ashok mitra
দেবারুণ রায়

আপসহীন। পাঁচ বর্ণের এই শব্দটির মধ্যে যে বিরল বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে আছে, তার সবটাই নিহিত ছিল ড. অশোক মিত্রের ব্যক্তিত্বে। সাতাত্তরের দিনবদলের দিনে জ্যোতি বসু মন্ত্রিসভায় অশোক মিত্রের উপস্থিতি ছিল প্রতীকী। ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সিপিএম পরিষদীয় দলে তিনি তখন ছিলেন অদ্বিতীয় অ-সিপিএম প্রতিনিধি। সময়ের দর্পণ হওয়ার নিরিখেই সিপিএম ও বামফ্রন্ট তাঁকে শামিল করেছিল। অর্থনৈতিক নীতিতে ইন্দিরা গান্ধীর মতো কমিউনিস্ট-বিরোধী নেত্রীও যে সব প্রগতিশীল উপাদান রেখে বামপন্থীদের চমকে দিয়েছিলেন সেগুলি যে অশোক মিত্রের মস্তিষ্কপ্রসূত সে কথা জানা গিয়েছে অনেক পরে। অশোকবাবু ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা। কিন্তু সংঘাত তো অনিবার্যই ছিল। তা যখন হল, আপসের পথে না গিয়ে সরে এলেন।

অশোক মিত্রের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বন্দিমুক্তির বিষয়টি সব চেয়ে বেশি জোর পেয়েছিল। যে কারণে এবং ব্যক্তিগত অনমনীয় রাজনৈতিক অবস্থানের দরুন তাঁর নির্বাচনী সংগঠনে অংশগ্রহণ করেছিলেন নকশালপন্থীরা। যাঁরা তখনও নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনীতির নাগপাশ থেকে মুক্ত হননি। কার্যত একাত্তরের পর সেই প্রথম রাজনীতির খোলা হাওয়ায় তাঁদের শ্বাস নেওয়া শুরু। কারণ মার্চ মাসে দিল্লিতে পালাবদলের পর বাংলার দেওয়াললিখনও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। প্রচারের সময় স্টুডেন্টস হলে অশোকবাবু একটি নির্বাচনী সভা করলেন। সেই সভাতেই তাঁকে প্রথম দেখা ও শোনা। প্রথম দিনই তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে হল। সমর সেন ও উৎপল দত্ত ছাড়া বাংলা-ইংরেজিতে সব্যসাচী মানুষটাকে বরাবরই আলাদা মনে হয়েছে।

তার তিন বছর পরের একটা দিন। মাস মনে নেই। কিন্তু শীতের সকাল। সালটা ১৯৮০। বিটি রোডের ধারে জেএনবি মোটর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। শিল্পপতি নন্দলাল ও শ্রবন টোডিদের ওই উদ্যোগের উদ্বোধনী মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন জ্যোতি বসু সহ তাঁর মন্ত্রিসভা ও সরকারের প্রথম সারির সবাই। ছিলেন অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্রও। সেই অনুষ্ঠান কভার করতে গিয়েছি আকাশবাণী কলকাতার রিপোর্টার হিসেবে। খবর নিয়েই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হল। কথা শেষ হল অর্থমন্ত্রীর আপ্ত সহায়কের পরের পর তাড়ায়। তিনি বারবারই মন্ত্রীকে স্মরণ করাচ্ছিলেন সে দিনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট। আর মন্ত্রী বলছিলেন, মনে আছে, আমি ঠিক সময়েই উঠব। দেখছিলাম আপ্ত সহায়কের তাড়না ওঁকে স্পর্শ করছে না। অবশেষে উনি ওঁর কথা রাখলেন এবং আমাকে বললেন, “তুমি কোন দিকে যাবে?” জানালাম, “আকাশবাণী।” উনি বললেন, “তা হলে আমার সঙ্গেই এসো। আমি তো ওই পথেই যাব।” যথেষ্ট অপ্রতিভ ভাবেই গাড়ির পেছনের সিটে ওঁর পাশে বসলাম।

সিএ ও চালক দু’ জনেই সমস্বরে মিনতি করলেন, “স্যর, এ বার বেকন (লালবাতি)টা অন করি? না হলে এখান থেকে আর বেরোনো যাবে না। পুলিশ তো বুঝতেই পারছে না আপনি জ্যামে আটকে। পাইলট কারও নেই।”…অশোক মিত্র নির্বিকারই থাকলেন। বললেন, না, না। কী হবে ও সবে? এই তো এসেই পড়লাম।

এর পর এল বিস্ময়ের প্রথম সোপান। বিটি রোডে গাড়ি আটকাল সিগন্যালে। লালবাতি সবুজ হয়ে গেলেও গাড়ি নট নড়নচড়ন। কারণ ততক্ষণে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় সহ আনুষঙ্গিক জ্যামজটপীড়িত এলাকা হওয়ার দরুন রাস্তা আর সুগম নয়। দেখলাম, মন্ত্রীর গাড়ি হওয়া সত্ত্বেও ট্রাফিক পুলিশের কোনো হেলদোল নেই। হেলদোল নেই মন্ত্রীরও। তিনি তখন নানা বিষয়ে গল্প করছেন। সামনের সিটে বসা সিএ-টি ঘনঘন ঘড়ি দেখছেন উদ্বিগ্ন ভাবে। এ ভাবেই প্রতিটি সিগন্যালে দাঁড়াতে দাঁড়াতে পাঁচ মাথার কাছাকাছি ব্রিজের ওপর জ্যামে ফাঁসল গাড়ি। তখন আর কোনো মন্ত্রী-আমলার গাড়ি পেছনে পড়ে নেই। সবাই যে যার মতো বেরিয়ে গিয়েছেন।

এ বার ব্রিজে আটক গাড়ির প্রথম সিট পেছনে ঘুরল। সিএ ও চালক দু’ জনেই সমস্বরে মিনতি করলেন, “স্যর, এ বার বেকন (লালবাতি)টা অন করি? না হলে এখান থেকে আর বেরোনো যাবে না। পুলিশ তো বুঝতেই পারছে না আপনি জ্যামে আটকে। পাইলট কারও নেই।” এই ক’টি কথা শুনে বোঝা গেল, কেন এমন দশা। বোঝা গেল, মন্ত্রীর গাড়ির ছাদের লালবাতিটি আগে থেকেই বন্ধ। কিন্তু এ বারেও অশোক মিত্র নির্বিকারই থাকলেন। বললেন, না, না। কী হবে ও সবে? এই তো এসেই পড়লাম। তার পর আমার দিকে তাকিয়ে নিজের ঔদার্য ঢাকার চেষ্টাও করলেন। বললেন, “আসলে একটু দেরি হলেই ভালো। ওই লক্ষ্মীছাড়া চানানা-টা আসবে। এতক্ষণে হয়তো এসেও পড়েছে।” বুঝলাম উনি মন্ত্রী হয়েও লালবাতি ছাড়া রাস্তায় চলেন, এই জনপ্রিয় গল্পটা ছড়াক, তা চান না। পাশাপাশি, জানিয়ে দিতেও কুণ্ঠা নেই যে আপাদমস্তক নীতিগত বিরোধের সঙ্গে আপসে তাঁর আপত্তি রয়েছে। তখন ইন্দিরা গান্ধী ফের কেন্দ্রের ক্ষমতায় ফিরেছেন। কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে বিকল্প অর্থনীতির প্রণেতা অশোক মিত্র অনর্থক আলোচনায় বসতে চান না কেন্দ্রের শিল্প দফতরের মন্ত্রী চরণজিৎ চানানার সঙ্গে। ইন্দিরা জমানার সূচনাপর্বের উপদেষ্টার সঙ্গে ইন্দিরারই নবপর্যায়ে নীতিগত সংঘাতের সেই শুরু। যা-ই হোক, লালবাতি ছাড়াই গাড়ি অবশেষে পৌঁছোল ‘আকাশবাণী’র সামনে। রাইটার্সে যাওয়ার সোজা রাস্তা ছেড়ে তিনি ঘুরপথে এলেন এক খুদে রিপোর্টারের জন্য। এবং এখানেই শেষ নয়। যখন তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে নামছি ডান দিক দিয়ে, তিনি বারণ করলেন – “না না, ওটা রং সাইড। এ দিক দিয়ে এসো।” তিনি নেমে দাঁড়ালেন রাস্তায়।

পর্বে পর্বে সারা জীবন তাঁকে দেখেছি। তাঁর পদত্যাগ এবং দিল্লিতে ফিরে আসা। সাংসদ অশোক মিত্রকে দেখেছি আগাগোড়া। দেখেছি কাজের ফাঁকে সস্ত্রীক কলকাতার বিড়লা অ্যাকাডেমিতে  চিত্র প্রদর্শনীতে, এবং দেবব্রত বিশ্বাসের গানের আসরে। ওঁকে আর কারও সঙ্গে মেলাতে পারিনি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here