সায়ন্তনী অধিকারী:

চৈত্র শেষ। ১লা জানুয়ারিতে যে নতুন বছর শুরু হয়, তা নেহাতই কেজো। পয়লা বৈশাখ বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। বাড়ির লোক তো, তাই বোধহয় একটু অবহেলিত, কিন্তু মোটেই ফেলনা নয়। পয়লা বৈশাখের প্রতিটি ভাঁজে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির নস্টালজিয়া, ভালোবাসা, ভালো লাগা। এরই প্রকাশ দেখা যায় কখনও হালখাতার প্রথা, কোথাও বা নতুন পোশাকে পুজো দেওয়া, বা কোথাও আদ্যন্ত বাঙালি খাওয়ার মধ্যে।

একটি মতে বাংলা নববর্ষের সূচনা করেছিলেন এক অবাঙালি। ভারতের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ রাজা আকবরের হাত ধরে এই সাল গোনার শুরু। ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার বছর গণনার সূচনা করার।  তাঁর গণনা অনুসারেই বঙ্গাব্দের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই নিয়ে একটি ভিন্ন মত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে বাংলার হিন্দু রাজা শশাঙ্ক এই বঙ্গাব্দের সূচনা করেন। এই মতের সমর্থনে দু’টি যুক্তি দেওয়া যায়। প্রথমত, বাংলায় কোনো দিনই হিজরি সাল গননার বিশেষ প্রচলন ছিল না, এবং আকবরের আমলে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাবে বছর গোনার কথাই জানা যায়। দ্বিতীয়ত, শশাঙ্কের সিংহাসন আরোহণের সময় কাল থেকে বছর গণনা করলেই আমরা বর্তমান ১৪২৪তম বছরে পৌঁছোই। ফলে এই মতের পক্ষে যুক্তি বেশি সবল বলেই মনে করা হয়। যা-ই হোক, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে এই নববর্ষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে বাংলার নিজস্ব শস্যচক্রের। ফসল কাটার ঠিক পর পরই আসে এই পার্বণ, যখন রাজা বা শাসক তাঁর প্রজাদের সঙ্গে দেখা করতেন, কর নিতেন, এবং সেই উপলক্ষে অনুষ্ঠান ও পানভোজনের ব্যবস্থা করা হত। সে যুগে বাংলা ছিল কৃষিনির্ভর প্রদেশ, তাই কৃষিসমাজের প্রথাই সমগ্র সমাজের আনন্দানুষ্ঠানের চেহারা নেয়। পরবর্তী কালে এই প্রথা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়, এবং তার ফলস্বরূপই প্রচলন হয় হালখাতার, যে দিন ব্যবসায়ী নতুন খাতার ব্যবহার শুরু করেন, এবং খরিদ্দারের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও একবার ঝালিয়ে নেন।

মোঘলসম্রাট আকবরের প্রবর্তিত হয়ে থাকলেও, নববর্ষের উৎসবকে কখনোই কোনো ধর্মের নিগড়ে বাঁধা পড়েনি। ধর্মনিরপেক্ষ এই উৎসব এ-পার বাংলা ও ও-পার বাংলা, দুই দেশেই জনপ্রিয়, যদিও বাংলাদেশে এই উৎসব প্রতি বছরই পালিত হয় ১৪ এপ্রিল। আর ভারতে বঙ্গাব্দ শুরু হয় ১৪ বা ১৫ এপ্রিল থেকে। সম্ভবত নববর্ষ উপলক্ষে কলকাতায় উৎসবের প্রচলন করেন ঈশ্বর গুপ্ত, তাঁর আগে সে ভাবে নববর্ষ পালনের কথা জানা যায় না। তবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে লক্ষ্মীপুজো, গণেশপুজো, যা উত্তর ভারতের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, মঙ্গলচিত্র আঁকা, এ সবের প্রচলন ছিল। লীলা মজুমদারের খেরোর খাতায় পাই, সে যুগে কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় হালখাতা ছিল প্রায় সর্বজনীন উৎসব। এমনকি পরিস্থিতি অশান্ত থাকলেও বইপাড়ার হালখাতায় তার খুব প্রভাব দেখা যেত না। একই ভাবে ও-পার বাংলায় বিগত বেশ কিছু বছর ধরে পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে তুলে ধরা হয়। ২০১৬ সালে এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ইউনেস্কো ‘ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে আশঙ্কাজনক ভাবে দেখা যাচ্ছে এই উৎসবের উপরও ধর্মের (বা ধর্মের অভাবের) তকমা জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর ধরেই উগ্র মুসলিম মৌলবাদীরা এই উৎসবকে ইসলামবিরোধী বলে চিহ্নিত করছেন। তাঁদের রোষ গত বছর নেমে এসেছিল পয়লা বৈশাখের উৎসবের উপর। একই ভাবে এ দেশে হিন্দু মৌলবাদীরা দাবী করছেন এই উৎসব যথেষ্ট হিন্দু নয়। আর তাই, পয়লা বৈশাখের বদলে চৈত্রের একটি দিনকে সব হিন্দুর নববর্ষ হিসাবে পালন করার ‘ফতোয়া’ দিচ্ছেন তাঁরা। এমনকি বাঙালির মাছ-ভাত, পোস্ত আর শুঁটকিতেও লাল দাগ পড়ে যাচ্ছে। এগুলো নাকি বাঙালির নিজস্ব নয়!! কিন্তু অত সহজে কি বাঙালির ঐতিহ্য কেড়ে নেওয়া যায়? বাঙালির সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে এ বছর কলকাতাতেও আয়োজন করা হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রার, যেখানে নাচ গান নাটকের মধ্যে দিয়ে বাঙালি পালন করবে নববর্ষ, সকালে দক্ষিণ কলকাতায় হবে এই শোভাযাত্রা। একই দিনে আরও একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে কলেজ স্ট্রিটেও। ও হ্যাঁ, আর বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে আমিষ-নিরামিষ খাবারের সমাহার। বাংলাদেশেও শোভাযাত্রা হচ্ছে। আসুন না, এই এক দিনে নিজেদের বাঙালিসত্ত্বাকে আরেক বার বিস্মৃতির আড়াল সরিয়ে বের করে আনি? শুভ নববর্ষ ১৪২৪!

(লেখক ইতিহাসের অধ্যাপক)  

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: শ্রী গৌতম বসুমল্লিক

আরও পড়ুন: এক সংজ্ঞাহীন আনন্দ-উৎসবের নাম পয়লা বৈশাখ

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here