থেমে গেল ‘আলোর পথযাত্রী’র পথ চলা

0
570
পাপিয়া মিত্র

কিংবদন্তি সলিল চৌধুরীর চোখ দিয়ে চিনেছিলেন শহর কলকাতাকে। চিকিৎসা চলছিল মুম্বইয়ে। নিজের ইচ্ছাতেই ফিরে এসেছিলেন তাঁর প্রিয় শহর কলকাতায়। নিজের ফ্ল্যাটে চলছিল চিকিৎসা। শেষ পর্যন্ত বুধবার রাত দুটো নাগাদ বাড়িতেই তাঁর জীবনাবসান হল। তাঁর প্রিয় সংগীতের শহর ধরে রাখতে পারল না সংগীতশিল্পী সবিতা চৌধুরীকে।

শুধু বাংলা গানকেই সমৃদ্ধ করেননি সবিতা। হিন্দি, মালয়ালম, কন্নড়, তামিল, অসমিয়া, ওড়িয়া সহ নানা ভাষায়ও গান গেয়েছেন। তবে সলিল চৌধুরীর সুরে গান গাওয়ার আগেই সবিতা বাংলা আর হিন্দিতে প্লে ব্যাক করে ফেলেছিলেন।

শুধু সংগীতজীবনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না এই শিল্পী। তিনি ছিলেন এক সম্পূর্ণ মা ও স্ত্রী। ‘ছুটি’ নামে ডেকে ডেকে অস্থির করে তুলতেন স্বামী সলিল চৌধুরী। শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ি ডাকতেন ‘সীমা’ বলে। ১৯৪৫-এ জন্ম সবিতা চৌধুরীর। বাবার কর্মসূত্রে সবিতা ছিলেন প্রবাসী বাঙালি। ছোটোবেলা থেকেই গানে মন। খুব অভিমান করতেন স্বামীর ওপরে। সলিলের গান লেখা ও সুর করা চলছে, অথচ সে গান প্রাণ পাচ্ছে অন্য শিল্পীর কণ্ঠে। সলিল খুনসুটি করে বলতেন, ভালো রান্না করলে, ভালো শিল্পী আর ভালো মানুষ হতে পারা যায়। রান্নার দোহাই দিয়ে রান্নাঘরে পাঠানো? কপট রাগ দেখাতেন স্ত্রী সবিতা। এমনই হাসিখুশির সংগীতসংসার ছিল তাঁর।

মুম্বইয়ে থাকাকালীন অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে ফোন গেল সবিতা চৌধুরীর কাছে রম্যগীতি গাওয়ার জন্য। এবং তা সলিল চৌধুরীর কথাতেই। কলকাতায় পা দিয়ে সোজা চলে গিয়েছিলেন রেডিও স্টেশনে। তখনও জানতেন না কার গান, কী গান। ‘হলুদ গাঁদার ফুল’ গাওয়ার পরে সেই প্রথম নামের আগে ‘শিল্পী’ শব্দটি বসেছিল। গানটির কথা ও সুর ছিল সলিল চৌধুরীর। সেই প্রথম স্বামীর গান বাংলায় রেকর্ডিং করেন। সলিল ‘মধুমতী’ সিনেমার ‘ঘড়ি ঘড়ি মোরা দিল ধড়কে’ গানটির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে বেঁধেছিলেন ‘হলুদ গাঁদার ফুল’ গানটিকে।

সবিতা চৌধুরীর হাতে লেখা নিজের কথা।

১৯৫৮-য় এইচ এম ভিতে প্রথম গান রেকর্ডিং। এক পিঠে ‘সুরের এই ঝর ঝর ঝর ঝরনা’ আর অন্য পিঠে ‘ মরি হায় গো হায়’, যা আধুনিক সংগীতজগতে এক কথায় অভূতপূর্ব। কারণ সেই সময় মাল্টি ট্র্যাক রেকর্ডিং চালু হয়নি। এবং সেটি ছিল সবিতার জীবনে প্রথম চ্যালেঞ্জিং কাজ। পাশাপাশি ‘কিনু গোয়ালার গলি’ ছবিতে গোরখ কল্যাণ রাগে সুর ও তানে সমৃদ্ধ ‘দখিনা বাতাসে মন কেন কাঁদে’ — আরও এক কঠিন পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন। এগিয়ে গিয়েছে পথ। ১৯৬২-তে ‘এনে দে এনে দে ঝুমকা’। বাংলার ঘরে ঘরে সংগীতের পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন তিনি।

‘ঘুম আয় ঘুম আয়’, ‘ঝিলমিল ঝাউয়ের বনে’ ‘যদি বল সব ছেড়ে’, ‘গুরু গুরু মেঘেরও’, ‘ওই ঘুম ঘুম ঘুমন্ত’, ‘লাগে দোল পাতায় পাতায়’, ‘সুর খুঁজছি’ ‘যা রে যা আমার আশার’, ‘বিশ্বপিতা তুমি হে প্রভু’, ‘নাও গান ভরে নাও’, ‘প্রজাপতি, প্রজাপতি’, ‘শুধু তোমারি জন্যে’ – তালিকা শেষ করা যাবে না। বহু হিট গান উপহার দিয়েছেন সংগীতজগতকে। ছোটোদের গানে দিয়েছেন ভুবন ভরিয়ে।

আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, নানা ভাষার গানের পাশাপাশি সমান ভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন স্বামীর সমাজ-জাগরণের গানকে। সলিল চৌধুরীর চোখ দিয়ে সেই প্রথম কলকাতাকে অন্য রূপে দেখেছিলেন। বাংলা গানে বিপ্লবের সুর, মানুষের দৈন্যের কথা চিন্তা করে বাঁধা হচ্ছে কবিতা, গান। সলিলের সুরে কলকাতায় তখন ‘ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে, আলো ফুটছে, প্রাণ জাগছে।’ কলকাতা যেন এক জ্বলন্তঘুর্ণি।

সলিল চৌধুরীর স্ত্রী হিসেবে নয়, সংগীত জগতে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন সবিতা। তাঁর গাওয়া গান আজও জনপ্রিয়। অবশেষে থেমে গেল ‘আলোর পথযাত্রী’র পথ চলা।

 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here