atal bihari vajpayee
অটলবিহারী বাজপেয়ী। ছবি সৌজন্যে হিন্দুস্তান টাইমস।
দেবারুণ রায়

সে দিন ‘৯২এর ৭ ডিসেম্বর ছিল? মোট কথা, বাবরি মসজিদ ভাঙার পর যখন প্রথম সংসদের অধিবেশন বসল। প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও লোকসভায় কার্যত সঙ্গীহীন। তাঁর সঙ্গে শুধু পাশে বসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শংকররাও চহ্বাণ। মসজিদ বাঁচাতে ব‍্যর্থ তাঁরা, একেবারেই যুক্তিতর্কহীন দশায় আত্মপক্ষ সমর্থনে অপারগ। বিবৃতি দিতে চান প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু অকংগ্রেসি, অবিজেপি দলগুলো এতটাই মারমুখী যে তাঁরা যথেষ্ট অসহায়। শাসকদল কংগ্রেস চাইছে সবটা বিজেপির ঘাড়ে চাপাতে আর বিজেপির সাধুসন্তে ভর্তি বেঞ্চ সেটাই চাইছে। বাবরি ভাঙার গর্বের ভাগ তারা কাউকেই দিতে চায় না। কৃতিত্ব সবটাই তাদের। যুক্তি, কয়েকশো বছরের গোলামির চিহ্ন নিয়ে অযোধ্যায় দাঁড়িয়ে ছিল ধাঁচা। আমরা তাকে ধুলিসাৎ করতে পেরে গর্বিত। বিরোধী দলনেতা আডবাণী প্রায় নির্বিকার ও মৌন। কিছুক্ষণ চুপ করেই বসেছিলেন আডবাণীর পাশে বাজপেয়ী। হঠাৎ তীব্র কোলাহলের ভেতর উঠে দাঁড়ালেন অটলবিহারী। স্পিকারকে বললেন, কিছু বলতে চাই। অনুমতি দেওয়ামাত্র শান্ত, শীল, স্থির ও বিষণ্ণ ভাবে বলতে শুরু করলেন। সভায় প্রথমটা পিনপতননীরবতা। অটল স্বভাবজ নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, অযোধ্যায় যা ঘটেছে তাতে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছে। এই লজ্জা লুকোনোর কোনো আড়াল নেই। ভারত-ইতিহাসের কলঙ্কচিহ্ন‌, যা কখনও মোছা যাবে না। অনাগত কাল এই ঘটনার জন্য আমাদের অভিসম্পাত করবে। তাঁর পেছনে বসা মদনলাল খুরানা থেকে শুরু করে তাবৎ ভক্তকুল দৃশ্যত কপাল চাপড়াচ্ছেন। ক্ষিপ্ত সাধুসন্তরা। কোপদৃষ্টি দিলেও কিছু করতে পারছেন না। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আডবাণী ব্লাশ করছেন। অটল ততক্ষণে সভা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। অনুরাগীরা পিছু পিছু।

আরও পড়ুন বাজপেয়ীকে স্মরণ করে ফের ভারত এবং পাকিস্তান শান্তি স্থাপনের বার্তা ইমরানের

যদিও একেবারেই বিপরীত দৃশ্য পরদিনই লোকসভায়। আডবাণী ও সংঘের ক‍্যারিশমা ফের প্রমাণিত হল। অটলজির সংশোধনী শব্দগুলো আজ ২৬ বছর পর অনেকটাই আবছা। তবে যা বললেন তা তাঁর মনের কথা নয়। আডবাণী ও সংঘের চাপে আগের দিনের স্বতস্ফূর্ত সত্যকে শুধরে নেওয়া। গোলামির চিহ্নের স্বীকৃতি অটলজির মুখে। মহাভারতের আধুনিক মহাযুদ্ধে এ ভাবেই ভীষ্ম সেজেছেন আজীবন। এই অটল ও বিহারীর ভাবমূর্তিই তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে সংঘের প্রথম পুরুষ করেছে। ভারতের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাতেও রাজনীতির মোড় ঘুরিয়েছে।

অটল, আডবাণী ও যশবন্ত সিনহা। ছবি সৌজন্যে ডিএনএ ইন্ডিয়া।

ভারতীয় জনতা পার্টির এ হেন ইন্দ্রপতনে দেশের রাজনীতির রঙ্গমঞ্চের রং বেশ কিছুটা ফিকে হয়ে গেল। বিজেপি ও সংঘ পরিবারের সব চেয়ে রঙিন মানুষটি দৃশ্যপট থেকেই বিদায় নিলেন। ওঁর প্রতি শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় বলা যেতেই পারে উনি তিন বারের প্রধানমন্ত্রী। যদিও ওঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের মোট মেয়াদ ছ’বছর‌ের কিছু বেশি। ১৯৯৬ থেকে ২০০৪-এর মধ্যে। প্রথম বার সরকার ছিল একক বিজেপির। কিন্তু লোকসভার প্রথম দল হলেও ম‍্যাজিক সংখ্যার অনেকটাই নীচে থাকায় আস্থাভোটের ঠিক আগ-মুহূর্তে ১৩ দিনের সরকারের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী রণে ভঙ্গ দিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। ভোটাভুটির আগেই জনমোহিনী নেতা বুঝতে পেরেছিলেন,‌ গরিষ্ঠতা জোটানোর সব রাস্তা বন্ধ। লোকসভা সম্পূর্ণ ভাবে দুই মেরুতে বিভক্ত। ‘৯১-এ কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও যে ভাবে ও যাদের সহযোগিতায় তাঁর সংখ্যালঘু সরকারকে নিরঙ্কুশ করেছিলেন তা এই বদলে যাওয়া বাস্তবতা বা একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধেই কার্যত দেওয়া ভারতবাসীর ম‍্যানডেট-এর জন্যই সম্ভব নয়। কিন্তু সেটা ছিল বিজেপির শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ ও জাতীয় রাজনীতিতে বাজপেয়ীর বীজ বপন। এত দিন কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে বিজেপি একদলীয় সরকার গড়ার কথাই ভেবে এসেছে। তা ছাড়া ‘৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর জাতীয় রাজনীতির আ্যজেন্ডাই বদলে গিয়েছে। গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাই হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রের মূল ইস‍্যু। এ হেন মেরুকরণের পরিস্থিতিতে বিজেপির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে বা সমর্থন করতেও প্রস্তুত নয় কোনো দল। রামমন্দির নির্মাণ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, ৩৭০ ধারা বিলোপের মতো সংখ্যালঘু-বিরোধী বিষয় যাদের মূল কর্মসূচি তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাজনৈতিক হারাকিরি করবে কোন্ দল?

আরও পড়ুন কী ভাবে কাশ্মীরের মন জয় করেছেন বাজপেয়ী?

১৩ দিনের বাজপেয়ী সরকারের পতন হতেই তাই বিজেপিতে শুরু হল রণকৌশল বদলে ফেলার মৌসম। এক বছরে দু’টি যুক্তফ্রন্ট সরকার কংগ্রেসের কাছে মাথা মোড়ানোর পর ফের অটল এলেন মসনদে। তবে এ বার আর শুধু বিজেপির হয়ে নয়‌। এনডিএ সংসদীয় দলের নেতা হয়ে। বেশ কিছু আঞ্চলিক দল বিজেপির জোটে এল। এবং আডবাণীর অঙ্কে সংঘ সায় দিল বিজেপির বন্ধ‍্যাদশা ঘোচাতে রাতারাতি কর্মসূচির ভোল বদলে দিয়ে। তখন আডবাণীর কথাই ছিল সংঘের কাছে শেষ কথা। কারণ তাঁর সূত্রেই তখন লোকসভায় দুই সাংসদের বিজেপি সাউথ ব্লকের চৌকাঠ পেরিয়েছে। এবং আডবাণীই সংঘের কথায় সায় দিয়ে বললেন, কোয়ালিশন পর্বে সংঘের একজন স্বয়ংসেবকই সরকারের নেতা হতে পারেন। তিনি অটলজি। একমাত্র তাঁরই উদার মুখ বাবরি বিতর্কের কাঁটা তুলে বিজেপির মসনদের পথ মসৃণ করতে পারে। ১৩ দিনের একক সরকারের সময় অবশ্য আডবাণী হাওলাকাণ্ডের চার্জশিটের জন্য সংসদ থেকে দূরে ছিলেন। তাই বাজপেয়ীর নেতা হওয়ার পথে বাধা ছিল না। যদিও রাম-রথযাত্রার পর আডবাণীই ছিলেন বিজেপির ম‍্যাসকট। অযোধ্যা উত্তাল হওয়ার পর প্রথম ভোটে বিজেপি দ্বিতীয় দল হলে সংসদীয় দলের নেতা করা হয় তাঁকেই। লোকসভার বিরোধী দলনেতা হন আডবাণী, বাজপেয়ী নন। কিন্তু সরকার গড়ার তাগিদে আডবাণীর কট্টর মুখের বদলে বেছে নেওয়া হল নরমপন্থী অটলকে‌। একক শক্তির সরকার হলে আডবাণীই নেতা হতেন। বাজপেয়ীর দরকার হত না। যেমন ২০১৪-য় কালক্রমে কট্টরপন্থা ছেড়ে আসা আডবাণীকে সরিয়ে দিয়ে সংঘ আসরে আনল কট্টরপন্থায় সংঘর বিশ্বস্ত মোদীকে। বিজেপি একাই ২৮২ পাওয়ায় সংঘের রণনীতিই জয়যুক্ত হল। ওই একই চিত্রনাট্য অনুযায়ী উত্তরপ্রদেশের নতুন মুখ হিসেবে বেছে নেওয়া হল হিন্দুত্বের সৈনিক সব চেয়ে গোঁড়া যোগীকে। অথচ অতীতে বিধানসভায় গরিষ্ঠতা যখন অধরা বা নড়বড়ে তখন মুখ‍্যমন্ত্রী হয়েছেন অনগ্রসর কল‍্যাণ অথবা ঠাকুর রাজনাথ। এঁরাও সংঘের কট্টরনীতিরই অনুসারী কিন্তু ব্রাহ্মণ‍্যবাদের তকমা প্রকাশ্যে আঁটা নেই।

আরও পড়ুন ২৭ বছর পর ফের এত বড়ো মাপের কোনো শেষকৃত্যের আয়োজন করছে দিল্লি পুলিশ

অটলজিও সংঘেরই স্বয়ংসেবক। সংঘের বিতর্কিত দ্বৈত সদস্যপদ, মৌলিক হিন্দুত্ব, রামমন্দির নির্মাণ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, ৩৭০ বাতিল বা ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা ইত্যাদি বিজেপি বা সংঘের মূল মতাদর্শগত বিষয়ে দল বা অভিভাবক-সংস্থার সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে একমত ছিলেন। সংঘের বার্ষিক গুরুদক্ষিণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনও। তবে তাঁর ক‍্যারিশমা গড়ে উঠেছিল পরমতসহিষ্ণুতা, গণতান্ত্রিকতা, নমনীয়তা, সবাইকে নিয়ে চলার ক্ষমতা, ও কুশলী কূটনৈতিক পারদর্শিতায়। তাঁর বিপরীত মেরুর রাজনীতিবিদ প্রয়াত কমিউনিস্ট সাংসদ সৈফুদ্দিন চৌধুরী লোকসভায় অটলজির বিরুদ্ধে সরব থাকলেও স্বীকার করতেন, অটলজি কখনও কখনও প্রয়োজনে সংকীর্ণ দলমতের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন। যেটা সবাই পারে না। এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই অটলজিকে নেতা করে বিজেপি ভাঙতে পেরেছিল ধর্মনিরপেক্ষ শিবির। অটলজিকে সামনে রেখেই বড়ো দল ভেঙে ছোটো দল সৃষ্টি করে বিদ্রোহী নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে জোট করেছিল। এই পথেই অটলজির নেতৃত্বে সফল হয়েছে বিজেপি ও সংঘের রণকৌশল। এই পথেই কংগ্রেস ভাঙার পর বাংলার মূল বামবিরোধী দল তৃণমূলকে স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে সরকারে বারবার নিয়েছেন বাজপেয়ী। একই শৈলীতে বিহারে জনতা দল ভেঙে প্রথমে সমতা ও পরে জেডিইউ। জর্জ, নীতীশ, শরদকে নিয়ে। সেকুলার শিবিরের স্তম্ভ করুণানিধি বা ফারুক আব্দুল্লাহদের কিছু দিনের জন‍্য হলেও বিজেপি সঙ্গে পেয়েছে অটলজির নেতৃত্ববলে। বাম ও কট্টর বিজেপি-কংগ্রেস বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ পিপলস ফ্রন্ট ভাঙতে পেরেছে বিজেপি আবদুল কালামকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত করে। তিনি ছিলেন অটলজির চেয়েও বেশি উদারপন্থী। সর্বোপরি হাতে গোনা যে ক’জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে সংঘ জাতীয়তাবাদী মুসলমান আখ‍্যায় ভূষিত করে কালাম তাঁদের শীর্ষে‌। মাস্টার্স স্ট্রোক হিসেবে প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুলায়মের উপদেষ্টা বিজ্ঞানী কালামকে রাষ্ট্রপতি পদে দাঁড় করিয়ে অটলজি ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিলেন বিরোধীদের। কংগ্রেসনেত্রী সনিয়ার সমর্থন এবং পিপলস ফ্রন্ট ভেঙে মুলায়মের আত্মসমর্পণ সম্ভব হয়েছিল। মায়াবতীও ছিলেন সঙ্গে। বামেরা হয়ে গিয়েছিল দলছুট ও কোণঠাসা। প্রণববাবুর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় ওই ধারাবাহিকতায় ভর করেই বিজেপি তাঁর পক্ষের দল ভাঙানোর চেষ্টা করে। সেকুলার সাংমাকে টেনে নেয়। মুলায়ম-সহ আরও কাউকে টানার চেষ্টা সফল হয়নি। কারণ তখন অটলযুগ অস্তমিত। এনডিএ জমানাতেও কর্পোরেটের কৃপাদৃষ্টি যথেষ্টই ছিল। সেই সুবাদে এবং অটল-ভরসায় বাম-শিবির ছেড়ে চন্দ্রবাবু হয়ে উঠেছিলেন এনডিএ সরকারের মূল ধারক। অটলজিরই চমৎকারিত্ব ছিল করুণানিধির মতো নাস্তিক, ব্রাহ্মণ‍্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকে কট্টর শত্রু জয়ললিতার সঙ্গে জোটে আনা। সেই সঙ্গে ভাইকো ও অন‍্য আঞ্চলিকদের‌।

vejpayee and apj abdul kalam
অটল ও কালাম। ছবি সৌজন্যে হিন্দুস্তান টাইমস।

রাজনীতিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হলেও জ‍্যোতি বসু, নাম্বুদিরিপাদ, হরকিষেন সিং সুরজিৎ, হীরেন মুখার্জি, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, ভূপেশ গুপ্ত, গীতা মুখার্জি বা এবি বর্ধনের সঙ্গে সখ্যের অভাব ছিল না। ‘৮৯-এর ভিপি সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছিল বিজেপি ও সিপিএম। দুই মেরুর দুই দল, তাই তাদের মধ্যে কোনো বাক‍্যালাপ ছিল না। কিন্তু কিছু উদারপন্থী নেতার পরামর্শে অটলজি ও জ‍্যোতিবাবু মাঝে মাঝে কথা বলতেন সরকার পরিচালনা নিয়ে। আলোচনায় আসতেন আডবাণীও। বৈঠক হত দিল্লিতে বিজেপি সাংসদ ও শিল্পপতি বীরেন জে শাহর বাড়িতে। এর পর তিনি বাংলার রাজ‍্যপাল হন অটলজির ইচ্ছায়। ‘৮৮-৮৯-তে ময়দানে ভিপির জনসভায় বাজপেয়ী-বসুর পাশাপাশি বসার ছবি বারবার পোস্টার করেছে কংগ্রেস বা তৃণমূল। কিন্তু অন্তত ‘৯২-এর পর এই দুই নেতা সর্বদাই থেকেছেন সম্মুখসমরে। শুধু প্রধানমন্ত্রী-মুখ‍্যমন্ত্রীর সাক্ষাৎ ছাড়া। এক বার ক্ষুব্ধ বাজপেয়ী বসুকে দিল্লিতে বলেন, আচ্ছা জ্যোতিবাবু, বিরোধী দল হিসেবে সরকারের সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু আপনি বলেন, এটা বর্বরদের সরকার। এতে খুবই দুঃখ পাই। বসু বলেন, এ জন্য আমিও দুঃখিত। কিন্তু যারা অন্য ধর্মের পূজাস্থল ভাঙে তাদের আর কোন বিশেষণ দেব? আপনিই একটা বিকল্প শব্দ বলুন। কথাটা ওখানেই থামে।

আরও পড়ুন বাজপেয়ীর হাত থেকে পাওয়া উপহারের ছবি টুইটারে পোস্ট করলেন সৌরভ, জানালেন শ্রদ্ধা

দু’টি আন্তর্জাতিক বৈঠকে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের পাশে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীকে দেখেছি অন্য রূপে। দু’টি বৈঠকই পাক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশারফের সঙ্গে। আগরা ও ইসলামাবাদে। আগরা বৈঠকে শান্তির মসৃণ পিচ খুঁড়ে দিয়েছিল সংঘ। সংঘের কথায় সুষমা-সহ তাঁর তুখোড় শিষ্যদের নিয়ে নেমে পড়েছিলেন আডবাণী। আগরায় অটলের আশায় জল ঢালা হয়েছিল। মুশারফ ফিরে গিয়েছিলেন অজমের শরিফ দর্শন না করে। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অটল ইসলামাবাদে সফল হন ফ্রেন্ড-ফিলজফার-গাইড ব্রজেশ মিশ্রকে সঙ্গে নিয়ে। সংঘের মনপসন্দই ছিলেন ব্রজেশ। কিন্তু তাঁর কাছে মূল বিগ্রহ প্রধানমন্ত্রী। প্রবীণ প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা ছিল অনেক মরশুমের পোড় খাওয়া এই আমলার। তিনি, জসবন্ত সিংহ ও প্রমোদ মহাজন ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে আর কেউ পোখরানে পরমাণু পরীক্ষার প্রাথমিক খবর পাননি। আডবাণীকে জানানো হয়েছিল পরে।

আরও পড়ুন অটলবিহারী বাজপেয়ী – ফিরে দেখা

মনমোহনের উদার অর্থনীতির প্রচণ্ড সমর্থক ছিলেন বাজপেয়ী। তাই কংগ্রেস আমল থেকে বিজেপি আমলে বেশি তাড়াতাড়ি কার্যকর হয়েছে সংস্কার। বাজপেয়ী জমানায় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের বিজাতীয়করণ শুরু হয় বল্গাহীন ভাবে। রুগ্ন কারখানাগুলোর মধ্যে অন্তত ১৮টা বন্ধ করে দেওয়া হয় অটল-আমলে। কেউ মন্ত্রিসভায় রোখেননি। অন‍্য দিকে গুজরাত গণহত্যার সময় শক্তিশালী সংঘ ও আডবাণীকে নস‍্যাৎ করে কিছুই করতে পারেননি বাজপেয়ী। বরং চাপ হজম করতে হয়েছিল। এমনকি রাষ্ট্রপতি কেআর নারায়ণন নিজের সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যেই বেগ দিয়েছিলেন কেন্দ্র ও রাজ‍্যের কর্তাদের। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরি কালাম কোনো প্রশ্ন সে ভাবে না তোলায় প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রত হতেও হয়নি। তবু বিবেকের দংশনে গুজরাত সফরে গিয়ে ‘রাজধর্ম পালনের’ উপদেশ দিয়েছিলেন মোদীকে। যদিও পুরোহিতের মন্ত্র কানে যায়নি তাঁর। কারণ পাশে ছিলেন আডবাণীর মতো ক্ষমতাবান। মুখ‍্যমন্ত্রী হওয়ার আগে দিল্লিতে বিজেপির মুখপাত্র মোদী প্রধানমন্ত্রীর নেকনজর পাননি। কারণ বাজপেয়ী ও আডবাণীর দু’টি ভিন্ন শিবির ছিল। এই বাধা অতিক্রম করতে পেরেছিলেন মাত্র হাতে গোনা দু’চার জন। এঁদের মধ্যে ছিলেন অরুণ জেটলি ও সুধীন্দ্র কুলকার্নি। দু’ ক্ষেত্রের দু’ জন।

আরও পড়ুন ‘যাও বহার যাকে জোর সে বোলো’-বামপন্থীদের উদ্দেশে বলেছিলেন বাজপেয়ী

‘বিদেশিনী’ তত্ত্ব প্রচার করে সনিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি বিজেপি। মূল নেতা আডবাণী। এবং দ্বিতীয় সুযোগ এলে শরিকদের সমর্থনসূচি নিয়ে সনিয়া রাষ্ট্রপতি কালামের কাছে যান। কিন্তু কংগ্রেস সভানেত্রী স্পষ্ট বুঝতে পারেন, শাসকদলের মোডাস অপারেন্ডি কতটা পর্যন্ত বিস্তৃত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল কংগ্রেস।  তাই শেষ পর্যন্ত কোনো ভাবে ওই মর্যাদার পদকে বিতর্কে জড়াতে চাননি।

vajpayee and modi
অটল ও নরেন্দ্র মোদী। ছবি সৌজন্যে এনডিটিভি ডট কম।

অটলজির একটা লব্জ ছিল। বলতেন, ম্যাঁয় অটল ভি হুঁ, বিহারি ভি হুঁ। মানে কখনও অনড় আবার কখনও বিচরণশীল। একবগ্গা নন। ওঁর এই সহজিয়া ভাব ওঁকে ভিন্ন শ্রদ্ধা এনে দিয়েছে। রাজনীতির ঘোলা জলের ছিটে তাঁর গায়েও লেগেছে সবার মতোই। কিন্তু দিনের শেষে তিনি বলতে পেরেছেন, ওটা গঙ্গাজল। লোকে মেনেও নিয়েছে। কিন্তু দারিদ্রের অস্তাচলে দাঁড়ানো হতাশ মানুষ ‘ভারত উদয়’ মানেনি। তাঁকে ডিঙিয়ে আডবাণীর ফিল গুড কাজ করেনি। নির্বাচন এগিয়ে আনাও কাল হয়েছিল। অটলজির ভালোবাসার মানুষেরা চেয়েছিলেন আরেক বার লালকেল্লার প্রাকারে দাঁড়ালে হয়তো অস্তগামী সূ্র্যের আভা সত্যি সত্যিই দিকচক্রবাল ছাপিয়ে যেত। মাঠ-ঘাট স্বচ্ছ হবে কী ভাবে, মানুষ স্বচ্ছ না হলে? নির্বাক হওয়ার আগে এ কথা যে ভাবছেন তা বোঝা যেত। ৭১ পেরোনো স্বাধীনতার জন্মদিনে মোদী আপাতত মেয়াদের পঞ্চম ও আখরি ভাষণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যে দিন পূর্ণ করলেন তার পরের দিনই বিদায়ের লগ্ন স্থির ছিল। সংঘকুলের শ্রেষ্ঠ বাগ্মী অটল উত্তরসূরির পাঁচটা বছর পার করেও আখরি সওয়াল শুনতে পেলেন না।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন