narendra modi, rahul gandhi

দেবারুণ রায়

লোকসভায় গত রাতের অনাস্থা বিতর্কের পর বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের দাবির জবাব দিতে একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভাবে তূণের তিরগুলো  একে একে তুলে নিলেন তা কিন্তু সংসদ থেকেই শুরু হতে পারতকিন্তু তৃণমূল নেতাদের সীমাবদ্ধতা ও অপারগতার দরুণ তা সম্ভব হয়নিশুধু তৃণমূল কেন, কোনো জাতীয় দলের নেতাই মোদীর মোকাবিলা করার আগ্রহ দেখাননিসর্বোপরি, সত্তর বা আশির গোড়ার দিককার  কোনো সংসদবেত্তা লোকসভায় ছিলেন কি না সেটাই প্রশ্নতৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় সত্তর দশকের সাংসদচরণ সিং সরকারের মন্ত্রী ছিলেন তিনিকিন্তু মোদী যখন চৌধুরী চরণের সরকার ফেলার কথা বলে বিরোধীদের  মধ্যে কংগ্রসকে একঘরে করতে চাইলেন, কংগ্রেস বেঞ্চ নীরব থাকল কেন?

কংগ্রেস বেঞ্চে সিনিয়র সাংসদের অভাব এর কারণ হতে পারেকিন্তু অন্য বিরোধী দলের বেঞ্চে তো সিনিয়র সাংসদরা ছিলেনসুগত বসুর মতো ঐশ্বর্যশালী ইতিহাসবিদ সাংসদ ছিলেনতবুও কার্যত ফাঁকা মাঠেই গোল দিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদীকেন এ কথা বলা গেল না যে ভারতের প্রথম অকংগ্রেসি সরকারের স্থিতিশীলতাকে টলিয়ে দিয়েছিল পূর্বতন জনসংঘীরা অর্থাৎ এখন যারা বিজেপিতখন শাসক জনতা পার্টির পূর্বতন জনসংঘীরা ঘোষণা করেছিলেন, তাঁরা দল ছাড়বেন কিন্তু আরএসএসের সদস‍্যপদ ছাড়বেন নাঅথচ স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণের ডাকে সাড়া দিয়ে চারটি দল নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে  জনতা পার্টিতে মিশে গিয়েছিলকিন্তু দেখা গেল, জনসংঘীরা আরএসএসের সদস‍্যপদ ছাড়েননিএ হেন দ্বৈত সদস‍্যপদ নিয়ে প্রশ্ন উঠল দলেজর্জ ফার্নান্ডে্জের নেতৃত্বে সমাজবাদীরাই দাবি তুললেন, দ্বৈত সদস‍্যপদ ছাড়তে হবেপ্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই অনুমোদন করলেন এই দাবি শেষ পর্যন্ত জনসংঘীরা অনড় থাকাতেই সরকারের গদি টললকফিনের শেষ পেরেক পুঁতলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চরণ সিংসুযোগ বুঝে চরণকে প্রধানমন্ত্রী করার টোপ দিয়ে মোরারজি সরকার উলটে দিলেন ইন্দিরাএবং সেটা ছিল তিন বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা ইন্দিরার তখ্‌তে ফেরার চালদেশবাসী তাঁকে স্বাগত জানাল ৮০-তেএমনকি  সেই নির্বাচনে সদ‍্যোজাত বিজেপিকে ছেড়ে ইন্দিরার কংগ্রেসকেই সমর্থন করল আরএসএসলোকসভায় ৩০০ পেরিয়ে গেল কংগ্রেস, আর বিজেপি পেল মাত্র ২বাজপেয়ী হেরে গেলেন গোয়ালিয়রে কংগ্রেসের কাছে। আডবাণী ছিলেন রা্জ‍্যসভায়লোকসভায় উল্লেখযোগ্য কোনো নেতাই রইল না বিজেপিরআরএসএস ওই নির্বাচনে জনতা পার্টিকেই হারানোর লক্ষ্যে রণনীতি বদলেছিল রাতারাতি

নিজের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের বয়স কম হওয়া ও সংসদীয় রাজনীতি সম্পর্কে  উপযুক্ত অধ‍্যয়নের অভাবে  রাহুল গান্ধীকে মোদীর হুল হজম করতে হয়েছেকংগ্রেস দল বহু সংসদবেত্তা কুশলী নেতায় ঋদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও লোকসভায় তেমন কারো অনুপস্থিতিতে  অনাস্থা বিতর্ক কার্যত হয়ে উঠেছে বিরোধীদের ফ্লপ শোনা হলে কংগ্রেস নেতৃত্বকে কোণঠাসা করতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদী যে সব বহু ব‍্যবহৃত আপ্তবাক‍্য  ব‍্যবহার করেছেন তা দিয়েই প্রধানমন্ত্রীর তাবৎ প্রবচন নস‍্যাৎ করে দিত বিরোধীরাকিন্তু বিরোধী শিবিরের দারিদ্র প্রমাণিত হল কাল রাতেপ্রমাণ হল, আজকের লোকসভা চেনে না  ভারতের রাজনীতির সেই সব নীলনয়ন  কুশীলবদের, যাঁদের বক্তৃতা শেষ হলে প্রধানমন্ত্রীরাও অবনত হতেনকখনও আসন ছেড়ে এসে হাত মেলাতেন অমোঘ নৈতিক হার স্বীকার করেএবং ট্রেজারি অপোজিশন ভুলে গোটা সভা টেবল চাপড়ে জানাত অভিনন্দন, কখনও বা স্ট্যান্ডিং ওভেশননা, এটা নেহরু, পটেল, কৃপালনি, লোহিয়া অথবা তারও পরে মধু লিমায়ে কিংবা হীরেন হীরেণ মুখার্জির কালের কথাও নয়গত শতকের শেষ পর্বের ত্রিশঙ্কুকালের কথাসে দিনের ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, সৈফুদ্দিন চৌধুরী, বিশ্বনাথপ্রতাপ, চন্দ্রশেখর, জয়পাল রেড্ডি, জর্জ ফার্নান্ডেজ, মণিশংকররা মাতিয়ে রাখতেন লোকসভাবাম-সমর্থিত কংগ্রেসি জমানায় নব রূপে লোকসভায় এলেন প্রণব মুখার্জি তিন দশকের রাজ‍্যসভা ছেড়েবিরোধী বেঞ্চে বসা বাজপেয়ী, আডবাণীর মতো প্রাতঃস্মরণীয় সংসদবেত্তাদেরও মালুম হয়েছে সরকার পক্ষের একজনের যুক্তি অকাট‍্য। তিনি প্রণবযেমন শ্রদ্ধা পেতেন পিভি নরসিংহ রাও বা অর্জুন সিং

আরও পড়ুন : প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ চন্দন মিত্রের তৃণমূলে যোগদান নিয়ে তোলপাড় সর্বভারতীয় রাজনীতি

কালিদাসের কাল তো কবেই গিয়েছেএ কালের স্টলওয়ার্টরাও প্রায় স্মৃতিহাতে গোনা যে ক’জন আছেন তাঁরা স্বভাবতই দলীয় প্রভুত্বের পদানতযে কারণে শাসকদলে বক্তা হিসেবে কলকে পান না সুষমা স্বরাজ। আডবাণীকে তো পাঠানোই হয়েছে মার্গদর্শকের আসনেওটি দর্শকাসনভারতের রাজনীতিতে বিজেপি প্রবর্তিত আওরঙ্গজেবের নয়া পাঠশালারাজনীতি বা সংগঠনে বেশি জ্ঞানের পুরস্কারবাজপেয়ী শয্যাগত, পরের প্রজন্মের দুর্দান্ত বক্তা প্রমোদ মহাজন প্রয়াতথাকলেও মোদীর শাহি জমানায় পাত্তা পেতেন নাযেমন পান না সুষমা, এমনকি রবিশংকরের মতোও বিপক্ষের গায়ে জ্বালা ধরানো বক্তাজাতীয় রাজনীতিতে অনেক পরে ঢুকে এবং আরও পরে আগ্রহী হয়েও নির্দিষ্ট নক্ষত্রবলে বলিয়ান মোদীই তাঁদের মোক্ষপথের দিশা

এবং কংগ্রেসের শেষ পারানির কড়ি রাহুলের হাতেঅগত‍্যা জাতির গতি বিজেপির বিধিবদ্ধ বিকল্প গত রাতে বিরোধীদের নাগপাশ এড়াতে মোদী যে বাস্তব ও কল্পনায় মেশানো রেসিপি পরিবেশন করেন তার ভেজাল ধরতে অনায়াসেই পারতেন সনিয়া‌। কংগ্রেসের অতীত তাঁর অজানা নয়মোদীর প্রতিটি কথার অকাট্য উত্তর ছিল তাঁর কাছেকিন্তু নিজেকে পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে কখনও তুলে ধরতে চাননিযদিও ইউরোপের আলোকিত সত্তায় ভারতের জাতীয়তাকে আত্মস্থ করেছেন সনিয়াসূতরাং তাঁর পক্ষে দুঃসাধ্য ছিল না মোদীর সামান্য যুক্তি খন্ডনবিশেষত যখন তাঁর হাতে ছিল কংগ্রেসের প্রায় দু’দশকের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির মন্থনপর্ব। ওই সময় নিয়ে তাঁকে ব‍্যক্তিগত আক্রমণ করে মোদী তাঁর হাতে অস্ত্রও তুলে দিয়েছিলেনকিন্তু ক্ষমাসিদ্ধা সনিয়া এড়িয়ে গেলেন যুক্তি-তক্কো প্রাধান্য দিতে চাইলেন গপ্পোকেকারণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে রাহুলকেলোকসভায় প্রণববাবুর মতো সেনাপতি নেইনেই নিদেনপক্ষে চিদম্বরমের মতোও কেউ এক্কেবারে নব‍্য ব্রিগেডের  জোতিরাদিত‍্য এমনকি গৌরব গগৈকেও তুলে ধরা চলবে নাযা ওদের আছে তা রাহুলের তো নেইমনমোহনী ভাষণ-ক্ষমতাঅতএব ঝাপ্পিওটাই অমরত্ব পাবে এই আকালেবিজেপির স‍্যুটেবল বয় মোদীর বিকল্প হিসেবে রাহুলই ফেভারিট

আরও পড়ুন : রবিবারের পড়া: “এই ভাবে ফুটবল খেলতে হয়, এই ভাবে ফুটবল অনুভব করতে হয়”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here