nitin Gadkari
নিতিন গড়কড়ি। ছবি সৌজন্যে স্ক্রলডটইন।
debarun roy
দেবারুণ রায়

রাজনীতির দাঙ্গা আর দাঙ্গার রাজনীতি আধুনিক খণ্ডিত ভারতের ললাটলিখনের খণ্ডচিত্র। স্বাধীনতার সহজিয়া অনুভূতি এসেছে মর্মান্তিক বাস্তবের দহনকে সঙ্গী করে। ভিটেমাটির মায়া ছেড়ে এক নিমেষে  ছিন্নমূল, ঠিকানাহীন, বিনা প্রশ্নে জন্মভূমি ছেড়ে চলে যাওয়ার নোটিশটাই প্রথম স্বাধীনতার অনুভব। তার পর মধ্যরাতের মায়ফিলে দেশনেতার ব্যাখ্যা: ট্রিস্ট  উইথ ডেসটিনি। স্বাধীনতার সকাল হওয়ার আগেই দেশভাগ, সংসারভাগ, জীবনভাগ এবং আরও অনেক কিছু ভাগ হয়েছে যাদের, তাদের মালুম হয়েছে ক্ষণে ক্ষণে সেই অমোঘ ‘ডেসটিনি’। ভাগ্য তাদের ভাগিয়ে নিয়ে এসেছে ‘নিজভূমে পরবাস’ থেকে। ভাগ করেছে একের পর এক সব কিছু। গুণ কখনও শেখেনি। গুণধর বিদেশি শাসক উত্তরাধিকারে রেখে গিয়েছে, “ডিভাইড আ্যন্ড রুল”। রেখে গিয়েছে দু’শো বছরের সাজানো বাগান ছেড়ে পাততাড়ি গোটানোর কালে, কালসাপ। ধর্মের নামে ধাষ্টামির মন্ত্রে রাজনীতিটাই দাঙ্গা। একে একে রাজ‍্য ধরে ধরে এক একটা জনগোষ্ঠীকে ভেঙেছে জাত, জেলা, পাত বা প্রান্তের নামে ।

আরও পড়ুন রাহুলই নেতা, পাশে মায়াবতী, উনিশে ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত

২০০২-এ গুজরাতে ভয়াবহ নরমেধের সময়, কাশ্মীর, দিল্লি, কিংবা গুজরাতেরই কংগ্রেসি কারনামা তুলে ধরে সাজার সাফাই দেখাবে কথা দিয়েছে দাঙ্গার সূত্রধর। বলেছে, কংগ্রেসি আমলও ছিল দাঙ্গায় মত্ত। গুজরাতে সম্প্রদায়, জাতপাতের অঙ্কে দাঙ্গা বাধিয়ে নিরঙ্কুশ হওয়ার খেলা নতুন নয়। তবে গুজরাতের কলঙ্কচিহ্ন নিয়ে ‘৮৪-র দিল্লি-দাঙ্গার কথা বলা যায়? হ‍্যাঁ যায়। বলছেন আর কেউ নন। স্বয়ং আডবাণী। তবে এখন নয়। যখন তিনি দেশ ও দলের দণ্ডমুণ্ডের মালিক সে সময়। বাবরি ধ্বংসের তদন্তে গঠিত লিবারহান কমিশনের কাছে সাক্ষ‍্য দিতে গিয়ে আডবাণী বলেছিলেন, ‘৮৪-র দাঙ্গা গুজরাত ২০০২-এর চেয়ে অনেক বড়ো। বাবরি ধ্বংস নয়, শিখ দাঙ্গাই স্বাধীন ভারতের সব চেয়ে বড় কলঙ্ক। দলের কট্টর পন্থার টিউনিং কী ভাবে করতে হয় তা জানেন আডবাণী। ওঁর পথই জন্ম দিয়েছে আরও কট্টরদের। কট্টরদের হাতেই চলে গিয়েছে দল, দেশ এমনকি ওঁর নিজেরও ভূত-ভবিষ্যৎ। গুজরাতে কেশুভাই পটেলকে সরিয়ে স্টপার অটলকে পাশ কাটিয়ে যে গোলটি করেছিলেন ২০০১-এ, ‘১৪-য় বুঝলেন সেটা ছিল আত্মঘাতী। কেশুভাই তো বটেই, শংকরসিন বাঘেলাকেও যদি বিশ্বাস করতেন তা হলেও ঐতিহাসিক ভুল হত না। তিনি নিজে তো এখন ইতিহাসের ক্লোজড চ‍্যাপটার। দলে তাঁর উত্তরাধিকারও মুছে যাচ্ছে। যারা মেরুদণ্ডে আছে তাদের দণ্ড পেতে হয়েছে। যেমন একাকী সুষমা। আর সর্বদাই সর্বদেশেকালে যারা নিরাপদ, তাদের আপদ নেই। যাঁরা যোগাভ‍্যাস করেন তাঁদের যোগাযোগ ভালো। মেরুদণ্ডে মরচে পড়েনি, যে মোচড়ানো যাবে না। মেরুদণ্ড থেকে দণ্ডটা বাদ দিলেই তো চুকে যায় ল‍্যাঠা। বাকি থাকে নির্ভেজাল মেরু। মেরুকরণে এটাই চাই। অতএব পেশাদারি দক্ষতায় অরুণ আছেন আলোকসম্পাতে। আছেন রবি কিরণবিহীন। বলা যায় বিকিরণে। এবং স-শব্দে বেঙ্কাইয়া। চলে গেলেন অনন্তকুমার। ঠাকুর রাজনাথ অটল ছিলেন এবং আছেন। লক্ষ্যে স্থির স্থিতপ্রজ্ঞ অটলের শৈলীতে। এবং সংঘপ্রিয়। স্বরাষ্ট্রে অভূষিত নাম্বার টু। মোদীর মাহাত্ম্যে ঢাকা উত্তরপ্রদেশের রাজপুত-ভূমিপুত্র। সামাজিক-রাজনৈতিক প‍্যাকেজে মন্ত্রিসভার ওপরতলায় একমেবাদ্বিতীয়ম।

মহারাষ্ট্র থেকে ভাসিয়ে দেওয়া… বিকল্প নেতার…  নামটি মহারাষ্ট্রীয় তথাকথিত হিন্দু উচ্চবর্ণের স্ট‍্যাম্প আঁটা এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর। তিনি সংঘের অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং অবশ্যই কর্পোরেট-প্রিয়। জাতীয় নেতা না হয়েও সংঘের সিদ্ধান্তে তিনি বিজেপির সভাপতি হন।

পাঁচ রাজ‍্যের ভোটের ফলে ভিত নড়ে গিয়েছে শাসকদলের অভিভাবকদের। খুব প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও মোদী-ম‍্যাজিকের বিকল্প ভাবা শুরু হয়েছে। সংঘের মতো উদ্দেশ্যপ্রবণ ও ঘোষিত ভাবে ব‍্যক্তিপূজা-বিরোধী সংগঠন বিকল্পের ভাবনা যে ভেবে রাখেনি আগে, তা নয়। তবে অবশ্যই সেটা ২০২৪-এর জন্য। মোদী যদি আরেক মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী থাকেন তা হলে এমনিতেই তাঁর বয়সের সময়সীমা প্রায় ছুঁয়ে ফেলবেন তিনি। তা ছাড়া ‘২৪-শে সরাসরি হিন্দুরাষ্ট্রের স্লোগান তুলে ভোটে যাওয়ার ভাবনাও আছেই। সে দিক থেকে নব প্রজন্মের প্রতিনিধি ও হিন্দুরাষ্ট্র ভাবনার প্রতীক হতে প্রস্তুত যোগী আদিত্যনাথ। কিন্তু হিন্দি বলয়েই সমর্থন ভূমিতে ধস ও মধ‍্যপ্রদেশের মতো মতাদর্শের শিকড় নড়ে যাওয়ায় সংঘ অবশ্যই ভাবিত। নিজেদের ভুল তো দেখা হচ্ছেই কিন্তু ভুল খুঁজে সংশোধনের সময় কোথায়? এ দিকে তাকানোর পাশাপাশি কর্পোরেট-প্রিয় এক বিকল্প নেতার কথা উঠেছে। তিন রাজ‍্যের ফলাফলের প্রতিক্রিয়ায় সংঘ যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কথা বলেছে তাতেও বিকল্প খোঁজার স্পষ্ট সংকেত। মহারাষ্ট্র থেকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বিকল্প নেতার নাম তাঁকে তুলে ধরার যুক্তিগুলোও সংঘসুলভ। তা ছাড়া, কৃষকরাই যে হেতু এই ভোটে তিন রাজ‍্যের মানুষকে পথ দেখিয়েছেন, তাই একটি কৃষক সংগঠনের তরফ থেকেই তোলা হয়েছে বিকল্প নেতার নাম। নামটি মহারাষ্ট্রীয় তথাকথিত হিন্দু উচ্চবর্ণের স্ট‍্যাম্প আঁটা এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর। তিনি সংঘের অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং অবশ্যই কর্পোরেট-প্রিয়। জাতীয় নেতা না হয়েও সংঘের সিদ্ধান্তে তিনি বিজেপির সভাপতি হন।উল্লেখ্য, গৈরিক শিবিরে মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণদের রাজনৈতিক প্রভাব ও কর্তৃত্ব হিন্দি বলয় তো বটেই, গুজরাতের চেয়েও বেশি।  এ জন্য বিকল্প নেতা হিসেবে ভাসানো নামটি নিতিন গড়কড়ির, রাজনাথ সিংয়ের নয়। এবং সব চেয়ে প্রাসঙ্গিক হল, সংঘ বা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এমন প্রস্তাব খণ্ডন বা নস্যাৎ করেননি। বরং গড়কড়ির গডকরির সৌজন্যমূলক বিনয়ী প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট, ধোঁয়ার পেছনে আগুন আছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here