rahul, sonia, maya file picture
ফাইল ছবি। সৌজন্যে দ্য হিন্দুস্তান টাইমস।
debarun roy
দেবারুণ রায়

খোদ হিন্দি বলয়েই হিড়িক উঠেছে পরিবর্তনের। কোথাও পনেরো, কোথাও কুড়ি, কিংবা কোথাও পাঁচ বছর পরই বিজেপির গরু দুধ দেয়নি। দেওয়ালের লিখন ছিল। হাওয়াতেও গদি ওলটানোর গল্প ছিল। কিন্তু গল্পকে কেউ সত্যি বলে ভাবেনি। রাজনীতিতে কম অভিজ্ঞ রাহুল গান্ধী, সচিন পায়লট আর জ‍্যোতিরাদিত‍্য সিন্ধিয়ারা যত বলেছেন ততই তাঁদের ব‍্যঙ্গবিদ্রুপ করে প্রধানমন্ত্রী সপারিষদ তুড়ে দিয়েছেন, সব ঝুঠ হ‍্যায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়ের মতো আদি অকৃত্রিম ঘাঁটি থেকেও উচ্ছেদ হবে বিজেপি সরকার, এ কথা কেউ ভাবেনি।যে সব এলাকায় পদ্মবীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল, সেখানেই শিকড় ছিঁড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে ২২ রাজ‍্যের শাসকদলের প্রতীকচিহ্ন। সর্বশক্তিমান বলে তুলে ধরা ৫৬ ছাতির ১৫ বছরের মুখ‍্যমন্ত্রী ও সাড়ে চার বছরের প্রধানমন্ত্রীর  কথা কে ফেলবে?  তাই আসমুদ্রহিমাচল হিন্দুহৃদয়সম্রাটের নাটকীয় ভাষণ শোনার অপেক্ষায় দিন গুণছিল। কিন্তু দেখা গেল ফাঁকের সঙ্গে তাল মিলছে না। বিদেশি ব‍্যাংক থেকে লক্ষ‍ লক্ষ‍ কোটির অঙ্কে কা্লো টাকা গরিবের ব্যাঙ্ক আমানতে যেমন আসেনি। যেমন স্বপ্নে পাওয়া রাশি রাশি টাকা ধরাছোঁয়ার বাইরে ডানা মেলে উড়ছে, তেমনই পুরো অচ্ছে দিনের আশা।

আরও পড়ুন মোদীর প্রচারে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করল বিজেপি!

শেষ পর্যন্ত মসনদি নেতাদের ব‍্যঙ্গবিদ্রুপের পাত্র পাপ্পুর কথাই মিলে গেল অক্ষরে অক্ষরে। হিন্দি-হৃদয় জয় করল মূল বিরোধীদল। সব মত পথ ধর্ম বর্ণ ভুলে অভূতপূর্ব জোটের লক্ষ‍্যে এক হচ্ছেন বিজেপি-বিরোধী নেতারা। তাঁরা এক সুরে বলছেন, উনিশে ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত। শীতের শুরুতেই বাতাসে বসন্তের লক্ষণগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে‌।  বিরোধী জোট ভাঙার চেষ্টার কোনো কসুর করেননি জাতীয় রাজনীতিতে নিও কাল্টের প্রবক্তা মোদী ও তাঁর ডানহাত শাহ।শেষ পর্যন্ত ভাঙতে না পেরে ক্ষিপ্ত শাহকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘বেড়াল কুকুরের জোট।’ এতে অলিখিত জোটের অদৃশ্য বাঁধন আরও পোক্ত হয়েছে। বেড়েছে পরিধি। ১১-র ফলাফলের পরই গোপন রণকৌশল প্রকাশ হয়ে পড়েছে। বোঝা গিয়েছে, মায়াবতী মোটেও নন নবীন পট্টনায়েক বা  কে চন্দ্র শেখর রাও।‍ মাটির রাজনীতিতে অনেকেই তাঁর মতো পোড় খাওয়া। ছত্তীসগঢ়ের ভোটে অজিত যোগীর সঙ্গে জোট করার পর মায়াবতীকে অনেক বিষাক্ত অপবাদ হজম করতে হয়। কিন্তু পরিণত নেত্রী হিসেবে তিনি লোকসভায় জোটের রাস্তা খোলা রাখেন সনিয়া-রাহুলের প্রশংসা করে। ফলাফলের পর মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের সরকার গড়া নিয়ে জটিলতা দেখা দিতেই নিঃশর্ত ভাবে কংগ্রেসকে সমর্থন ঘোষণা করেন। একই সিদ্ধান্ত জানায় অখিলেশের দলও। মমতাও বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে বিরোধী ঐক‍্যের ওপর জোর দেন। প্রমাণ করেন, তিনিও মূল স্রোতে। অবশ্য যে যেখানে শক্তিশালী সে সেখানে লড়বে, এই বলে খোঁচ রেখে দেন স্বভাবসিদ্ধ ভাবে। কিন্তু বিজেপির বিরুদ্ধে সেকুলার শিবিরে যে তিনি আছেন ও থাকবেন তাতে সন্দেহ নেই। অন‍্য দিকে, মায়াবতী তাঁর বিজেপি-বিরোধী  অবস্থান স্পষ্ট করার অর্থ অজিত যোগীও এ দিকে থাকতে বাধ্য।

ও দিকে, কাশ্মীরে ভোট হলে যে দল সরকার গড়বে সে দলেরই সর্বোচ্চ নেতা ফারুক আবদুল্লাহ উনিশে মোদী বি্দায়ের ঘণ্টা বাজিয়ে রাহুলকে বিরোধী জোটের নেতা মানেন নির্দ্বিধায়।

আরও পড়ুন কেরলে মন্দির ফ্লপ: মার খেল বিজেপি, বিপুল জয় বামেদের, ধাক্কা কংগ্রেসের

এই দফায় বিজেপি প্রকৃত অর্থে শূন্য হাতে ফিরি হে। গৌরবে বহুবচন হওয়ার চেষ্টা রয়েছে মিজোরামে। রাম-রাজনীতি অচল এই গোভক্ষক গরিষ্ঠতার রাজ্যে। আঞ্চলিক এমএনএফ সরকার চালাবে তাদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী। সেখানে এই দুঃসময়ে পা রাখার জায়গা পেয়েই খুশি থাকবে বিজেপি। গো বলয়ে গোঁত্তা খেয়ে কংগ্রেসমুক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখতে হলে মোদীকে জুটি-সহ উত্তরপূর্বে ক‍্যামপ করতে হবে। যদিও সর্বত্র কংগ্রেসই বিরোধী শক্তি। সুতরাং পালাবার পথ কই? দক্ষিণে যে স্বেচ্ছানির্বাসনে যাবেন, তা-ও দূর অস্ত। কর্নাটক তো আছেই। তেলঙ্গানাতেও বিজেপি তো কংগ্রেসের চেয়ে অনেক নীচে। প্রকাশ‍্যে কেসিআর বিজেপিকে সঙ্গে নেবেন না। সুতরাং বিরোধীপক্ষে বসতে হবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে!  নির্বাসনেও মুক্তি নেই। মোদীজি, এ কোন ভারতবর্ষ! হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান-এর স্বপ্নের কী হবে? হিন্দুরাষ্ট্রের অপেক্ষা করলে হবে না। উনিশে আপনি  ফিরলে আগে ভারত আর ইন্ডিয়া নাম বদলাতে হবে।

২৬ বছর আগে গুঁড়িয়ে গিয়েছে ধাঁচা।২৬ বছরের যুবক তো মসজিদ দেখেনি। দেখছে মন্দিরই। তার কাছে অযোধ্যা আর ইস‍্যুই নয়।

আ্যজেন্ডায় আর রাম রেখে কাম কী? মানে মরশুমি মন্দিরের কী হবে? ২৯ বছর ধরে দেশ, প্রদেশ নানা ভোটের ভোগ চড়ানো হয়েছে। এ বারই বা কম কী হল? খোদ যোগী অযোধ্যায় কত কী করলেন। মন্দিরের দেরি দেখে রামের মূর্তি বসানোর কথা বললেন। পটেলের চেয়েও লম্বা হবেন রামজি। ভোট বুঝে আরও কত কী হল। হাতের পাঁচ ধর্ম সংসদ মানে ধর্ম-রাজনীতি মঞ্চের অধিবেশন হল। আদালতকেও রাম-চাপ দেওয়া হল। কিন্তু কী হল। আদালত যা বলল, তাতেই গোটা দেশ তারিফ করতে থাকল। গোটা অযোধ্যা মন্দির গেল সরযূতে। রাম এখন বাম। ২৬ বছর আগে গুঁড়িয়ে গিয়েছে ধাঁচা।২৬ বছরের যুবক তো মসজিদ দেখেনি। দেখছে মন্দিরই। তার কাছে অযোধ্যা আর ইস‍্যুই নয়। কেন হবেই বা? মোদীর ‘সব কা সাথ সব কা বিকাশ’-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? ওটাই তো ভোটের নারা। নারা বদলে পরের ভোট? কিন্তু তিরিশ বছর আগের সেই রামও নেই, নেই সেই অযোধ্যাও।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here