amarendra kumar singh, state election commissioner
অমরেন্দ্র কুমার সিং, রাজ্য নির্বাচন কমিশনার
দেবারুণ রায়

সোমবার সকাল হয়েছিল রাজ্যের স্বশাসিত নির্বাচন কমিশনের আশ্বাস সম্বল করে। কর্তাভজারা বারবারই সবুজ কালিতে লিখে চলেছিলেন, ‘হামলা, মামলা কোনো কিছুতেই আটকানো যাবে না জনজোয়ার।’ বাম জমানায় ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসাবে খ্যাত এক জন বেশ বকে দিলেন বাম, কংগ্রেস ও বিজেপি নেতাদের। বললেন, জনবিচ্ছিন্ন দলগুলো আদালতে গিয়ে পেল কী? ‘কোর্টে কি ভোট হয়?’

এই লাইনেই সাফল্যের প্রতীক আমাদের স্বাধীন ও নির্ভীক নির্বাচন কমিশনার। তাঁরই নেতৃত্বে শাসকের সামনে নতজানু কমিশন কদাচ লক্ষণরেখা ডিঙোয়নি। এক দিনে ভোট করতে হবে? তথাস্তু। কেন্দ্রীয় বাহিনী চলবে না? জো হুজুর। তবু একটা গণতান্ত্রিক অগ্রাধিকার দিতেই হয়। এটাই গণতান্ত্রিক শোভনতা। যে কারণে হাইকোর্টের সিঙ্গল ও ডিভিশন বেঞ্চ নিরাপত্তার বন্দোবস্ত নিয়ে কমিশনকে বারবার সক্রিয় করার চেষ্টা করে এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কলকাতা হাইকোর্ট কমিশনের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতেই আস্থা রাখে। এই গণতান্ত্রিক শোভনতা অনুযায়ীই ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বরের প্রাক্কালে উত্তরপ্রদেশের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংকেই বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমির বিতর্কিত কাঠামো রক্ষা করার দায়িত্ব অর্পণ করেছিল আদালত। মসজিদ ভাঙার পর সেই আস্থা বা বিশ্বাসের কথাই উল্লেখ করে সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিংহ রাও বলেছিলেন এটা ‘পারফিডি’। কল্যাণ সরকারকে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে দায়ী করেছিল কেন্দ্র। এর পর বিচার ও প্রতীকী সাজাও শুনিয়েছিল আদালত।

violence in panchayet election
পঞ্চায়েত ভোটে হিংসা।

সেই রকমই বিশ্বাসভঙ্গের দায় আসতেই পারে বাংলার কমিশনের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া আদালতের রায়ে যে কথা বলা হয়েছিল তাতেও কোনো ধোঁয়াশা ছিল না। বিরোধীদের ব্যক্ত করা চূড়ান্ত শঙ্কা নিয়ে রায়ে বলা হয়েছিল, যে কোনো মূল্যে কমিশনকে মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। বলা হয়েছিল, কোনো রক্তক্ষয় বা প্রাণহানি ঘটলে বিপুল ক্ষতিপূরণের কথাও। যদিও কোনো সদিচ্ছা বা শুভ উদ্যোগই হিংসাশ্রয়ীদের ক্ষমতার আগ্রাসনে অন্ধ রাজনীতির কক্ষপথ পরিবর্তন করাতে যথেষ্ট নয়। চোরে না ধর্মের কাহিনি। সংগঠিত হিংসার জবাব অবশ্যই সুসংগঠিত গণতন্ত্র। অন্ধত্বের জবাব দিতে পারে সচেতন মন। অন্ধকার মুছে দিতে পারে শুধুই উৎসারিত আলো। এটা জানেন বলেই কালবেলা স্বাগত বুঝে সোমবার সন্ধ্যায়  অমরেন্দ্র কুমার সিং বললেন, যা বলার বলব ‘কাল’।

পঞ্চায়েতের ভোট এই ফুলে ভরা বাংলাতেও কয়েকটা কাঁটা রেখে গেল। যেমন শান্তিপুর আর কুলতলি। তা ছাড়া এগারো বছর পরে নন্দীগ্রামের মাটি ভিজল রক্তে। পরিবর্তনের পেটেন্ট যাদের হাতে তাদের জন্য বড়ো সুখের সময় নয়।   

সোমবার সারা রাজ্যে অসংখ্য সংঘর্ষ, খুনজখম, বুথ দখল, ব্যালট লুঠ ও পরিকল্পিত কারচুপির ঘটনা ঘটেছে। গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভই স্বচক্ষে দেখেছে কাকদ্বীপ থেকে কাঁথি, নওদা থেকে নন্দীগ্রাম, প্রায় প্রতিটি রক্তপাত ও প্রাণহানির দৃশ্য। স্বয়ং প্রধান বিচারপতি মোবাইল টিভিতে প্রত্যক্ষ করেছেন সন্ত্রাসের, রক্তক্ষয়ের চেহারা। নবান্ন থেকে প্রশাসনের একেবারে নিচুতলা পর্যন্ত, ডিজি থেকে শুরু করে ওসি ও আইসিরা দেখেছেন, শুনেছেন এবং যাচাই করেছেন সংগঠিত ও স্বতঃস্ফূর্ত হিংসার দৃশ্য। কাকদ্বীপে এক দম্পতিকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু’ বলে উড়িয়েছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু শান্তিপুরে ছাপ্পা ভোট দিতে যাওয়া দলের সঙ্গে থাকা তাঁতশ্রমিকের যে বেকার ছেলেটি গণপিটুনিতে প্রাণ হারাল তার জীবনের দাম কে দেবে? চাকরির আশায় স্থানীয় তৃণমূল বিধায়কের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। বিধায়ক অবশ্য ইতিমধ্যেই দায় ঝেড়ে ফেলেছেন। এবং নিহত সঞ্জিতের মা লালী শোকে উন্মাদপ্রায়। ওই বিধায়কের নাম করে বললেন, “ওকে আমার সামনে নিয়ে এসো। আমি তাকে ভালো করে মারব।” অবশ্যই শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে শতায়ু হন তৃণমূল নায়কটি। কিন্তু শান্তিপুরের মানুষ কি তাঁর কাছে এলাকার শান্তিভঙ্গের জন্য প্রশ্ন তুলবেন? কী এমন হল যার দরুন গণরোষের মুখে পড়তে হল নিরীহ ছেলেটিকে। দুষ্কৃতীরা প্রাণ বাঁচানোর কৌশল জানে। আর দাদারা জানে নিজে নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থেকে এমনই নিরীহদের ঠেলে দিতে হয় কী ভাবে। এই ঘটনায় নিঃস্ব হলেন তাঁতশ্রমিক দম্পতি। আর তাঁদের অন্ধের যষ্টিটির বিনিময়ে রাজনৈতিক সুবিধা কুড়ল শাসক দল। এমনই আরও দুই তৃণমূল কর্মীর মৃত্যুর খতিয়ান দিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় নবান্নে বসে ডিজি বলেছেন, “মৃতের মোট সংখ্যা ছয়। যাতে তৃণমূলেরই তিন।” অর্থাৎ শাসক দলই আক্রান্ত, আক্রমণকারী নয়। তখন শান্তিপুরের নিষ্প্রদীপ ঘরে বসে পুত্রহারা দু’ জন বিলাপ করছেন। বলছেন, কীসের আশায় সঞ্জিত তৃণমূলে গিয়েছিল। রাজ্য জুড়ে খুনজখমের এমনই অসংখ্য ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তৃণমূল বনাম নির্দল পক্ষের লোকেরা। এ হেন নির্দলরা বিপুল সংখ্যায় তৃণমূলেরই গোঁজ প্রার্থী। মতান্তরে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল। তৃণ থেকে মহীরুহ হওয়া সাত বছরের শাসকদলে এত বিক্ষোভ কীসের? যেখানে গ্রাম ঘাসে ঘাসে উন্নয়নের ফুল? পঞ্চায়েতের ভোট এই ফুলে ভরা বাংলাতেও কয়েকটা কাঁটা রেখে গেল। যেমন শান্তিপুর আর কুলতলি। তা ছাড়া এগারো বছর পরে নন্দীগ্রামের মাটি ভিজল রক্তে। পরিবর্তনের পেটেন্ট যাদের হাতে তাদের জন্য বড়ো সুখের সময় নয়।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন