sayantani-adhikariসায়ন্তনী অধিকারী

ভারতের সৈন্যবাহিনী নিয়ে গর্ব এবং প্রত্যাশার পারদ ক্রমশই ঊর্ধ্বমুখী, বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়া গর্বের সৌরভে মাতোয়ারা। সেনাবাহিনীকে নিয়ে অভিভূত ব্যক্তিবর্গেরা এমনকি আফস্পা প্রভাবিত অঞ্চলে কিছু সৈন্যের মনুষ্যত্ব-বিরোধী ভূমিকার প্রশংসা করে ফেলছেন। তাঁদের মতে, সৈন্যবাহিনীর দাপট ছাড়া কাশ্মীর বা মণিপুরের মতো অংশগুলিকে ভারত রাষ্ট্রের অধীনে রাখা সম্ভব হত না এবং কে না জানে, রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ণয় হয় তার আয়তন দ্বারা, রাষ্ট্রের মানুষের জীবনযাত্রার মানের পরিমাপ দ্বারা নয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই মতের সমর্থক অধিকাংশ মানুষ বর্তমান শাসকের বেশ কিছু নীতিরও সমর্থক এবং সেই সমস্ত নীতির সমর্থনে তাঁরা বার বার দুর্গম স্থানে মোতায়েন সৈন্যদের সমস্যার কথা টেনে এনে অন্য সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলিকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ এঁদের মতে, ভারতের বাকি জনসাধারণের জীবন ও জীবিকার সমস্যাগুলি সীমান্তে মোতায়েন রক্ষীর সমস্যার সামনে কিছুই না। তাই, ম্যানহোল পরিষ্কার করতে নেমে যে কর্মী বিষবাষ্পে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান, তাঁর বা তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগ সেনাদের আত্মত্যাগের কাছে কিছুই না। কারণ তাঁরা বন্দুক হাতে ‘পাকিস্তানের’ সৈন্যদের মোকাবিলা করেন না।

দুঃখজনক ভাবে, যাঁদের কাছে সৈন্যদের আত্মত্যাগ এতটা গুরুত্বপুর্ণ, তাঁরা এক বারও ভেবে দেখেন না প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনী বহিঃশত্রুর আক্রমণ ব্যতীত আর কোন কোন সমস্যাগুলির সঙ্গে লড়াই করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এঁদের একটা বৃহৎ অংশ সৈন্যবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের ‘এক পদ এক পেনশন’ লড়াই সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। এই মনোভাবের সুযোগই ক্ষমতাসীন সরকার নিয়ে থাকে। গত কয়েক মাসের ‘এক পদ এক পেনশন’-এর দাবিতে আন্দোলনকারী অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মীদের প্রতি সরকারের মনোভাবেও তাই উদাসীনতার বেশি কিছু উঠে আসে না। রাষ্ট্র জানে যে এই কর্মীরা, এমনকি জনতার মধ্যে ভুয়ো দেশপ্রেম সঞ্চার করতেও কাজে আসবেন না। অপর পক্ষে জনতার মধ্যে এই আবেগ সঞ্চার হয় না যে দেশের জন্য আত্মত্যাগ করা সৈন্যবাহিনীর এক অংশ অর্থের সমস্যায় বিব্রত, কারণ তাঁরা যথাযথ ভাবে পেনশন পাচ্ছেন না। এর কারণ যে মুহূর্তে কোনো সেনাকর্মী তাঁর পদ থেকে অবসর নিচ্ছেন, ও নিজের উর্দি খুলে রাখছেন, সেই মুহূর্তে তাঁর প্রতি সেই আবেগ ও রোম্যান্টিসিজম শেষ হয়ে যায়, যা এক জন বন্দুক হাতে যুদ্ধরত সৈন্যের  প্রতীকী চিত্রের প্রতি প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রও এই প্রতীক নির্মাণেই মনোনিবেশ করে, কারণ এর মাধ্যমে তা অনেক বাস্তব সমস্যাকে এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। তাই কোনো সৈনিক কর্মরত অবস্থায় যদি যথাযথ খাদ্য না পাওয়ার ক্ষোভ জানান, তখনই তাঁর পুরোনো রেকর্ড ঘেঁটে তাঁকে শৃঙ্খলাহীনতার অভিযোগে অভিযুক্ত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন এই প্রশ্ন ওঠে না যে আগেই এই ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে গুরুত্বপুর্ণ পদে রেখে দেওয়া হল। বা কোনো সৈনিক যখন নিজের সহকর্মীকে হত্যা করেন বা আত্মঘাতী হন, তখন এই প্রশ্ন ওঠে না যে রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার্থে যাঁরা দিনের পর দিন অসম্ভব মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করে যান, তাঁদের স্বার্থ দেখার দায় কাদের।

soldier2

অনেক সময়ই বহু জায়গায় বিভিন্ন সেনাকর্মীর গর্হিত অপরাধ করার খবর পাওয়া যায়। ভেবে দেখা প্রয়োজন যে তার পিছনেও কতখানি এই রাষ্ট্রের তৈরি করা রঙচঙে ভাবমূর্তির হাত আছে। কিন্তু আমরা অনেকেই অত তলিয়ে না ভেবেই রাষ্ট্রের দ্বারা সঞ্চারিত দেশপ্রেমের বশবর্তী হয়ে সৈন্যবাহিনীকে সর্বগুণসম্পন্ন মূর্তিপ্রতিম বানিয়ে উপাসনা করতে শুরু করি। আবার প্রয়োজন ফুরোলে, সেই মূর্তিকে বিসর্জন দিয়ে নতুন মূর্তি খুঁজি এবং এ ভাবেই দেশপ্রেমের সংজ্ঞা নির্মাণ হয় উর্দির প্রতি আবেগের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে কোনো গণতন্ত্রের পক্ষেই সামরিক উর্দির অর্চনা করা শুভ লক্ষণ নয়, দেশপ্রেম তো নয়ই। তার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন উর্দির আড়ালে যে সমস্যাগুলি এক জন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের, যেমন খাদ্যের গুণগত মান বা পেনশন সংক্রান্ত সমস্যা, সেগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া।

(লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের গবেষক)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here