sayantani-adhikariসায়ন্তনী অধিকারী

২০১৬ শেষ হতে চলেছে। অর্থাৎ কিনা একবিংশ শতকের ২য় দশক শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই। অনেক কিছু আমূল বদলেছে বটে, কিন্তু কিছু জিনিস সামগ্রিকভাবে একই থেকে গেছে, যদিও আপেক্ষিক ভাবে তার পরিবর্তন হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এর মধ্যে একটি হল নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সমকালীন প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও বারে বারে উঠে আসে বিভিন্ন ধরনের নারীবিরোধী এবং কিছু ক্ষেত্রে নারীবিদ্বেষী মতামত। এই মতামত অনেক সময় ‘মজা’ করার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেতে পারে। খুব অদ্ভুত শোনাতে পারে হয়ত, কিন্তু মজার মধ্যে দিয়ে যে ভাবে বিদ্বেষ প্রকাশ করা যায়, তা বোধহয় অন্য কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। একটি উদাহরণ দিই। সম্প্রতি একটি ‘রম্য রচনায়’ এক লেখক ডিভোর্সি মেয়েদের সমস্যাকে সম্পূর্ণ গৌণ করে তাঁদেরকে এক হাস্যাস্পদ ‘সখী সমিতি’র সঙ্গে তুলনা করলেন, যাঁদের কাছে ডিভোর্স বিষয়টি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং পরনিন্দা, যা কিনা তাঁদের ধর্ম, তার একটি রসদ। অর্থাৎ, লেখকের মতে, এই ‘ডিভোর্সী সখী সমিতি’র কাছে বিবাহ ও বিচ্ছেদ ব্যাপারগুলি প্রকৃতপক্ষে খুবই মামুলি বিষয়, তাই বিবাহ জনিত ‘আত্মত্যাগ’ (লেখকের মতে, বিবাহ মানেই আত্মত্যাগ আর স্বভাবতই তা করার দায় মেয়েদের)সম্বন্ধে তাঁরা অবহিত নন বা সেই ত্যাগ স্বীকারে রাজি নন। পাঠক লক্ষ করে দেখুন, এই তথাকথিত ঠাট্টার সুরের সঙ্গে উনবিংশ শতকের রক্ষণশীল গোষ্ঠীর মিল কি প্রবল, যেখানে তাঁরা ‘আধুনিক’ মেয়েদের সংসারে অনিচ্ছা নিয়ে ব্যঙ্গ করতেন বার বার। অর্থাৎ, সময় পাল্টালেও মেয়েদের বিষয়ে সমাজের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মতবাদ বিশেষ পাল্টায়নি, বা পাল্টালে তা এমন ভাবে পাল্টেছে, যাতে মেয়েদের তথাকথিত সামাজিক ভূমিকাগুলিকে সামান্য অদল বদল করে ব্যবহার করা যায়। সেকালে বঙ্কিমচন্দ্রের নবীনা ও প্রবীণার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা থেকে শুরু করে ঈশ্বর গুপ্তের ব্যঙ্গমুখর লেখনীতে কখনো ঠাট্টা বা কখনো অপেক্ষাকৃত গম্ভীর ভাবে আলোচনা করা হত, কিভাবে নব্য শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে, মহিলারা তাঁদের প্রকৃত কর্তব্য, সংসারকে অবহেলা করছেন। অর্থাৎ এ যুগের লেখক, বঙ্কিম বা ঈশ্বর গুপ্ত না হয়েও তাঁদের সেই ‘সেকেলে’ উদ্বেগকেই আরো এক বার ‘হাস্য কৌতুক’-এর আড়ালে পেশ করছেন। সমস্যা হল, যে এভাবে সমাজের কিছু গুরুতর সমস্যা, বিবাহ বিচ্ছিন্না মহিলারা অহরহ যার সম্মুখীন হন, সেগুলিকে লেখক গৌণ পর্যায়ভুক্ত করে ফেলে সেই সমস্যার ভুক্তভোগী অনেক মহিলাকে হাস্যাস্পদ করে তুললেন, তিনি অনায়াসে ভুলে গেলেন, তাঁদের যন্ত্রণা বা তাঁদের প্রতিদিনের লড়াইকে।   

তথাকথিত ঠাট্টা ছাড়াও আরেক ভাবে নারীবিরোধী বা নারীবিদ্বেষী মানসিকতা প্রকাশ পায়, যা একই রকম ভাবে সমস্যাজনক। এক্ষেত্রে ব্যঙ্গ বিদ্রুপের কষাঘাত নয়, রুচিশীলতা ও সুশীলতার মোড়কে নারীকে নিচু নজরে দেখার চেষ্টা করা হয়। যেমন সম্প্রতি একটি ইন্টারভিউয়ে এক নামকরা অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী বলে বসেন যে ধর্ষণের দায় কিছুটা হলেও মেয়েদের উপর বর্তায়, কারন তাঁরা সিগারেট খান প্রকাশ্যে, ছোটো পোশাক পরেন, এবং এক বিশেষ মুখ ভঙ্গি করে সেলফি তোলেন। অদ্ভুত ভাবে তিনি ভুলে যান যে এদেশে এমনকি ৬ মাসের শিশুও ধর্ষিত হয়েছে এই কিছু দিন আগে। ধর্ষিতার পোশাক বা ‘চাল চলন’-এর দিকে এই ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ধর্ষকের ভূমিকাকে খাটো করাও পুরুষতান্ত্রিক ও নারী বিদ্বেষী মতের প্রকাশ। আসলে কিন্তু তিনি সেই প্রাচীন মতটিই বহন করছেন, যা নারীকে নরকের দ্বার-এর সাথে তুলনা করে, এবং যাবতীয় যৌন অবদমনের দায় নারীর উপর চাপিয়ে দেয়। উনবিংশ ও বিংশ শতকের লেখায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে অনেক সময়েই নারীকে কুহকিনীর রূপে দেখানো হয়েছে, যার আবেদনের কাছে পুরুষ অসহায়।

পুরুষের ‘অসহায়ত্ব’-এর রূপ বিভিন্ন ভাবে ঘুরে ফিরে আসে আমাদের আধুনিক দৈনন্দিন জীবনে, কখনো বিদ্রুপের মাধ্যমে (যেমন পীড়িত পতি পরিষদকে হাস্য রস উদ্রেকের জন্য ডিভোর্সি মহিলাদের বিপরীতে উপস্থাপন করা হয়, এবং এই ভাবে এক ধরনের আরোপিত ঐক্যের দাবি করা হয়), আবার কখনো বিভিন্ন তাত্ত্বিক চর্চার মাধ্যমে। এবং দুঃখজনক ভাবে একালে এই ধরনের চিন্তা রক্ষণশীল ও তথাকথিত প্রগতিশীল, এই দুই অংশ থেকেই উঠে আসতে দেখা যায়। সেকালে বেথুন ইস্কুল স্থাপনের পর যেমন অনেক রক্ষণশীল বলেছিলেন যে মেয়েরা ইস্কুলে যাতায়াতের পথে বিপদে পড়তে পারে, তাই ইস্কুল যাওয়া কাম্য নয়। এযুগের রক্ষণশীলরাও একই ভাবে মেয়েদের স্বল্পবাস বা সিগারেট খাওয়ার উপর বিধি নিষেধ আরোপ করেন। কিন্তু একই সঙ্গে এমনকি তথাকথিত বামপন্থী শ্রেণি থেকেও নিক্ষিপ্ত হয় ডিভোর্সি বা নারীবাদী মহিলাদের প্রতি বাক্যবাণ। প্রকৃতপক্ষে এই সবগুলিই হল পিতৃতন্ত্রের প্রকাশ ভঙ্গি। সাধারণ ভাবে দেখা যায় যে নারীবিদ্বেষ বা মিসোজিনি শ্রেণি নির্বিশেষে আমাদের মননে প্রোথিত। তাই একাল হোক বা সেকাল মিসোজিনির রূপান্তর হলেও তার প্রভাব আমাদের চিন্তাধারায় বারে বারে প্রকাশিত হয়, এবং পিতৃতন্ত্রে ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ওঠে।

কৃতজ্ঞতা  স্বীকারঃ কিছু আলোচনার জন্য স্বাতী মৈত্র ও প্রিয়াঙ্কা নন্দীকে ধন্যবাদ।

(লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের  গবেষক)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here