বিচরণ করতেন দক্ষতার সঙ্গে। জননেতা না হওয়ার দরুণ অপ্রিয় সিদ্ধান্তেও পিছপা হননি। ১৯৯৬-তে কেন্দ্রে জ‍্যোতি বসুর নেতৃত্বে সরকার গঠনের প্রশ্নে জটিল অঙ্কের সরল সমাধানের নায়ক ছিলেন বাংলার যে পঞ্চপাণ্ডব, তাঁদের মধ্যে পঞ্চম ছিলেন নিরুপম। বাকি চার স্বনামধন্য নেতা হলেন, অনিল, বিমান, বিনয় ও শৈলেন। যাকে বসু বলেছিলেন ঐতিহাসিক ভুল। দলের দৃশ্য গরিষ্ঠতার সব যুক্তি খারিজ করে সময় ও ইতিহাস যাকে সিলমোহর দিয়েছে।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here