সুন্দরবন বাঁচাতে রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশের রাজপথে চলছে মিটিং-মিছিল-সমাবেশ। চিত্রগ্রাহক: ব্র্যাত্য আমিন

মওদুদ রহমান :

প্রকৃতির অনন্য দান সুন্দরবনের বিশালতা ছড়িয়েছে বাংলাদেশ আর ভারত, দু’প্রান্তেই। হাজার বছরের সাক্ষী এই মহাবনের বর্ণনা আমরা পাই চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর দিনলিপিতে। আবার এ বনের কথা উঠে এসেছে রামায়ণ-মহাভারত আর পুরাণে। সুন্দরবন এই অঞ্চলের ৫ লক্ষাধিক মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয় আর প্রকৃতির বিরূপ পরিস্থিতির এই কালে যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলের কোটি মানুষের প্রাণরক্ষার একমাত্র সহায়। অথচ জিডিপিমুখী উন্নয়নের এই সময়ে সুন্দরবনকেও ওঠানো হয়েছে বেচা-কেনার নিলামে।

সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ অংশে হতে যাচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ‘এনটিপিসি’ বাংলাদেশের ‘বিপিডিবি’র সাথে মিলে বাস্তবায়ন করছে এই প্রকল্প। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত হয়েছে ভারতের আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ‘ভেল’ আর ১৪৯ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসছে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক হতে। ভারতের নিজ ভূখন্ডে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত গাইডলাইন অনুসারে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এ ধরনের প্রকল্প করা সম্ভব না হলেও, বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষা আইনের শিথিলতার সু্যোগ নিয়ে সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটারের মধ্যেই হাজির হয়েছে ভারতের নামীদামি সব কোম্পানি। তাই প্রশ্ন হচ্ছে, সব কিছু কি আইন দিয়েই নির্দিষ্ট করে দিতে হয়? তবে নীতি-নৈতিকতা-মূল্যবোধ-বিশ্লেষণী ক্ষমতার প্রয়োগটা হবে কোথায়?

sundar-1
      রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ঢাকার রাজপথে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আয়োজনের                                       একাংশ। চিত্রগ্রাহক: ব্র্যাত্য আমিন

বাংলাদেশে গত সাত বছর ধরে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। স্থানীয় জনপ্রতিরোধের মাধ্যমে শুরু হওয়া আন্দোলনের তেজ বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়ে গেছে পুরো বিশ্বে। কলকাতায় এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে হয়েছে প্রতিবাদী সভা, হয়েছে মিছিল, দু’দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নয়াদিল্লিতে হয়েছে আলোচনাসভা, মুম্বইয়ের আইআইটি’তে সুন্দরবন বাঁচানোর চলমান আন্দোলনের সমর্থনে হয়েছে ফটো ক্যাম্পেন।

sundar-2
   সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনে সংহতি প্রকাশে আইআইটি,     বোম্বেতে হয়েছে ফটো ক্যাম্পেন। চিত্রগ্রাহক: লেখক

এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে রামসার সেক্রেটারিয়েট। এই প্রকল্পে জড়িত থাকায় ‘এনটিপিসি’কে বাদ দেওয়া হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থলগ্নিকারী নরওয়ে সরকারের পেনশন ফান্ডের বিনিয়োগ তালিকা থেকে। আর মাত্র কয়েক মাস আগে বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে রামপাল প্রকল্প বাতিল কিংবা অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.আব্দুল্লাহ হারুণ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে সুন্দরবন ও তার আশেপাশের এলাকায় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাববিষয়ক একটি গবেষণা করা হয়েছে। এই গবেষণায় পরিবেশগত প্রভাবের দিকগুলো ৩৪টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পৃথক ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই প্রভাব কতটা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক হবে সেটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে। এই ৩৪টি ক্যাটাগরির ২৭টিতেই পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে। ৭টি ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে আঞ্চলিক বিদ্যুৎব্যবস্থার উন্নয়নই একমাত্র বাস্তবিক ইতিবাচক পরিবর্তন। বাকি ৬টিকে ইতিবাচক হিসেবে বলা হলেও সুন্দরবন ধ্বংসে সে প্রভাবগুলো ‘টনিকে’র মতো কাজ করবে। ইতিবাচক পরিবর্তন গুলোর মধ্যে রয়েছে রামপাল ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় নগরায়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসার প্রসার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও হাটবাজার সৃষ্টি। কিন্তু বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনকে ঘিরে যদি শিল্পের প্রসার হয় কিংবা জনবসতি গড়ে ওঠে তবে সে বন আর কত দিন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে তা ভেবে দেখার বিষয়।


আরও পড়ুন:  রামপাল : ‘স্বপ্ন’, ‘দুঃস্বপ্ন’, মৈত্রী আর বিভাজনের বিতর্কিত প্রকল্প


প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বল সব প্রস্তুতি, উন্নয়নের টোপ আর যেনতেনভাবে প্রকল্পটি করে ফেলার তোড়জোড় দেখে বলাই যায় যে রামপাল প্রকল্প সুন্দরবনের জন্য ক্যান্সার বয়ে নিয়ে আসছে। পৃথিবীর সব চেয়ে নিকৃষ্ট জ্বালানিবাহিত দূষণে মাটি-পানি-বায়ু ব্যধিগ্রস্ত হয়ে অচিরেই মৃত্যু ঘটবে সুন্দরবনের। বাস্তুসংস্থানের সামান্য পরিবর্তন ছড়িয়ে পড়বে বিরাট আকারে। আমরা হারাব জলের কুমির আর ডাঙার বাঘ। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের যে মুলো আমাদের সামনে ঝুলোনো হয়েছে তার মাধ্যমে উজাড় হতে থাকবে সুন্দরবন। রামপাল প্রকল্প সুন্দরবনের দূর্ভেদ্য প্রাচীর ভেঙে দিয়ে এর অনতিক্রম্যতাকে অতিক্রম করবে। ধীরে ধীরে সুন্দরবন আশ্রয় নেবে ছবির ফ্রেম আর বইয়ের পাতায়।

অথচ গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্রের কোলে নোনা পানিতে ভেসে আসা পলি সুন্দরবনের বুকে বাঁধা পড়েই সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের এই সবুজ ভূমি। তাই সুন্দরবন এই অঞ্চলের আঁতুড়ঘর। আর এই আঁতুড়ঘর রক্ষার দায় আমাদের সকলের।

লেখক: প্রকৌশলী

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here