rahul gandhi, narendra modi
ছবি সৌজন্যে দ্য নিউজ মিনিট।
debarun roy
দেবারুণ রায়

তারিখটা ছিল ২৫-২৬ জুন। মধ্যরাত বা শেষ রাত। সাল ১৯৭৫। স্মৃতি থেকে লিখছি। জয়প্রকাশ নারায়ণ সে রাতে পাটনার কদমকুয়াঁয় তাঁর বাড়িতে ছিলেন না। ছিলেন দিল্লিতে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে দেশে অভ‍্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারির সঙ্গে সঙ্গেই সেই মুহূর্তে রাতের কড়ানাড়ায় হানা দিয়েছিল পুলিশ জয়প্রকাশ নারায়ণকে গ্রেফতার করতে। ২৬ জুন ভোরের আলো ফোটার আগেই পার্লামেন্টের ডাকসাইটে বিরোধী এমপি, নেতা ও সংগঠকদের সারা দেশের আস্তানায় হয়েছিল একই রাতের কড়ানাড়া। কালাকানুন ‘মিসা’ বা জামিনঅযোগ্য ফৌজদারি দণ্ডবিধি কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় প্রতিবাদীদের জেলে পুরেছিল পুলিশ। এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ভারত জুড়ে গড়ে ওঠা জেহাদ রাতারাতি হয়ে উঠেছিল ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতার আন্দোলন।

আরও পড়ুন জোটের মায়া, মহাজোটের ছায়া, ভাতিজা দেখছে রাজ্যের সিংহাসন

প্রথম স্বাধীনতার লড়াইয়ে আরএসএসের সম্পূর্ণ নেতিবাচক ভূমিকা থাকলেও অস্তিত্ব রক্ষার বাধ্যতা তাদের লোকনায়কের পাশে দাঁড় করিয়েছিল দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জনের দিনে। তাঁর হাতে গড়া দলে মিশে গিয়েছিল জনসংঘ, নিজেদের অস্তিত্বের বিলোপ ঘটিয়ে এবং আদর্শ, কর্মসূচি পরিবর্তন করে। উল্লেখ্য, জনসংঘ ছিল সংঘেরই রাজনৈতিক শাখা। কিন্তু ইতিহাসের খেয়াল যে কত রহস্যময় তার প্রমাণ মিলল দু’ বছর যেতে না যেতেই। কার্যত পূর্বাশ্রমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দল ভেঙে বিজেপি গড়লেন প্রাক্তন জনসংঘী ও আরএসএসের স্বয়ংসেবকরা। পরিবর্তনের সরকার পড়ে যাওয়ায় ক্ষমতায় ফিরে আসার সুযোগ পেলেন ইন্দিরা। এবং ইতিহাসের গর্ভে যে আরও কত জটিল রহস্য লালিত হচ্ছিল তার প্রমাণ মিলল ‘৭৯-‘৮০-তেই। সদ‍্যোজাত বিজেপিকে ছেড়ে আরএসএস তলে তলে নির্বাচনে সমর্থন করল ইন্দিরার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসকে, উগ্র জাতীয়তাবাদী অ্যাজেন্ডায়। ফলে ওই লোকসভা নির্বাচনে বাজপেয়ী-সহ বিজেপির সব তাবড় নেতাই পরাজিত হন।

সংঘ ও বিজেপির রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার খেই ধরিয়ে দেওয়ার জন্যেই এই কালখণ্ডের পুনরুল্লেখ। আরও সুনির্দিষ্ট করে ইন্দিরা জমানার উল্লেখের কারণ, সংঘ ও বিজেপি নেহরু, রাজীব, সনিয়া, রাহুল সম্পর্কে যতটা আক্রমণাত্মক, ইন্দিরা সম্পর্কে ততটা নয়। তার কারণ কালে কালে প্রকাশ পেয়েছে। বাবরি ধ্বংসের পরবর্তী সময়ে মেরুকরণের রাজনীতি দেশের মূল অ্যাজেন্ডা হয়ে ওঠায় শত্রু-মিত্রের সংজ্ঞা বদলে গিয়েছে। যদিও বিজেপিই একমাত্র দল যারা এখনও জরুরি অবস্থার বার্ষিকী পালন করে। কিন্তু কংগ্রেস-সহ প্রায় সব বিরোধীদলই চলতি সাড়ে চার বছরে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারির জোরদার অভিযোগ এনেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারেরই বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, ব‍্যাংককে জড়িয়ে ঘনিষ্ঠ ব‍্যাবসায়ী বা শিল্পপতির জালিয়াতির বা কেলেঙ্কারির। ইন্দিরা জমানার রুস্তমজি নাগরওয়ালা কেলেঙ্কারির কথা মনে করিয়ে দেয় এ কালের নীরব মোদী, মেহুল চোক্সিরা। কিংবা আরেক মোদী ও মাল‍্যের সুসমাচার। ইন্দিরার গরিবি হঠাও আর মোদীর অচ্ছে দিনেই কি কোনও মৌলিক ফারাক চোখে পড়ে ? এর পর ক্ষমতার অলিন্দে শাখা-প্রশাখা ছড়ানো ও ক্ষমতার শীর্ষে যে কোনো মূল্যে টিকে থাকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে রাজ‍্যে রাজ‍্যে রাজ‍্যপালের বদান্যতায় গরিষ্ঠতার অংকে জল মেশানোর যে তাবৎ অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে, সেই সব ক’টিই ষাট বছর ধরে শোনা গিয়েছে কংগ্রেসের সরকার ও দলের বিরুদ্ধে। এবং অনন্ত প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, কোটি কোটি টাকার অপচয়ে অগ্রাধিকারের ফেরবদলের নৈরাজ্য পেরিয়ে বিনা ভোটে ব‍্যাকডোর দিয়ে সরকার বদল-দখলের খেলাতেও পিছিয়ে নেই বিজেপি। রাজনীতিতে কংগ্রেসের অবদান বলতে সিদ্ধ ছিল যে আয়রাম গয়ারাম, তা-ও বহু দিন কং-হাত ছাড়া। ইউএসপি, ব্র‍্যান্ড যাবতীয় হাইজ্যাক করে নিয়েছে আজকের শাসক। এবং কংগ্রেসি কু-অভ‍্যাস আগাগোড়া রপ্ত করার পাশাপাশি কংগ্রেস-মুক্ত ভারত গড়ার স্লোগান দিয়েছে। ‍

আরও পড়ুন মেরুকরণে জুড়ল উঁচু জাত, মোদীর পাশা উলটে দিতে পারে নিচুতলার জোট

বিহারে নীতীশ কুমার কোন কৌশলে ক্ষমতায় রয়েছেন তা জানেন যেমন ভারতবাসী, তেমনই গরিষ্ঠতার অমিল অংক মিলিয়ে দিয়েছে শাসকদল মণিপুর কিংবা গোয়ায়। এখন কর্নাটকের নির্বাচনী-জয় দূর অস্ত বুঝে, গুজরাতি বা আদ‍্যিকালের উত্তরপ্রদেশী টোটকা বরাদ্দ হয়েছে ইয়েদিয়ুরাপ্পার সরকার গড়ার জন্যে। এই নিয়ে বার বার ক’বার হল? দু’জন নির্দল বিধায়কের সমর্থন প্রত‍্যাহার দিয়েই তুরুপের তাস চোখে পড়েছে সবার। কিন্তু তাতেও কুমারস্বামী সরকার নট নড়নচড়ন দেখে আরও ছিনতাই-হানা হওয়ার কথা তো ছিলই। কিন্তু এ বিদ‍্যার পেটেন্ট যাঁদের হাতে তাঁরা ততক্ষণে গার্ড নিয়েছেন। এ বার শাসক জোটের তরফে পালটা চাল আঁচ করে রক্ষণাত্মক মুদ্রায় ইয়েদিয়ুরাপ্পার ১০৪ জন প্রাণভোমরা নিয়ে মোদী-শাহীর উস্তাদগণ পগার পার গুরুগ্রাম। হরিয়ানার কংগ্রেসিরা কি কিছু কম যান? রামলাল, বংশীলাল, ভজনলালের ভূমিই তো একদা এ শিল্পের আঁতুড়ঘর ছিল। তা ছাড়া, গুজরাতের গেরোই তো এখনও খুলতে পারেননি বাঘা বাঘা শিকারি। গান্ধীনগর থেকেই সেই প্রথম পিছু হঠা শুরু বিজেপির। স্নায়ুর লড়াইয়ে পাঞ্জা কষে কমল-শিবিরকে মাত করলেন আহমেদ পটেল। রাজ‍্যসভায় তাঁর জয়েই গুজরাতে নয়া পর্বের সূচনা। তার পর বিধানসভায় বড়োসড়ো ধাক্কা। খোদ সর্বশক্তিমান প্রধানমন্ত্রীকে হোঁচট খেতে হল নিজের রাজ‍্যে নয়া জমানার জোটের কাছে। নেতা হিসেবেও পরীক্ষিত হলেন রাহুল এই প্রথম। জয়ের আভাস দিল গুজরাত। তার পরের দফার বিধানসভা ভোট হিন্দি বলয়ের গেরুয়া গড়ে। মূল দুর্গ দখল হল অবিশ্বাস্য ভাবে। ভোটের হারে এগিয়ে কমল, আসনে কমলনাথ। সুতরাং ঘা খাওয়া নাগিনীর মতোই ফুঁসছে বিজেপি। সুযোগ পেলেই ছোবল দিতে প্রস্তুত। সংখ‍্যার খেলা শুরু হবে যে কোনো মুহূর্তে। কিন্তু বুনো ওলের পালটা যে বাঘা তেঁতুল! অবশ্য স্বভাবতই হিন্দি বলয়ে প্রবেশের প্রথম চাবিকাঠি বিজেপির কাছে মধ্যপ্রদেশ, যা জয় করতে মন্দির-মসজিদ-রথ লাগেনি। গুজরাতের সমান্তরাল দাবি মধ্যপ্রদেশ। তাই যে কোনো পথেই সরকার দখলের চেষ্টা ছাড়েনি তারা। যদিও এই ধরনের পদক্ষেপ ক্ষতি করবে শাসকদলের। যেমন ক্ষতি করছে উত্তরপ্রদেশে। কট্টরপন্থা তো আছেই। সেই সঙ্গে সত্তার অহংকার। চূড়ান্ত ধর্মীয় মেরুকরণ প্রথম দফায় একচেটিয়া বিজেপির মুনাফায় মদত করলেও, জোয়ারের পর এখন ভাটির টান। মেরুর ফায়দা এ বার ঘরে তুলবে বিপরীত পথের যাত্রীরা‌। গোয়েন্দাদের কাছেও স্পষ্ট সংকেত পাচ্ছেন শাসকরা। এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পর পর ভুল সিদ্ধান্তে সিলমোহর। উত্তরের লোকসভা উপনির্বাচনগুলো চোখ খোলাতে পারেনি। এক দিকে এনডিএর ভাঙন আর অন্য পাড়ে মরাগাঙে জোয়ার। এর মধ্যে উচ্চবর্ণের জন্য সংরক্ষণ নিম্নবর্ণের দলগুলোকে একজোট করল। জাতি মতান্তরে শ্রেণির সংঘাত সামনে এল। অসারতা প্রমাণ হল ধর্ম পরিচয়ের। যার সঙ্গে আর্থিক স্তরের কোনো সম্পর্ক নেই। সবিশেষ গ্রহণীয় যুক্তি হল, একেবারে ছিন্নমূল গরিব মানুষের ধর্ম পেট চালানো। সুতরাং তাকে টানবে কোন মেরু?

জরুরি অবস্থা জারির লগ্নে গ্রেফতার হয়েই তাৎক্ষণিক মন্তব্য ছিল জয়প্রকাশের: “বিনাশকালে বিপরীতবুদ্ধি”। ভারতের রাষ্ট্রীয় জীবনে এই শব্দবন্ধটি বেদবাক‍্য সে দিন থেকে। পরিস্থিতি যত প্রতিকূল ততই তা যেন আরও একটা ঢালের মুখে। এক একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও শেষ পর্যন্ত রিজার্ভ ব‍্যাংকের সঙ্গে সংঘাত। তার পর সিবিআই। আস্থানা-বর্মা সংঘাত, আদালত ও বর্মার বিদায়। পাশাপাশি লাগাতার সওয়াল জবাবে ইস‍্যু হয়ে উঠল রাফাল। এ ছাড়া তিন তালাক অর্ডিন্যান্স তো হচ্ছে, কিন্তু মন্দির যে এখন সবরীমালা! আইন করে অযোধ্যায় মন্দির হলেও তেমন উত্তাপের আঁচ কোথায়? অগত্যা অর্ধেই পূর্ণকুম্ভ! যোগী থাকবেন স্টার টেন্টে লোকলস্কর, রাজপাট নিয়ে। যেতেই হবে মোদীকেও। এবং আলবাৎ পিছু নেবেন রাহুল। সব অমৃত ওরাই নিয়ে যাবে? নিচুতলার জোট বন্ধুত্বপূর্ণ বটে কিন্তু কংগ্রেস তো বাইরে। জ্বালা বটে বিজেপির। মোদী মুলক, যোগীরাজ কোথাও শান্তি নেই। এখানেও ভাগ নিতে হাজির তীর্থের কাক। উচ্চবর্ণের ভোটও বাঁচানোর জো নেই?

অমৃত কুম্ভ যে! তাই তো অমৃতের সন্ধানে রাহুল।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here