এম করুণানিধি, সৌ: নিউজ মিনিট
প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

টিনসেল টাউনের গ্ল্যামারকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির ময়দানে ফায়দা তোলা কিংবা কেরিয়ারের শেষ লগ্নে পৌঁছে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার চেনা ছকে দ্রাবিড রাজনীতিকে চেনা যাবে না। দিল্লি কিংবা রাজ্যে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে রাজনীতির যে সম্পর্ক দেখে আমরা অভ্যস্ত, তার সঙ্গে তামিলনাডুর কোনো মিল নেই। সেখানে সংস্কৃতি জগতের কেষ্টবিষ্টুরাই রাজনীতির চিত্রনাট্য লিখে আসছেন পঁয়ষট্টি বছর আগে থেকে। ব্রিটিশ পরবর্তী ভারতের সেই সমান্তরাল ঘটমান বর্তমানের যবনিকাপাত হল মঙ্গলবার চেন্নাইয়ে।

১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর মাদ্রাজ রেসিডেন্সির অংশ ছিল আজকের তামিলনাডু। দ্রাবিড রাজনীতির সূত্রপাত তারও আগে থেকে। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখার কাজে হাতেখড়ি হওয়া ‘কলাইগনার’ (শিল্পী) সেই রাজনীতির অংশ ছিলেন প্রথম থেকেই। শুধু তিনি নন, তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মহানায়ক এমজি রামচন্দ্রণও ছিলেন সেই রাজনীতির পথের পথিক। এমজিআর-এর বহু সুপারহিট সিনেমার কাহিনি ও চিত্রনাট্য এম করুণানিধির লেখা। কিন্তু ১৯৫২ সালে যে ‘পরাশক্তি’ সিনেমার মধ্যে দিয়ে করুণানিধি তামিল সিনেমার ইতিহাস বদলে দেন, তাতে অবশ্য রামচন্দ্রণ অভিনয় করেননি। তার আগে অবধি তামিল সিনেমা ছিল ঠাকুর-দেবতা আর পুরাণ-নির্ভর। ‘পরাশক্তি’ই সেখানকার প্রথম সামাজিক ছবি। সে ছবিতে ব্রাহ্মণ্যবাদ ও জাতপাতের বিরোধিতা ছিল। ছবিটি বহু বিতর্কের জন্ম দেয়, বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্যও পায়। তখন করুণানিধির বয়স মাত্র ২৮। তার পর আর ফিরে তাকাননি তিনি। দ্রাবিড় জাত্যাভিমানের রাজনীতিকে সফল চলচ্চিত্রের হাতিয়ার করেছেন। একই সঙ্গে নতুন তৈরি হওয়া দ্রাবিড় মুনেত্রা কাঝাঘম (ডিএমকে) দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ বলেন, তখন থেকেই রুপোলি পর্দা ও রাজনীতির চিত্রনাট্য একই সঙ্গে লিখে গেছেন কলাইগনার।

আরও পড়ুন: প্রয়াত করুণানিধির জীবনের কিছু বিরল এবং অদেখা ছবি

১৯৬৯ সালে তামিলনাডু রাজ্য তৈরি হওয়ার পর প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন আন্নাদুরাই। যিনি নিজে ছিলেন লেখক, চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুর পর আন্নার জায়গা নেন করুণানিধি। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর দেশের একটি মাত্র রাজ্যের শাসকদলই তার বিরোধিতা করেছিল, সেটি ছিল ডিএমকে। তার নেতা ছিলেন কলাইগনার। ইতিমধ্যে অবশ্য প্রিয় বন্ধু রামচন্দ্রণের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। তামিল মহানায়ক নতুন দল গড়েছেন এআইডিএমকে। ১৯৭৭ সালে সেই নবগঠিত দলই ক্ষমতাচ্যুত করে ডিএমকে-কে। তার পর থেকে এমজিআর-এর মৃত্যু পর্যন্ত (১৯৮৭) করুণানিধিকে বিরোধী দলনেতা হয়েই থাকতে হয়েছে। ১৯৮৭-তে ফের ক্ষমতায় আসে তাঁর দল। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন।

করুণানিধি মোট পাঁচবার তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তী কালে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন এমজিআর-এর সঙ্গী ও নায়িকা জয়ললিতা। এই সব ইতিহাস সহজলভ্য। কিন্তু তথ্যে যা লেখা থাকবে না, তা হল, করুণানিধির লেখা অজস্র চিত্রনাট্যের হাত ধরে যে দ্রাবিড রাজনীতির রূপরেখাটি তৈরি হয়েছিল, তার জেরেই তামিলনাডুর এ পর্যন্ত আট মুখ্যমন্ত্রীর পাঁচ জনই চলচ্চিত্র জগতের।

এক সময়ের দ্রাবিড রাজনীতি আজ ইতিহাস। তা কেবলই সেখানকার রাজনীতিকদের ভোট টানার অস্ত্রে পরিণত হয়েছে এখন। তামিলনাডুর রাজনীতিতে কালো টাকার প্রভাবের কথা সারা দেশে সুবিদিত। পরিবার-পরিজনদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া কলাইগনারের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিতেও কালি ছিটিয়েছে যথেষ্ট। তা সত্ত্বেও ৯৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর জেরে এখনও পর্যন্ত ১১ জন সমর্থক আত্মহত্যা করেছেন (রামচন্দ্রণের মৃত্যুর পর ৫৮ জন ভক্ত আত্মাহুতি দিয়েছিলেন)। তিনি নায়ক ছিলেন না, তবুও।

কয়েক দিন আগে প্রয়াত হয়েছেন জয়ললিতা, এ বার চলে গেলেন করুণানিধি। তামিল রাজনীতির সঙ্গে চলচ্চিত্র জগতের জড়িয়ে থাকার এক আশ্চর্য ইতিহাসের ঐতিহাসিক সমাপ্তি ঘটল। কিন্তু ইতিহাস শেষ হয় না, রূপান্তরিত হয় মাত্র। সারা দেশে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির বোলবোলাওয়ের মধ্যে যখন দেখা যায় তামিলনাডুতে বিজেপির ভোট কিছুতেই পাঁচ শতাংশের ওপরে উঠছে না, তখন বোঝা যায় দ্রাবিড জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। সাত দশক ধরে যে রাজনীতির আইকন হয়ে থেকেছেন এম করুণানিধি।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন