sayantani-adhikariসায়ন্তনী অধিকারী

রোহিতের ভাই রাজা ভেমুলা একটি সাক্ষাৎকারে কয়েকটি খুব সাধারণ প্রশ্ন তুলেছেন, যার উত্তর দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার এত দিন পরে এসেও ভারত রাষ্ট্রের কাছে নেই। তিনি দাবি জানিয়েছেন কিছু খুব সাধারণ অধিকারের, যেমন নিজেদের পছন্দ মত খাবার খাওয়ার বা দেশের যে কোনো জায়গায় থাকার স্বাধীনতার। এই একবিংশ শতকে এসেও তাঁদের অর্থাৎ দলিতদের কেন ‘ঘেটো’ করে থাকতে হবে, এই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বস্তুত এই ঘেটোর প্রশ্ন বা কিছু বিশেষ পেশাতেই দলিতদের সীমাবদ্ধ থাকতে হবে কেন এই প্রশ্ন বহুদিনের! ভেবে দেখলে বোঝা যায় কেন এই প্রশ্নগুলি রাষ্ট্রকে করা খুবই জরুরি। এই প্রশ্ন বা সমালোচনার স্থান তৈরি হওয়া খুবই জরুরি কারণ এই পরিসর তৈরি হলে, এবং তার উপর ভিত্তি করে সরকারের নীতি নির্ধারিত হলে রোহিতের মত কোনো দলিত বা অন্য কোনো ‘নিম্নবর্ণের’ ছাত্রকেই হয়ত আর নির্যাতিত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে না।


…এই লড়াই শুধু ভেমুলাদের ব্যক্তিগত বা দলিতদের লড়াই হওয়া কাম্য নয়। বরং জরুরি সব শোষিত শ্রেণির বা নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের একসঙ্গে লড়াই করা। তাই রাধিকা ভেমুলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন উনার নিপীড়িত যুবকেরা বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ ছাত্র নাজীবের পরিবার।


এই পরিসর নির্মাণের জন্য সমাজ ও সরকার, দুপক্ষেরই সদিচ্ছা প্রয়োজন। সেখানেই প্রশ্ন ওঠে যে এই মুহূর্তে যে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আছে এদেশে, সেই সরকার কতটা উৎসাহী এই বিষয়ে? গত একবছরে সরকারের বিভিন্ন কার্যকলাপের মধ্যে দিয়ে  যে চিন্তাধারা প্রকাশ পেয়েছে তা কিন্তু একেবারেই আশাপ্রদ নয়। এই সরকার আম্বেদকরের চিন্তাধারার অনুসরণ করতে ঠিক ততটাই উদাসীন যতটা তারা আম্বেদকরকে একটি প্রতীক হিসাবে আত্তীকরণে ব্যগ্র। এবং সেই কারণেই রোহিতের  মৃত্যুর যথাযথ তদন্ত আজ অবধি হয়ে ওঠেনি কেন, এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। ইতিমধ্যে, রোহিতের ভাই রাজা ভেমুলা নিজের পঠনপাঠন ছেড়ে অটো চালাতে শুরু করেছেন। মনে রাখা প্রয়োজন যে রোহিত নিজেও একজন কৃতি ছাত্র ছিলেন এবং হায়দরাবাদ ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ বন্ধের পর থেকেই তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। রোহিতের মা রাধিকা ভেমুলা এক বছর ধরে সুবিচারের আশায় লড়াই করছেন, এবং গত কিছু মাসে একাধিক বার তাঁরা বাড়ি বদলাতে বাধ্য হয়েছেন, কারন ‘সরকারের বিরুদ্ধে কথা’ বলার অভিযোগে তাঁদেরকে বেশ কিছু বার বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছে। অর্থাৎ এই একবিংশ শতকেও যে দলিত পরিবার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার ‘দুঃসাহস’ দেখাতে পেরেছে, তাঁদের প্রাথমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে সমাজ।

রাধিকা ভেমুলা, যার স্বপ্ন ছিল তাঁর দুই ছেলে ডক্টরেট করবে, এই মুহুর্তে তাঁর ছেলের হয়ে লড়াইটা জারি রেখেছেন। গত কয়েক মাসে তিনি বিভিন্ন জায়গায় গেছেন, বিভিন্ন শোষিত শ্রেণির মানুষের পাশে তাঁকে দেখা গেছে। উনায় দলিত আন্দোলনে সহমর্মিতা জানাতেও তাঁকে দেখা গেছে। তিনি দলিত ও দলিত মহিলাদের বিশেষ ভাবে প্রশ্ন করতে অনুপ্রাণিত করছেন। তাঁর মতে, জরুরি প্রশ্নগুলি করতে পারার মধ্যেই দলিত আন্দোলনের দিশা লুকিয়ে আছে। ক্ষমতাসীন সরকার বার বার প্রমাণ করেছে যে দলিত বা অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির অবস্থার অবনতি নিয়ে তাঁদের বিশেষ মাথা ব্যথা নেই। তাঁদের আচরনে স্পষ্ট যে দলিত ছাত্রের উপর নির্যাতনের ঘটনা তাঁদেরকে সেভাবে নাড়া দেয় না, এবং দলিত শ্রেণির সার্বিক উন্নতির প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতার অভাব রয়েই গেছে। যদি তাঁরা এই সংবিধান বিরোধী ঘটনার পরিপন্থী সত্যিই হতেন, বা দলিত শ্রেণির উপর ‘উচ্চতর’ শ্রেণির আক্রমণের ঘটনা যা বার বার এই দেশে ঘটছে সমসাময়িক কালে, তাকে নির্মূল করার ব্যাপারে প্রকৃতপক্ষে সদিচ্ছা পোষণ করতেন, তাহলে তাঁদের কার্যসূচিতে তার নিদর্শন পাওয়া যেত। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর মুখের কথায় দলিতশ্রেণির অবস্থার বিশেষ উন্নতি যে হবে না, সে বিষয়ে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ নেই। এই সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলেই বারবার প্রশ্নগুলো করা জরুরি। মনে করানো জরুরি যে রোহিতের মৃত্যুর একবছর পরেই ভেমুলারা বিচার পাননি, বরং তাঁর মৃত্যুকে ‘ব্যক্তিগত’ সমস্যার রঙ দিয়ে তাকে গুরুত্বহীন করার চেষ্টা হচ্ছে, এমনকি দলিতসত্ত্বার প্রতীক হিসাবে যাতে তিনি চিহ্নিত না হতে পারেন, তাই এখনো বার বার তাঁকে ওবিসি প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই লড়াই শুধু ভেমুলাদের ব্যক্তিগত বা দলিতদের লড়াই হওয়া কাম্য নয়। বরং জরুরি সব শোষিত শ্রেণির বা নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের একসঙ্গে লড়াই করা। তাই রাধিকা ভেমুলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন উনার নিপীড়িত যুবকেরা বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ ছাত্র নাজীবের পরিবার। তাঁদের এই ছোটো ছোট লড়াইগুলিকে একত্রিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের উত্থানের আশঙ্কা, যা প্রকৃতপক্ষে এ দেশের বহুস্বরের ঐতিহ্যকে লঙ্ঘন করে। তাই, আরো একটি প্রজাতন্ত্র দিবস এসে চলে যাওয়ার সময় প্রয়োজন তাঁদের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়ানো, তবেই ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এ দেশের প্রজাতান্ত্রিক কাঠামোকে রক্ষা করা যাবে ।

তথ্যসূত্রঃ

https://www.thenewsminute.com/article/time-has-come-dalits-ask-questions-radhika-vemula-speaks-rohiths-anniversary-55923

https://www.newindianexpress.com/states/telangana/2017/jan/17/one-year-on-rohiths-mother-picks-up-the-pieces-of-her-life-1560425–1.html

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের গবেষক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here