all party meeting
কাশ্মীর নিয়ে সর্বদল বৈঠক। ছবি সৌজন্যে রেডিফমেল।
দেবারুণ রায়

বাংলার কবি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভিন্ন প্রেক্ষাপটে কলম ধরেছিলেন। রক্তের উদ্গারে তাঁর কলম লিখেছিল, “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।” এখানে সেই পটভূমি বদলে গিয়েছে। সক্রিয় রাষ্টযন্ত্র নয়, সার্বভৌম সরকারের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধে শামিল সীমানা-পারের মদতপুষ্ট মৌলবাদী জঙ্গি বাহিনী। ভূস্বর্গ কাশ্মীরে শয়তানের হাতে লেখা দিবারাত্রির কাব্য হল মৃত্যুর মিছিল। নেপথ্যে নানা কারণ নিহিত থাকলেও এই নৈরাজ্যের শেষতম অঙ্কে ঝিলমের জল লাল হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর দেশপ্রেমিক জওয়ানদের রক্তে। রক্তনদীর জল স্বচ্ছ নয় বলেই কেউ কারও মুখ দেখতে পায় না। এই মৃত্যু-উপত্যকা তো আমার স্বপ্নের স্বর্গ নয়!

পুলওয়ামার রক্তস্রোত কাশ্মীর নিয়ে আরও একবার এবং হয়তো সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রশ্নটাই তুলে ধরেছে। কোন অপরাধে সেনাবাহিনীর আরও ৪৪ জন তরুণ বা যুবকের মৃত্যুপরোয়ানা জারি ও কার্যকর করল সন্ত্রাসবাদীরা?

আরও পড়ুন পৌনে পাঁচ বছর পর অন্তিমকালে কেন সিবিআই : মেরুকরণের অঙ্কে ফায়দা দিল্লি-কলকাতার

এখনও পর্যন্ত পুলওয়ামার বিশ্লেষণ ও ময়না তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টযতটুকু আলো ফেলেছে তাতে প্রশ্ন উঠছে বেশ কিছু। কিন্তু সমস্ত প্রশ্ন শিকেয় তুলে রেখে, রাজনৈতিক তরজাকে বিরতি দিয়ে বিরোধীরা নিঃশর্তে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। যে সব বিরোধী নেতার নামে স্বস্তিবাচন না করে জলগ্রহণ করেন না শাসকদলের সব মাপের নেতারা, তাঁরা সাধারণত মেরুকরণের মন্ত্রপাঠেই অভ‍্যস্ত। নতুন পরিস্থিতিতে তাঁরা কী করবেন বুঝে উঠতে না পেরে থতমত।

আইনমন্ত্রী রবিশংকর পটনায় পৌঁছে অন‍্যান‍্য দিন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত লাইনেই বাইট দেন। এক একদিন তার ভিত্তিতেই সারা দিনের বিতর্কের ইস‍্যু হয়ে যায়। খবরের খরা থাকলে তো কথাই নেই। এ দিকে মিডিয়ার বিশেষ একটি অংশের ফেভারিট বিজেপি মুখপাত্র সম্বিৎ পাত্র কিংবা মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন, স্মৃতি ইরানি অথবা নিদেনপক্ষে প্রকাশ জাবড়েকররাও নিয়ম করে রাফাল কেলেঙ্কারির রফাদফা করতে জাতীয়তাবাদী প্রবচন আউড়ে দেশদ্রোহিতার পাকিস্তানি প্যাকেজ মুড়ে রাহুল গান্ধীর ষষ্ঠীপুজো করে এসেছেন যে কোনো বড়ো ঘটনায়। কিন্তু এই প্রথম সেই ছন্দে ছেদ পড়ল। এল নতুন অমিত্রাক্ষর। রবিশংকর পটনায় পৌঁছে বললেন, “সারা দেশ এখন একজোট। দুশমনের বিরুদ্ধে এই ঐক্য অভূতপূর্ব!”

এমন সংকটকালে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠাই রাজধর্ম। দলের চেয়ে বড়ো দেশ। তাই অতীতের ঘটনা টেনে এই ভাবগাম্ভীর্যের তাল কেটে দেওয়া অশোভন। বৃহত্তম গণতন্ত্রের এই শোভনতাই ভূষণ। কিন্তু উগ্র জাতীয়তার মতো পণ্য আর নেই। অশিক্ষা আর অর্ধশিক্ষার বেনোজলে লুকিয়ে রাখা নিষিদ্ধ অর্কুট, যা এক লহমায় ভুলিয়ে দেয় অনন্ত অভাব, সহজাত স্বপ্ন, হতাশার স্বপ্নভঙ্গের গ্লানি। তাই বৈদ্যুতিন মিডিয়ায় অষ্টপ্রহর বেজে চলেছে বদলার সংকেত। জাতীয় নেতার মুখে সমুচিত সাজার অনির্দিষ্ট অঙ্গীকার। সীমান্তের অপর পারের পাপ-শিবিরে আস্তিন গোটানো আস্ফালন।

ganpatsingh basava
গুজরাতি মন্ত্রী গণপতসিংহ বসাবা। ছবি সৌজন্যে জি নিউজ।

আমরা এত দিন যে সব চেয়ে পছন্দের দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে লালন করেছি তা জানল ভারতবাসী অরুণ জেটলির শুক্রবারের ঘোষণায়। ‘মোস্ট ফেবারড নেশন’ তকমা খারিজ হল পাকিস্তানের। অথচ কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্যে মোদী যে সনদটি রেখেছিলেন ‘১৪-য় ভারতীয় ভোটারদের কাছে, তাতে আগের প্রধানমন্ত্রীকে দুর্বল ও নিকম্মা বলে আখ্যায়িত করে সবল ও করিৎকর্মা নেতা হিসেবে নিজের প্রোজেকশন তো ছিল। আর নতুন ভারত এই যুক্তিতেই অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল মোদীকে। এই যুক্তিই ছিল মোদীভক্তির পরাকাষ্ঠা। কিন্তু তার ফল কী হল?

সবল প্রধানমন্ত্রীর সরকার পৌনে পাঁচ বছর রাজত্ব করে, বিশ্ব পরিক্রমা ও প্রথম সুযোগেই পাক প্রধানমন্ত্রীকে শপথে ডেকে ও প্রোটোকল বিসর্জন দিয়ে লাহোরে তাঁর বাড়িতে গিয়েও হক কথাটা বলেননি। সবল হয়েও পাকিস্তানকে পছন্দের রাষ্ট্র রেখেছেন কংগ্রেসের মতো করেই। তা হলে? কৃষ্ণ করলে লীলা?

উল্লেখ্য, অপ্রিয় কথন হলেও ইতিহাস অনস্বীকার্য। উরিতে জঙ্গিহানার পর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হল। এবং মোদী বললেন, ২৬/১১-র পর কংগ্রেস সরকার ঘুমিয়েছিল। কিন্তু দেখুন, আমরা বদলা নিলাম। কংগ্রেস বলেছিল, এমন ঘটনা অতীতেও ঘটেছে। কিন্তু আমরা ফৌজকে রাজনীতিতে টেনে আনিনি। এটা নীতিসঙ্গত নয়। কিন্তু ‘দুর্বল’ প্রধানমন্ত্রীর দলকে দেশবাসী দুয়ো দিয়েছে। টুজি কেলেঙ্কারির টুজি মানে সোনিয়াজি, রাহুলজি বলে ভেংচি কেটেছে। কিন্তু ১০ বছরে পাকিস্তানমুখো হননি মনমোহন। তাঁর জন্মস্থান শৈশবের স্বপ্ন সীমান্তের ও পারে বলে নস্টালজিক হননি।

আরও পড়ুন বিজেপির বুনো ওল আর কংগ্রেসের বাঘা তেঁতুল: লংকাদহনে প্রিয়ঙ্কা

যুদ্ধের বাস্তবতা নেই দু’টি পরমাণু শক্তিধর দেশের। তাই কূটনৈতিক অস্ত্রেই শান দিয়েছেন। ২৬/১১-র দোষীদের শাস্তি হয়নি বলেই পাকিস্তানে পা রাখেননি। যা সবল প্রধানমন্ত্রী রেখেছেন। এবং ডোকলামের মতো ডামাডোল বাধেনি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব ও সদ‍্য ভারতরত্ন খেতাবে ভূষিত বিদেশমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির মুনশিয়ানায়। মোদী জমানায় ডোকলাম ও আস্ফালন এবং গুজরাতে চিনা প্রেসিডেন্টের পদার্পণ। হাতির দু’টো দাঁত। একটা চিবোনোর আর একটা দেখানোর। হিন্দিতে কহাবৎ আছে।

মোদীর থেকে ২০ বছরের ছোটো ও অভিজ্ঞতায় আরও কম রাহুল গান্ধী। রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছেন। পৃথিবীকে দেখেছেন তিনজন প্রধানমন্ত্রী ও ৩৮ বছরের ভারত-শাসকের বংশধরের চশমায়। কিন্তু এই সব শিরোপাই তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারের জ্বালানি জুগিয়েছে, যা চা-ওয়ালার ঐশ্বর্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অক্ষম। সুতরাং আগাগোড়া অসম জমিতে দাঁড়িয়েই রাহুলকে প্রমাণ করতে হচ্ছে তাঁর সততা, দক্ষতা ও একনিষ্ঠতা।

গণতান্ত্রিক শোভনতার একটা পরীক্ষায় তো রাহুল সংকীর্ণতা এড়াতে পারলেন। পুলওয়ামার পরে একতরফা ভাবে লেগ পুল না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে। বাকি বিরোধীরা সংহতির স্বাক্ষর রেখেছেন। এবং বিপরীতে একটা অসতর্ক মন্তব্য চমকে দিয়েছে দেশকে। গুজরাতের আদিবাসী উন্নয়ন ও পর্যটনমন্ত্রী গণপতসিংহ বসাবা হুংকার ছেড়েছেন, লোকসভা নির্বাচন দু’ মাস পিছিয়ে দিন। পাকিস্তানকে সবক শেখানো অনেক বেশি জরুরি। মহামান্য মোদী, এটা কি আপনারও আত্মার আওয়াজ?