weather in west bengal
দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে চলবে ঝড়বৃষ্টি।
শ্রয়ণ সেন

“ফেব্রুয়ারি মাসে আবার কালবৈশাখী! খুব বেশি জানেন ভেবেছেন। যান নার্সারি থেকে পড়াশোনা শুরু করুন।”

সকাল থেকে বেশ কয়েক বার এ রকম মন্তব্য শুনলাম ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে। সকালে আমাদের পোর্টালে একটা খবর করেছিলাম, ‘কালবৈশাখীতে লণ্ডভণ্ড কলকাতা।’ ব্যাস সেখান থেকেই শুরু। অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত, অনেক তকমা পেলাম। সেই সঙ্গে পেলাম নার্সারি থেকে পড়াশোনা শুরু করার পরামর্শও।

তা হলে কি মানুষ এই ঝড়কে কালফাল্গুনী বলতে চান!

যা-ই হোক, এই মন্তব্য থেকে বুঝে নিয়েছি, বেশির ভাগ মানুষের কাছে এই ঝড়ের ব্যাপারে জ্ঞান বেশ কম (আমার যে খুব জ্ঞান আছে তাও না। তবুও ১৫ বছর ধরে আবহাওয়া চর্চা করছি, সে অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি)। তাঁরা মনে করেন, কালবৈশাখী দেওয়ার অধিকার একমাত্র বৈশাখ মাসেরই রয়েছে।

তাই ভাবলাম, কেন এই ঝড়টা কালবৈশাখী সেটা নিয়ে একটু আলোচনা করি।

প্রথমত বলা যাক কেন এই ঝড়টার নাম কালবৈশাখী?

পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, সমগ্র পূর্ব এবং উত্তরপূর্ব ভারতে গরমকালে বিকেলে যে ঝড় বয়ে যায়, তাকে বলে কালবৈশাখী। যে হেতু এই ঝড় বৈশাখ মাসে বেশি দেখা যায়, তাই এর এমন নামকরণ।

কালবৈশাখীর আসল নাম, ‘নর-ওয়েস্টার।’ অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে এই ঝড় ধেয়ে আসে বলে একে বলে ‘নর-ওয়েস্টার।’

তাই বলে কি কালবৈশাখী শুধুমাত্র বৈশাখ মাসেই (১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে) দেখা যায়?

না, আবহাওয়া দফতরের তথ্য বলে, পশ্চিমবঙ্গে মার্চ মাসে কমপক্ষে দু’টি, এপ্রিলে চারটি এবং মে মাসে তিনটি কালবৈশাখী হওয়ার কথা।

তা হলে কি ফেব্রুয়ারিতে কালবৈশাখী কখনও হয়নি?

শেষবার ফেব্রুয়ারিতে প্রকৃত কালবৈশাখী কবে হয়েছিল, সেটা জানার জন্য রেকর্ড বই ঘাঁটতে হবে। গত কয়েক বছরে ফেব্রুয়ারিতে হালকা ঝড় কলকাতায় হয়েছে, কিন্তু তা কালবৈশাখী হয়নি।

তা হলে কালবৈশাখী এবং সাধারণ ঝড়ের পার্থক্য কী?

কোনো ঝড় কালবৈশাখী কি না, সেটা বিচার করার জন্য কিছু মাপকাঠি রয়েছে। প্রথমত সেই ঝড়ের গতিবেগ হতে হবে ঘণ্টায় ৫০ কিমি বা তার বেশি, আর দ্বিতীয়ত এই ঝড়কে অন্তত ১ মিনিট স্থায়ী হতে হবে।

সোমবার ভোরে যে ঝড় কলকাতায় হয়েছে বা দক্ষিণবঙ্গে হয়েছে, সেটা এই দুই শর্তই পূরণ করেছে।

তা হলে বসন্তকালে কালবৈশাখী তৈরি হল কী ভাবে?

এখানে একটু বলে রাখি কালবৈশাখী ঝড় কী ভাবে তৈরি হয়। কালবৈশাখী তৈরি হয় ঝাড়খণ্ডের ছোটোনাগপুর মালভুমি অঞ্চলে। দিনের বেলায় প্রবল গরমের ফলে ওখানকার হাওয়া গরম হয়ে উপরে উঠে যায়। তার শূন্য স্থান পূরণ করতে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে ছুটে যায় জলীয় বাষ্পভরা ঠান্ডা বাতাস। ঠান্ডা ও গরম হাওয়ার সংমিশ্রণে উল্লম্ব মেঘ তৈরি হয়। সেটাই শেষে কালবৈশাখী হয়ে আছড়ে পড়ে।

গত কয়েক দিন ধরে ঠিক এ রকম আবহাওয়াই চলছে। ছোটোনাগপুর মালভূমি অঞ্চল দিনের বেলায় গরম হচ্ছিল বেশ। পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের ওপর দিয়ে দখিনা হাওয়া বইতে শুরু করে দিয়েছিল। ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প হুহু করে চলে যাচ্ছিল ছোটোনাগপুরের দিকে।

কিন্তু ঝড়বৃষ্টি তৈরি হওয়ার জন্য কিছু অনুঘটকের প্রয়োজন হয়। সেই অনুঘটক না থাকলে যত গরমই পড়ুক ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে না। তাই হয়তো খেয়াল করবেন, কলকাতার তাপমাত্রা ৪০-৪২ হয়ে গেলেও ঝড়বৃষ্টি হয় না। আবার এখন ৩৩-৩৪-এই ঝড়বৃষ্টি হল।

কালবৈশাখীর অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হল কী ভাবে?

এই মুহূর্তে পরিমণ্ডলে এমন কিছু অনুঘটক রয়েছে, যার ফলে এত তাড়াতাড়ি কালবৈশাখীর দেখা পাওয়া গেল। এই মুহূর্তে উত্তর ভারতে একের পর এক পশ্চিমী ঝঞ্ঝা হানা দিচ্ছে। এই ঝঞ্ঝার সঙ্গে উত্তর ভারতে অবস্থিত একটি ঘূর্ণাবর্তের ফলে আটকে গিয়েছে উত্তুরে হাওয়া। যে হেতু রাজ্যে এই উত্তুরে হাওয়া আসতে পারছে না, সেই সুযোগে দক্ষিণবঙ্গের বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়েছে জলীয় বাষ্প ভরা দখিনা বাতাস।

এক দিকে উত্তর ভারত থেকে পূর্ব ভারতের দিকে আসছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। অন্য দিকে দক্ষিণবঙ্গের ওপর দিয়ে যাচ্ছে জলীয় বাষ্প ভরা বাতাস। এই জলীয় বাষ্পের জোগানকে আবার তরান্বিত করছে উত্তরবঙ্গ এবং ওড়িশায় অবস্থিত দুটি ঘূর্ণাবর্ত। ফলে পশ্চিমী হাওয়া (ঝঞ্ঝা) এবং পুবালি হাওয়ার (জলীয় বাষ্প) সংমিশ্রণে ছোটোনাগপুর মালভূমিতে কালবৈশাখীর অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছে।

এই কালবৈশাখীর পরিস্থিতিকে বাড়তি শক্তি দিয়েছে উত্তর ওড়িশা থেকে দক্ষিণবঙ্গ হয়ে মেঘালয় পর্যন্ত একটি নিম্নচাপ অক্ষরেখা তৈরি হয়ে যাওয়া। এর ফলেই এই কালবৈশাখী।

মঙ্গলবার সকাল থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আবহাওয়া এরকমই থাকবে। আর হ্যাঁ, এই সময়ের মধ্যে আরও দু’একটা কালফাল্গুনী, থুড়ি কালবৈশাখীও দেখতে পেয়ে যেতে পারেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here