বিক্ষোভে স্তব্ধ ঢাকা। ছবি সৌজন্যে আলোকিত বাংলাদেশ।

অভয়ারণ্য কবীর

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোর চরিত্রকে পালটে দিচ্ছে যে আন্দোলন, তা হল চলমান ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। এই আন্দোলন যারা করছে, তারা হল ‘সকাল আটটা–নটার সূর্য’। তাদের আটকানোর মতো কোনো শক্তি নেই। তাদের থামিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ট্যাঙ্ক নেই, নেই কোনো জলকামান। শিক্ষার্থীদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ যে রাজনৈতিক ভারিক্কি ধারণ করে, তার অনেকটা এই কিশোরের দল ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাদের থেকে বাংলাদেশের সকল বিপ্লবীকে শিখতে হবে। এখানেই ‘জনগণের কাছ থেকে শেখো’ তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগের প্রশ্ন চলে আসে। এটা না করে প্রথমেই তাদের শেখাতে যাওয়া হবে বিরাট মাপের ভুল।

শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমেছে। তাদের লড়াই একটি নতুন পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। সারা দেশে যখন হতাশা বিরাজ করছে তখন এই লড়াই ইতিহাস সৃষ্টির ভ্রূণ হিসেবে কাজ করবে। আমরা যারা সমাজবিপ্লবকে এগিয়ে নিতে চাই, অথবা সমাজবিপ্লবের পক্ষে আস্থাশীল, তাদের সবাইকে এ নতুন পরিস্থিতি সৃজনশীল ভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।

আরও পড়ুন বাংলাদেশে ছাত্র বিক্ষোভের স্লোগানে ‘চ’ বিপ্লব

শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিচ্ছে, ‘আমার ভাইয়ের জামা লাল, পুলিশ কোন চ্যাটের বাল’। এই স্লোগান একটি অগ্রসর রাজনীতিকে ধারণ করে। তারা সাম্প্রতিক অতীতের আন্দোলনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছে। তারা দেখেছে যে, পুলিশকে চ্যালেঞ্জ না করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। তাই তারা ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এটাকে ধারণ করতে না পারলে শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম গণ–আন্দোলনও গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

ঢাকার রাস্তায় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে প্ল্যাকার্ড। ছবি সৌজন্যে মঙ্গলধ্বনি।

শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড বানিয়েছে। তারা বলছে, ‘এক টাকায় নয় জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই’। তারা বলছে, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ চাই না, সেফ বাংলাদেশ চাই’। এই স্লোগান সত্যিকার অর্থেই আমাদের সামনে সাহসের প্রতীক। এই অল্পবয়সি কিশোর সহযোদ্ধারা ইতিহাসে তাদের নাম লেখাল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। তারা ফ্যাসিবাদের কথিত ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’ চূর্ণ করে ধুলোয় মিশিয়ে দিল। তারা বলে দিল– তোমরা উন্নয়নের বুলি অনেক শুনিয়েছ। আর নয়। এ বার আমরা শোনাব প্রতিবাদ–প্রতিরোধের স্লোগান।

বুধবার শিক্ষার্থীরা মন্ত্রীর গাড়িকেও আটকে দিয়েছে। তারা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়েছে। এটা কল্পনা করারও অতীত ছিল। শুধু গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়েছে তাই নয়, মন্ত্রীদের কপচানো বুলি দিয়েই মন্ত্রীকে ঘায়েল করেছে। তারা বলেছে–‘আইন সবার জন্য সমান। একজন মন্ত্রী, যিনি কিনা ট্রাফিক আইন না মেনে এই চরম আন্দোলনের মুহূর্তেও উলটো পথে নিজের জাতীয় পতাকা ওড়ানো গাড়ি নিয়ে যান, তাঁর জন্য এর থেকে বড়ো লজ্জার আর কী থাকতে পারে!’ এখানেও দুঃসাহস দেখিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এটাও একটা অগ্রসরতার জায়গা।

শিক্ষার্থীরা ধরে ধরে ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করেছে। এর মাধ্যমে তারা কার্যত ট্রাফিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ছাত্ররা পুলিশের গাড়ি আটকে দিয়েছে লাইসেন্স না থাকায়। এটাকে আমরা কী ভাবে দেখব? এ দেশের পুলিশের মতো ফ্যাসিবাদি বাহিনীকে এ ভাবে চ্যালেঞ্জ করা কি নতুন শক্তির জন্ম নেওয়া নয়?

ছাত্র লিগ পরিচয় দিয়ে যারা কিশোর কমরেডদের মারতে এসেছিল তাদের ধাওয়া করেছে ওরা। তারা পালটা লড়াইয়ের সূচনা  করেছে। প্রকাশ্যে নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে। ছাত্র লিগের দ্বিচারিতা উন্মোচন করে আন্দোলনকারীরা বক্তব্য পেশ করেছে। আওয়ামি লিগের নেতা ওবায়দুল কাদের ‘চিনির গোলা’ নিক্ষেপ করেছেন ছাত্রছাত্রীদের উপর। এই রাজনৈতিক নেতার মতে, ক্ষোভ যৌক্তিক, কিন্তু আন্দোলন করা যাবে না। রাজনৈতিক ভাবে কতটা আঘাত করলে তারা এই অবস্থান নিতে পারে!

ঢাকার রাস্তায় বিক্ষোভরত স্কুলছাত্রী। ছবি সৌজন্যে মঙ্গলধ্বনি।

কিশোর বিপ্লবীরা ঘোষণা করেছে, স্লোগান দিয়েছে – কোটার মতো আমাদের আশ্বাস দিয়ে কাজ হবে না। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়ব। অতীত থেকে তারা শিখেছে। তারা আন্দোলনগুলো পর্যবেক্ষণ করেছে। নিজেদের আন্দোলনকে গুণগত ভাবে সমৃদ্ধ করেছে। এক দিনের মধ্যেই শাহজাহান খানকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছে। গত কয়েক বছরে কোনো মন্ত্রী কি একদিনের মধ্যে এ ভাবে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন? হননি। এখানেও তারা দেখিয়ে দিল অগ্রসরতা। ‘সকাল আটটা–নটার সূর্য’ পরিণত হল দুপুরের কড়া রোদের উত্তাপে।

সাধারণ জনগণ কিশোর বিদ্রোহীদের রাস্তা অবরোধকে ভোগান্তি হিসেবে দেখছেন না। তাঁরা এটাকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করছেন। জনগণের একটা বড়ো অংশ, যাঁরা সড়কে প্রতিদিন চলাফেরা করেন পাবলিক ট্রান্সপোর্টে, তাঁরা সবাই কিশোরদের এই বিক্ষোভকে সমর্থন করছেন। তাঁরা সড়ক অবরোধের জন্য বিরক্তি প্রকাশ করছেন না। অসুস্থ নন, এমন সবাই পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছেছেন। জনগণ কিশোরদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছেন। তাঁরা বলছেন, গণপরিবহনে নৈরাজ্য দূর করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ করতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো দুর্নীতি চলবে না। এ সবই গণদাবি। এ দাবি এক বার যখন জোরালো ভাবে উঠেছে, তখন তা থেমে যাবে না। জ্বলে উঠবে।

বর্তমান কিশোরদের আন্দোলন পূর্বের আন্দোলনগুলো থেকে নিজেকে পৃথক করে চিনিয়েছে। এই আন্দোলনের যে বিদ্রোহী রূপ রয়েছে, তা আমরা যদি বুঝতে ব্যর্থ হই তবে আমরা এখান থেকে কিছুই শিখব না। আবার এই আন্দোলনকে সর্বোচ্চ আন্দোলন ভেবে সাগরে গা ভাসালে কোনো দিনই সুদিন আসবে না। কেউ কেউ অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে এই আন্দোলনে বিপ্লবের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন। এটা হাস্যকর। তারা এতটাই বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন যে, তারা একটা আন্দোলনকে বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করতে ব্যর্থ। তারা নিজেদের বিপ্লবীত্ব জাহির করে অন্যের করা কাজের মধ্যে। তাদের চিন্তার দীনতা কী পর্যায়ে, তা আন্দোলনের সময় তাদের হম্বিতম্বি দেখলে টের পাওয়া যায়!

আরও পড়ুন বাংলাদেশে বাস চাপায় ২ শিক্ষার্থীর মৃত্যু, তিনদিন ধরে পথে বিক্ষোভ শিক্ষার্থীদের

কিশোর আন্দোলনে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো অংশ নিয়েছে। তারা বিভিন্ন ভাবে এ ধরনের আন্দোলনে থাকে বই-কি! ধারাপাতের মতো তাদের সাংগঠনিক ইতিহাসে এ সমস্ত আন্দোলন লিপিবদ্ধ হয়। তারা সব সময় সব আন্দোলনে থাকে– এটা ভালো দিক। কিন্তু ৬০/৭০-এর দশকের বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে এখনকার ছাত্র সংগঠনগুলোর পার্থক্য হল – তারা উপর থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে চায় বা দখল করতে চায়। তাদের স্টান্টবাজি করেই খেতে হচ্ছে। আন্দোলনের মধ্যে আন্দোলনকে থামিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে তারা ওস্তাদ। শাহবাগেও একই ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। উপর থেকে নেতৃত্ব দখল করতে গিয়েছে। তাদের জ্ঞানের বহরকে উগরে দিতে চেয়েছে। আসলে ছাত্রদের তারা বিভ্রান্ত করেছে। তাদের উন্মোচন করা জরুরি।

আগের দিনে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো, বিশেষত ৬০/৭০–এর দশকে তারা কাজের মধ্য দিয়ে নেতা তৈরি করেছে। অর্থাৎ ছাত্রদের মধ্যে কাজ করার মধ্য দিয়ে নেতা তৈরি হয়েছে। এখন হয় মিডিয়াবাজি আর মাইক নিয়ে কে কত বক্তব্য দিতে পারে, আর ফুটেজ খেতে পারে– তার উপর। ওরা সচেতন ভাবেই এটা করে। কারণ আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে আন্দোলনকে খেয়ে ফেলা সহজ। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে সিদ্ধহস্ত, ওস্তাদ বলা চলে! তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন (গণসংহতি) ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট। তারা আন্দোলনকে নিজেদের মুঠোয় নিতে গিয়ে আন্দোলনকেই শেষ করে দেয়। এটা খুবই বাজে ইতিহাস তৈরি করছে।

আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যাওয়া। ছবি সৌজন্যে মঙ্গলধ্বনি।

আন্দোলনে নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নেতৃত্ব যদি সঠিক না হয়, তবে আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হয়। উপরের কথাগুলো বলার কারণে অনেক বন্ধুই তেড়ে আসবেন। কিন্তু একটি কথা পরিষ্কার যে, নীচে থেকে নেতৃত্ব গড়ে তুলতে না পারলে আন্দোলনকে সঠিক পথে পরিচালিত করা যায় না। এতে হিতে বিপরীত হয়। আমি বলছি না যে, আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্ততার হাতে ছেড়ে দেবেন। স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে রাজনৈতিক ভাবে নেতৃত্ব দেওয়া মানেই নিজেদের নেতাদের মাইকে বক্তব্য পেশ করতে দেওয়া। যদি স্কুল-কলেজগুলোতে সংগঠনগুলোর কাজ ভালো থাকত তা হলে এমনিতেই আন্দোলনের লিডারশিপ তাদের হাতেই থাকত। কিন্তু যখন তা নেই, তখন কাজ হচ্ছে নিজেদের মতামত নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে ব্যাপক ভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করা। তাদের উপর মত চাপিয়ে দেওয়া নয়, তাদের জয় করা। নিজেদের বক্তব্যগুলো নিয়ে প্রোপাগান্ডা করা। তার পর তাদের দিয়েই সে সব বলানো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখানে তার উলটোটাই ঘটে। তারা গড়ে ওঠা আন্দোলনের নেতা হতে চায়!

এ বারে বিপ্লবী আন্দোলন-কর্মীদের ব্যাপারে বলা যাক। তাদের পর্যাপ্ত উপলব্ধি থাকলেও সাংগঠনিক শক্তির ভারসাম্যের দিক থেকে খুবই দুর্বল। সে জন্য তাদের তেমন দেখা যায় না। আবার এখানে দু’টো বিষয় বলা দরকার। এক, তারা সাংগঠনিক ভাবে দুর্বল। দুই, তারা মিডিয়াবাজি করে না। সে জন্য দশ জন নেতা-কর্মী মাঠে থাকলেও, তা থাকে সাধারণের মধ্যে মিশে। কারণ এটাই হচ্ছে আন্দোলনের পদ্ধতি। তারা যদি তাদের সঠিকতাকে সামনে নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে পুনরায় ঘাঁটি গড়তে পারে, তবে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস পালটে দেওয়া সম্ভব। সে ক্ষেত্রে তাদেরও শিখতে হবে সাধারণ ছাত্রদের কাছে। তাদের চলে যেতে হবে একেবারে গোড়ায়।

আরেকটি দিক খেয়াল রাখতে হবে। তা হল, ব্যাপক জনগণের মধ্যে যেন বিভেদ তৈরি না করতে পারে রাষ্ট্র। শ্রমিক এবং ছাত্রদের যেন মুখোমুখি দাঁড় করাতে না পারে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে আন্দোলনগুলো যেন বিভেদের মধ্যে না পড়ে। কোনো আশ্বাসে বিশ্বাস করা সঠিক হবে না।

বাংলাদেশে যে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হতে যাচ্ছে, তা এক কথায় বলা যায়– ‘এটা চমৎকার অথবা এটা ভয়ংকর’। মানুষ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে, এটা শাসকের কাছে ভয়ংকর। কিন্তু ব্যাপক জনগণের কাছে তা চমৎকার। এই চমৎকারকে দেখার দৃষ্টি থাকতে হবে। সরকার বা রাষ্ট্রের দালালি করে এটা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

‘নিরাপদ সড়ক চাই!’

(লেখক বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

সৌজন্যে: মঙ্গলধ্বনি

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন