farukh ফারুক ভূঁইয়া রবিন

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর যে সব বিষয়কে সব চেয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে আসা হচ্ছে, তার অন্যতম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়। এ ব্যাপারে সরকারের নেওয়া  স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পদক্ষেপের বেশ কিছু ইতিবাচক ফল এরই মধ্যে লক্ষ করা গেছে। তবে গত ৬ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি হলেও দেশের সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। দেশের অন্যতম চালিকাশক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনও বড়ো প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করা হচ্ছে অপ্রতুল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি।

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি-চাহিদা মেটাতে যে সব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, তার অন্যতম বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। রামপাল প্রকল্পকে বিদ্যুতের জন্য ‘‌স্বপ্নের প্রকল্প’ হিসেবে দেখছে দুই দেশের সরকার। কিন্তু প্রকল্পটিকে ‘সুন্দরবনের জন্য দুঃস্বপ্ন’ মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। তাই এই প্রকল্পের বিরোধিতার আওয়াজ সীমান্তের দুই পারেই দিন দিন জোরালো হচ্ছে।  

সাধারণত কোনও চুক্তি হলে তার স্বচ্ছতা, মালিকানা, দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা হল — এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের বেলায় এ সব বিষয় ছাপিয়ে পরিবেশগত বিতর্কই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পৃথিবীর সব চেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের দূরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। বাংলাদেশ ও ভারতে প্রায় ১০ লাখ হেক্টর বিশাল জায়গায় বিস্তৃত সুন্দরবনের দুই-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশে পড়েছে। ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রে রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৫৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ১২০ প্রজাতির মাছ। এর মধ্যে বেঙ্গল টাইগার-সহ ১০টির মতো বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী রয়েছে।

রামপাল প্রকল্পটি সুন্দরবনের একদম কিনারায় হওয়ায় সুন্দরবনের স্বার্থ ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় গোড়া থেকেই এই প্রকল্প নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শুরুতে বাংলাদেশের পরিবেশবাদী ও বাম ঘরানায় নাগরিক সমাজ রামপাল নিয়ে আপত্তি তুললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিতর্কে নতুন হাওয়া লাগছে। এমনকি সীমান্তের ও-পারেও অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গেও সুন্দরবন রক্ষার তাগিদে রামপাল প্রকল্পের বিরোধিতায় নেমেছে নাগরিক সমাজ। যদিও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশগত ঝুঁকি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার কথা বলছেন সরকার ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা।

রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সারা বিশ্বে ৪১ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে কয়লা দ্বারা। যুক্তরাষ্ট্র, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতে যথাক্রমে ৪৯, ৮০, ৯৩, ৭৮, ২৭ ও ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের জোগান দিচ্ছে কয়লা। অন্য দিকে বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র আড়াই শতাংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কয়লা সহজলভ্য এবং উৎপাদন-খরচ তুলনামূলক কম দাবি করে রামপাল প্রকল্পের যৌক্তিকতা তুলে ধরছে সরকার।rampal2

তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে তাদের কোনও আপত্তি নেই। শুধু ‍সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থেই তাঁরা রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আপত্তি করছেন। এমনকি সুন্দরবনের ২৪ কিলোমিটার দূরত্বে খুলনার লবণছড়াতেও উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা।  

পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে জলপথে কয়লা পরিবহনের ফলে সুন্দরবনের অনন্য জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়বে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বায়ু, মাটি, পানি ও শব্দদূষণের ফলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের স্বাভাবিকতা বিনষ্ট হবে। মানুষের আগ্রাসনে ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে যাওয়া সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে সেই আগ্রাসনের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখছেন পরিবেশবাদীরা। 

সুন্দরবনের পাশে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে আন্দোলনকারীরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্গত কার্বন ও বিষাক্ত ধাতব পদার্থমিশ্রিত ছাইভস্মে আশেপাশের বায়ু ও পানি দূষিত হবে। নির্গত গ্যাসে বিদ্যমান ভারী ধাতু, সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড বায়ুদূষণ হবে। বায়দূষণকারী উপাদানগুলো মেঘমালার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে সুন্দরবনের অনেক গভীরে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য পানি আশপাশের জলাশয়ের পানিদূষণের কারণ হবে। ছাই থেকে সালফার ডাই অক্সাইড ছড়ানোর কারণে বন্য গাছপালা ধীরে ধীরে মারা যাবে। অ্যাসিড নিঃসরণের ফলে কমে যাবে ভূমির উৎপাদনক্ষমতা।

এ সবের নেতিবাচক প্রভাবে বিপন্ন হবে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য। এমনকি বাঘের জিনগত পরিবর্তন হওয়ার আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে স্পর্শকাতর নৌপথে কয়লা পরিবহন কারিগরি ও পরিবেশগত বিবেচনায় কতটা যৌক্তিক, সে বিষয়েও নীতিনির্ধারকদের প্রতি কড়া প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবনকে বাংলাদেশের রক্ষাকবচ উল্লেখ করে আন্দোলনকারীরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের একক ফুসফুস হিসেবে কাজ করে। সিডার ও আইলার সময় বাংলাদেশের মানুষকে মায়ের মতো আগলে রেখেছিল সুন্দরবন। তাই রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে হলেও সুন্দরবন রক্ষার তাগিদ দিয়েছেন আন্দোলনের প্রধান নেত্রী সুলতানা কামাল।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই রামপাল প্রকল্পের ফলে পরিবেশগত আশঙ্কার কথা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিকর সব ধরনের প্রভাব থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে রামপাল প্রকল্পে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। সম্প্রতি রামপাল প্রকল্প নিয়ে পরিবেশবাদীদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক হয়। কিন্তু বৈঠক শেষে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানায়। এমনকি বৈঠকে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাদানুবাদ হয় বলে জানা যায়। ওই আলোচনা শেষে সুলতানা কামাল বলেন, “আমরা এখন আর আশঙ্কা করি না। বরং আমরা নিশ্চিত, রামপাল প্রকল্প হলে সুন্দরবন শেষ হয়ে যাবে।”

এক দিকে সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, রামপাল প্রকল্পের বিরোধিতার পেছনে আন্দোলনকারীরা কোনও বৈজ্ঞানিক যুক্তিই দেখাতে পারছেন না, অন্য দিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাদের কখনও মনে হয়নি যে, প্রকল্প-কর্তৃপক্ষ হৃদয় থেকে কথা বলছেন।  

সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করার বিষয়ে ভারত সরকারের থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট গাইডলাইনকে বেশ জোরালো ভাবে তুলে ধরছেন আন্দোলনকারীরা। তবে আন্দোলনকারীদের এ দাবি মানতে নারাজ সরকার। রামপালের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের গাইডলাইন আন্দোলনকারীদের কাছে ‘বাইবেল-তুল্য’ মনে হলেও এটি কোনও আইন নয়, স্রেফ একটা পরামর্শ। আর সেই পরামর্শ খোদ ভারতেই মানা হচ্ছে না। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ-সহ কয়েকটি রাজ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যেই অনেকগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদাহরণ তুলে ধরে তাঁরা বলছেন, ভারতের গাইডলাইনটি ভারত নিজেই প্রয়োগিক মনে করছে না কিংবা আইনে রূপ দিচ্ছে না। তাই ভারতের সেই গাইডলাইনের বক্তব্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগের দাবি তোলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন রামপালের পক্ষের বিশেষজ্ঞরা।

সুন্দরবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে পরিবেশ সুরক্ষায় নানা ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছে রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) পক্ষ থেকে। বলা হচ্ছে, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সাফলার অক্সাইডের নিঃসরণ-হার হ্রাস করা এবং পার্শ্ববর্তী সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর তাপীয় প্রভাব কমানোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। পার্টিকুলেট ম্যাটারের মাত্রা কমানোর জন্য ব্যবহার করা হবে ইএসপি। থাকবে মারকারি রিমুভাল (পারদ দূরীকরণ) প্রযুক্তি। বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংযোজন করা হবে এফজিডি (ফুয়েল-গ্যাস ডিসালফারাইজেশন)। সাফলার অক্সাইডকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবহার করা হবে উন্নত মানের কয়লা।

বলা হচ্ছে, অত্যাধুনিক পানি পরিশোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে দূষিত তরল নির্গমন করা হবে। কয়লা থেকে উৎপন্ন ছাই শুকনো অবস্থায় সংগ্রহ করার উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এবং সেগুলো উপযুক্ত কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হবে। কোনও কারণে শতভাগ ছাই নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি করা সম্ভব না হলে হাই কনসেনট্রেশন স্লারি ডিসপোজাল (এইচসিএসডি) সিস্টেমের মতো উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে, যার ফলে জলাধারে ছাই মেশার কোনও সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া কয়লা আনা নেওয়া ও ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হচ্ছে, শব্দদূষণ এড়াতে উন্নত জাহাজে কয়লা পরিবহণ করা হবে। এ সব জাহাজ এত আস্তে চলবে যে, তাতে বনের প্রাণীদের কোনও সমস্যা হবে না। এ ছাড়া জাহাজের আলো খুব সীমিত হওয়ায় পানিতে কম্পনও কম হবে।

তবে সুন্দরবনের ঝুঁকি কমানোর জন্য যে সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাতে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না আন্দোলনকারীরা। তাঁরা বলছেন, পৃথিবীর কোনও প্রযুক্তিই শতভাগ দূষণ রোধ করতে পারবে না। বড় জোর দূষণ কমিয়ে আনা যাবে। কিন্তু এই অল্প দূষণও সাধারণ এলাকায় যতটা ক্ষতি করবে, সুন্দরবনে এর মাত্রা হবে কয়েক গুণ বেশি। আর এ কারণেই হয়তো সুন্দরবনের বিরোধিতায় শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের নাগরিক সমাজের একটি অংশও সোচ্চার।

বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক স্বপ্নের প্রকল্প হয়ে দাঁড়াবে নাকি সুন্দরবনের স্বাভাবিকতা সংহারী হয়ে প্রকল্পটি দুঃস্বপ্নে রূপ নেবে, তার উত্তর এখন বাদানুবাদেই আবদ্ধ। হয়তো প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর কিংবা তারও কিছু সময় পরে বোঝা যাবে প্রকৃত বাস্তবতা। কিন্তু দুই দেশের মৈত্রী প্রকল্প যে উভয় দেশের জনগণের একটা অংশের মধ্যে বিবাদ, অবিশ্বাস ও বিভাজনের বীজ বুনে দিয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here