mamata at jantar mantar
যন্তর মন্তরে ধরনামঞ্চে অন্য বিরোধী নেতাদের সঙ্গে মমতা। ছবি সৌজন্যে স্ক্রলডটইন।
প্রশান্ত ভট্টাচার্য

ক্রিকেটীয় পরিভাষায় নিখুঁত টাইমিং নয়, রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই এক মঞ্চে থেকেও থাকলেন না সীতারাম ইয়েচুরি, ডি রাজা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৩ ফেব্রুয়ারি দিল্লির যন্তরমন্তরে নিজেদের বক্তব্য রেখে ইয়েচুরি ও রাজা মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরই আবির্ভাব হল মমতার। রাজনৈতিক নিন্দুকরা বলছেন, এটাও ‘সেটিং’। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকেই তা মনে করেন না। তাঁদের বিশ্লেষণ, একই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যন্তরমন্তর মঞ্চ থেকে ঘোষণা করেন, “বাংলায় সিপিএম, কংগ্রেসের সঙ্গে আমাদের লড়াই কিন্তু জাতীয় স্তরে আমরা এক সঙ্গে।”

ঠিক একই রকম রাজনৈতিক কমিটমেন্ট থেকে এসইউসিআই (কমিউনিস্ট) দল বামদের ৩ ফেব্রুয়ারির ব্রিগেড থেকে দূরে থাকে। এটাকে কমিউনিস্ট পার্টির দিক থেকে রণনীতি ও রণকৌশলগত সমীকরণ বলা যেতে পারে। রণকৌশলগত ভাবে বিজেপি ও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে যত বেশি সংখ্যক দলের ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব, সে দিকে নজর রেখেই রাজা ও ইয়েচুরি যন্তরমন্তরের ধরনামঞ্চে হাজিরা দেন। ভবিষ্যতেও দেবেন। আবার বাংলার সংগঠনের কথা বিচার করে মমতার মেট্রো চ্যানেলের ধরনাকে সমর্থন তো করবেনই না পরন্তু ‘দিদি-মোদী সেটিং’ বলে কটাক্ষ করবেন। ভুলে যাবেন নিজেদের অতীতকে!

আরও পড়ুন পুলওয়ামা হামলা: ভোট নিয়ে গুজরাতি মন্ত্রী যা চান, তা কি মোদীজিরও মনের কথা?

আবার এই রাজনৈতিক বোঝাপড়া থেকেই রাজ্য সরকার বনাম সিবিআই টক্করে মমতার পাশে থাকে সিপিআই (এমএল)। দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, “সামনে লোকসভা নির্বাচন। ঠিক সেই সময় সিবিআইকে কাজে লাগিয়ে তদন্তের নামে রাজ্য সরকারের ওপর হামলা করছে কেন্দ্র। আমরা এর তীব্র নিন্দা করছি। বিজেপি নেতারা রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন চাপিয়ে দেওয়ার রব তুলছেন। দেশের সংবিধান ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে মোদী সরকারের চক্রান্ত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।” কেন্দ্রের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে রাজ্যবাসীকে সরব হওয়ার ডাক দিয়েছেন দীপঙ্কর।

আলিমুদ্দিন নিয়ন্ত্রিত বামদলগুলো বলতেই পারে, বাংলায় সিপিআই (এমএল)-এর কোনো দায় নেই, ওদের তাই অনেক কিছু মানায়! হবেও বা। কিন্তু এ প্রসঙ্গে সিপিএম পলিটব্যুরোর পক্ষ থেকে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি দেওয়া একটি বিবৃতি উল্লেখ করা যেতে পারে – “The use of central investigating agencies by the ruling party for political purposes should be a matter of serious public concern।” এই বিবৃতির পিছনের কারণ, লাভলিন কেলেঙ্কারিতে তখন অন্যতম অভিযুক্ত কেরল সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক পিনারাই বিজয়ন। সিপিএম পলিটব্যুরো লিখেছিল, ‘”কেরলের সিপিআই (এম)-এর রাজ্য সম্পাদক বিজয়নের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা। এখন লোকসভা ভোটের আগে ফের এই মামলায় তৎপরতা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করা গুরুতর চিন্তার বিষয়, এই রাজনৈতিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে সিপিআই(এম) জনগণের কাছে যাবে।”

আরও পড়ুন ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত বঙ্গের দুই ‘মার্কস’ প্রায় ‘অকেজো’, অপেক্ষায় রয়েছে সময়!

আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন, ছোট আঙারিয়া থেকে লাভলিন, দুর্নীতি মামলায় যে সিবিআইকে কেন্দ্রের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার বলে দিস্তা-দিস্তা খসড়া লিখেছেন মুজফফর আহমেদ ভবন বা এ কে গোপালন ভবনের কর্তারা, সেই সিপিএম বা বামরা এখন ইষ্টমন্ত্র জপের মতো সিবিআই জপছে। তারাই আজ বাংলায় সেই কেন্দ্রীয় সংস্থার তৎপরতা দাবি করে মিটিং-মিছিল করছে! এ-ও কি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা!

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো ঠিক কী কারণে কখন তদন্তে গতি এনে তৎপরতা দেখায় বা কখন প্রকারান্তরে ‘ঘুমিয়ে’ পড়ে, তা নিয়ে বামপন্থীদের বরাবরই একটা  পরিষ্কার অবস্থান ছিল, ব্যাখ্যা ছিল ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্য ও ভূমিকা সম্পর্কে। এখন কেমন ঘেঁটে গিয়েছে। একটা সুবিধাবাদী চর্চা এসে গিয়েছে। অথচ মতাদর্শভিত্তিক রাজনীতির কারবারিদের কাছে গুরুত্বের দিক থেকে রণনীতি এবং রণকৌশল সমান জরুরি। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কখনও রণনীতি অগ্রাধিকার পায় আবার কখনও উলটোটা।

আরও পড়ুন পৌনে পাঁচ বছর পর অন্তিমকালে কেন সিবিআই : মেরুকরণের অঙ্কে ফায়দা দিল্লি-কলকাতার

জানি না, যখন বিজেপিকে ঠেকানোটা ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে হিতকর বলে মনে করা হচ্ছে, তখন কি কে এক ছটাক, কে এক পোয়া, কে দেড় সুতো চোর, তা বিচার করাটা রণনীতি না রণকৌশল! যে চিটফান্ড নিয়ে এত রোল উঠেছে, বাম আমল তো তার আঁতুড়ঘর। এমনকি, এই সংস্থাগুলোর মধ্যে বহুচর্চিত সারদা, রোজভ্যালি এবং অ্যালকেমিস্ট-এর জন্ম ও বৃদ্ধি তো বৌদ্ধ শাসনে! পরে সেই চিটফান্ডগুলোর রমরমা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে। তাই সময়ের দাবি মেনেই বিজেপিকে প্রধান শত্রু চিহ্নিত করেও তৃণমূলকে অস্পৃশ্য রাখাটাই বাংলার সিপিএম ও কংগ্রেসের ঐতিহাসিক নিয়তি। আর সাংগঠনিক ক্ষেত্রে এক দিকে যেমন বিজেপি আগ্রাসন চালাচ্ছে, অন্য দিকে তেমন তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্যে ঘর রক্ষা কঠিন হয়ে গিয়েছে। অতএব রণকৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারেন সূর্যকান্ত মিশ্র-সোমেন মিত্ররা? ফলে এই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে মান্যতা দিয়েই দলের প্রধান হিসাবে সীতারাম ইয়েচুরি বা রাহুল গান্ধীকে বলতেই হবে, বেঙ্গল লাইন জিন্দাবাদ।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here