shankha ghosh and anubrata mondal
দেবারুণ রায়

‘বাংলা আজ যা ভাবে, আগামী কাল তা ভাবে গোটা ভারতবর্ষ’ – আমাদের এই অহংকার অনেক আগেই হয়ে গিয়েছে অর্থহীন। চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট এমনকি সত্তরেরও কিছু উজ্জ্বল দিনের স্বপ্নরঙিন ইতিহাসের পাতাগুলো ছিঁড়ে উড়ে গিয়েছে কুৎসিত কালবোশেখিতে। নবজাগরণের বঙ্গে ভিড় জমিয়েছে ঘুমপাড়ানি গাইয়েরা। এরা নানা রঙের। অদ্ভুত এক ঘুমের আয়োজন গ্রামে গঞ্জে নানা মঞ্চ থেকে। এমন দিনেও জেগে আছেন জোড়াসাঁকোর ‘ঠাকুর’। পঁচিশে বৈশাখের কবিপক্ষ শুরু হল ‘…দেখা দিক আর বার/জন্মের প্রথম শুভক্ষণ…’ উচ্চারণে। রবীন্দ্রদিনের প্রাক্কালেই ‘উন্নয়নের’ উটকো বাধা আর ভাগাড়ের মাংস নিয়ে রাজ্যবাসীকে সচেতন করে মুখ্যমন্ত্রী চলে যান রবীন্দ্রউৎসব আয়োজনের আবহে। এবং রাজ্যের নেত্রী হিসাবে তাঁর বার্তায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সঙ্গে নজরুল, নেতাজি এবং আম্বেডকরের নামও উচ্চারণ করেন।

যদিও রবীন্দ্রনাথ বলতেই তাঁর জীবন-ইতিহাসের সব চেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলো বারবার উঠে আসে জয়ন্তীর সকালে। যার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাইটহুড প্রত্যাখ্যানের পর্ব। জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্বিচার গুলির জবাব দিতে গিয়েই কবি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া উপাধি বর্জন করেছিলেন। পোশাকি ‘স্যর’ হওয়ার লালসায় বিবেক বন্ধক রেখে সরকারের কুর্নিশ করেননি। যে বিদ্বজ্জনেরা গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে প্রহরে প্রহরে রবীন্দ্রগৌরবে বহুবচন হতে চান, জানতে ইচ্ছে করে, দেশ, কাল ও  মানুষ সম্পর্কে তাঁদের অবস্থান কী? নানা আভূষণ বিভূষণে ভূষিত তাঁরা ‘অফ দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল’-এর বহুউচ্চারিত বাক্যবন্ধ সম্পর্কে কী বলেন? কার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি? গলায় কার উত্তরীয়?

’০৭ থেকে ’১১-এর মধ্যে রাজ্যের শাসক দল ও মোর্চার পক্ষে যে সব দুর্লক্ষণ দেখা গিয়েছিল, সেগুলোর কোনো কোনোটা ধূমকেতুর মতোই মাঝেমধ্যে দৃশ্যমান বাংলার আকাশে। যদিও এখনও নিশ্চয়ই তা আম বাঙালির চোখে পড়েনি।

রাজনীতির যাত্রাপালায় বিবেক ইদানীং অবসৃত। এক একটি ব্রেকিং নিউজের কুশীলবরা রবীন্দ্রনাথের গানে সদর্পে বেসুর। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্র্যাফিক সিগন্যালের রবীন্দ্রসংগীত থেমে গেলেও কালচারের কারবারিরা উন্নয়নের পাতা ওলটাচ্ছেন। বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে ক্যালেন্ডার জুড়ে উৎসব। উন্নয়ন আর কর্মসংস্থানের তাবৎ কর্মসূচির পাশাপাশিই এল মরা মুরগি-সহ ভাগাড়ের মাংসে কেমিক্যাল মাখিয়ে অভিজাত হোটেলে পাঠানোর চাঞ্চল্যকর অন্তর্তদন্ত। মরা পশুর মাংসেও উদার মহানগর। মুরগি-ছাগল-গোরু–কুকুরে কোনো ভেদাভেদ নেই। কলকাতাকেন্দ্রিক সমস্ত বৈদ্যুতিন চ্যানেল অষ্টপ্রহর দেখাচ্ছে ভাগাড়ের পচা মাংস কী ভাবে বাঙালির পাতে পড়ছে। ছবি দেখতে দেখতে উৎক্ষিপ্ত বঙ্গবাসী যখন সর্ব অর্থে ‘ভেজ’ হয়ে সমস্ত তেজ বিসর্জন দিলেন, তখন গ্রামে গ্রামে সন্ত্রাসের খড়গে ছিন্ন বিরোধীদের খেল খতম করে শাসক দলের জায়গিরদাররা বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত গড়ার পুরস্কার পাচ্ছেন। ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’ বলে বীরভূমে আসর মাতাচ্ছে অনুগত বাউল। বলা বাহুল্য, গ্রামে গ্রামে ঘাসফুল ফোটার লগ্ন থেকেই বাউলগানে পরিবর্তনের স্বরলিপি স্পষ্ট হতে শুরু করে। বাউলের মুখে মুখেই ছড়িয়ে পড়ে রাজনীতির রূপান্তর। বাংলার সুশীল সমাজ ২০০৭-০৮ থেকেই যে আগমনির সুর ধরেছিল, সেই পূর্বাভাসই বাস্তবায়িত হল ’০৯-এ। ’১১-য় পুরোপুরি বদলে গেল মৌসম। কিন্তু এই ’০৭ থেকে ’১১-এর মধ্যে রাজ্যের শাসক দল ও মোর্চার পক্ষে যে সব দুর্লক্ষণ দেখা গিয়েছিল, সেগুলোর কোনো কোনোটা ধূমকেতুর মতোই মাঝেমধ্যে দৃশ্যমান বাংলার আকাশে। যদিও এখনও নিশ্চয়ই তা আম বাঙালির চোখে পড়েনি।

বিশেষ করে পঞ্চায়েত ভোট নিয়েই আবহাওয়ায় নিম্নচাপের লক্ষণ কিন্তু স্পষ্ট। পঁচিশে বৈশাখের প্রাক্কালেই ফেসবুকে ভাইরাল হল, ‘দেখ খুলে তোর তিননয়ন/রাস্তা জুড়ে খড়গ হাতে/ দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন’। সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী মিছিলে পা মেলানোর দিনও শঙ্খবাবু ভোট-সন্ত্রাস নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। কিন্তু নিশ্চয়ই কাকতালীয় নয় তাঁর এই অবস্থান ঘোষণার মোক্ষম মুহূর্তটি। কবির জন্মদিনেই এ কালের প্রতিনিধিত্বমূলক বুদ্ধিজীবী ও জীবিত কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে ‘শ্রেষ্ঠ’ হিসাবে স্বীকৃত শঙ্খ ঘোষের ‘মুক্ত গণতন্ত্র’ নামে পূর্ণাঙ্গ কবিতাটি ঝড় তুলল। যে ঝড় উড়িয়ে নিল বাংলা মায়ের মুখের ধুলোর আস্তরণ। বলে গেল: ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি।’ অবশেষে পঞ্চায়েত ভোট, ভাগাড়ের মাংস আর পঁচিশে বৈশাখ শীর্ষক পালা বা প্রহসনের মুক্তধারায় স্পষ্ট হচ্ছে কে কোথায় দাঁড়িয়ে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here