রকেট গার্লস: নাসা-র ভুলে যাওয়া মহিলা বিজ্ঞানীদের কথা

0
290

sakti-choudhuri-1শক্তি চৌধুরী

আচ্ছা আপনারা নীল আর্মস্ট্রং-এর নাম শুনেছেন? আর রাকেশ শর্মা ? আরে ঠিক আছে….. ঠিক আছে…. আর হাত তুলতে হবে না। আমি বুঝতে পেরেছি, তাদের জীবনী বৃত্তান্ত আপনাদের মুখস্থ। বেশ তা হলে বলুন দেখি, ক্যাথেরিন জনসন, ভদ্রমহিলা কে ছিলেন? ওমা একি হাতগুলো সব কোথায় গেল? সব্বাই চুপ কেন? শুনুন তবে এই ক্যাথেরিন জনসনই নাসার প্রথম চন্দ্র অভিযানের আগে চাঁদের কক্ষপথ নিয়ে সমস্ত হিসাবনিকাশ করার মূল দায়িত্বে ছিলেন। যে হিসাবগুলির নিরিখেই পরবর্তী কালে আমেরিকার প্রথম চন্দ্র অভিযান বা পৃথিবীর মহাকাশ গবেষণার প্রথম ধাপ। না, আমি শুধু ক্যাথরিন জনসনকে নিয়ে কথা বলতে  আসিনি। সদ্য চলে যাওয়া নারী দিবসের মঞ্চের সেই অন্ধকার কোণ থেকে কয়েক জন নারীর কথা বলতে চাই, যাঁরা তৃতীয় বিশ্বের অশিক্ষিত দরিদ্র ঘরের নন বরং খাস আমেরিকার বুকে যথেষ্ট শিক্ষিত মহিলা হয়েও পৃথিবীর কাছে তাঁদের ভূমিকা অন্ধকারেই থেকে গেছে। আসুন, সেই অচেনা নারীদের একটু চেনা আলোয় দেখার চেষ্টা করি।

katherine-edited

“জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি” বা JPL, ক্যালিফোর্নিয়া। নাসার কর্মকাণ্ডের মূল গবেষণাগুলো এখানেই হয়। এখানে কাজ করেন একদল মহিলা যাঁদের কাজের মূল বিষয়ই হল হল অঙ্ক এবং মহাকাশ গবেষণার জটিল হিসাবগুলো থেকে ঠিক উত্তর নির্ণয় করা। যার সামান্য ভুলে কী হতে পারে,কল্পনা চাওলা তার জ্বলন্ত উদাহরণ। হ্যাঁ জানি ঠিক…ঠিক ওই কথাটাই…আপনি  ভাবছেন…। এ তো কম্পিউটারের কাজ, মানুষ করছে কেন? নাসায় এই মেয়েদের, কম্পিউটারই বলা হতো। “computers urgently needed to apply.”  এটা ছিল বিজ্ঞাপনের ভাষা। সে সময় মহাকাশ বিজ্ঞানের জটিল অঙ্কগুলোর সমাধানের জন্য কম্পিউটার যন্ত্রের থেকেও মানুষের বুদ্ধি ও নির্ভুল উত্তরের উপরই বেশি ভরসা করত নাসা। পরবর্তী কালে অবশ্য আইবিএম অনেক উৎকৃষ্ট মানের গণক কম্পিউটার আবিষ্কার করে।

rocket-girls

যা-ই হোক, এই ‘রকেট গার্লস’ বা ‘কম্পিউটার’ নামাঙ্কিত পদটিতে কেন শুধু মহিলা নেওয়া হত? নাসা এই বিষয়ে খুব পরিষ্কার ভাবেই জানিয়েছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ দরজার ভিতরে বসে ওই রকম বিশাল আকারের সংখ্যা নিয়ে নিখুঁত ভাবে যোগ বিয়োগ গুন ভাগ করার ক্ষমতা শুধু মেয়েদেরই আছে। আর বিংশ শতকের আমেরিকার পুরুষরাও এই কাজে খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি। কারণ হিসাবে প্রখ্যাত সাংবাদিক নাথালিয়ার ভাষায়, তখনকার পুরুষরা কখনওই একজন মহিলাকে তাঁদের বস হিসাবে দেখা পছন্দ করতেন না। আর ১৯৬২ সালের পর থেকে এই ‘computer girls’-দের সুপারভাইজার হিসাবে সব সময়ই একজন মহিলাকে বাছা হত। প্রথম মহিলা সুপারভাইজার ছিলেন ম্যাকি রবার্টস।

ক্রমে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে নাসাতে এই মহিলাদের ভূমিকা প্রায় একটা ঐতিহ্যের রূপ নেয়। নিজেদের পরিবার, সন্তানপালন সামলে এই রকম একটা গুরুদায়িত্ব পালন করতে এঁরা পারিবারিক ভাবেও এক জন অন্য জনকে সাহায্য করতে থাকেন। নীরস বিজ্ঞানচর্চা ও প্রাণহীন গণিতশাস্ত্রই যেখানে পুরুষ-প্রধান নাসার আবহ ছিল, সেখানে এই মহিলাদের প্রচেষ্টায় এসেছিল প্রাণের পরশ। সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিউটি কন্টেস্ট অবধি আয়োজন করেছেন এঁরা। বদলে দিয়েছেন কাজের পরিবেশ। আবার জানেজ লসন, যিনি নাসার প্রথম আইবিএম প্রশিক্ষিত কর্মী, যিনি টেকনিক্যাল এরিয়ার সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন এই JPL থেকেই বা ক্যাথেরিন জনসনরা প্রমাণ করেছিলেন এই মহিলা ব্রিগ্রেডের দক্ষতা কতটা ছিল। কিন্তু নাসা কখনওই এদের সে ভাবে প্রচারের আলোয় আসতে দেয়নি বা আনেনি।

jpl-computer-1

শেষ করব জেপিএল-এর এই মহিলা কম্পিউটারদের এক অনন্য কীর্তির কথা বলে। মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে বোধহয় ‘ভয়েজার’ ছিল সব চেয়ে বড়ো প্রোজেক্ট। মার্কিন সরকার আর্থিক কারণে এই প্রোজেক্ট ছোটো করে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু JPL-এর রুদ্ধদ্বার কক্ষে কিন্তু এক দিনের জন্যও কাজ থামাননি এই ‘রকেট গার্লস’। তার ফল কী দেখল সারা পৃথিবী? যে প্রোজেক্ট সীমিত ছিল শনি গ্রহ অবধি তা আজ মহাকাশের সমস্ত ছায়াপথব্যাপী বিস্তৃত। আর এই সাফল্য এসেছে ‘JPL COMPUTER’-দের সে দিনের নিঃস্বার্থ শ্রম ও বুদ্ধির দানে। 

১৯১৭ সালের ৮ মার্চ অধিকারের দাবিতে রাশিয়ায় শ্রমজীবী মেয়েরা প্রথম বার রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁদের দাবির সঙ্গে হয়তো জেপিএল কম্পিউটারের তুলনা চলে না। কিন্তু, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য সংগ্রামে তাঁরা যে ভূমিকা রেখেছেন বা আজও কম মাত্রায় হলেও রাখছেন, তাতে নারী দিবসের চর্চায় স্থান করে নেওয়ার সম্মানটা তাঁরা কেড়ে নিতেই পারেন।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here