kanadকণাদ মুখোপাধ্যায়

শান্তিতে মারা গিয়েছিলেন ফাদার জর্জ লেমিত্রে। মৃত্যুর ঠিক আগেই চার্চের এই প্রাক্তন পুরোহিত শুনেছিলেন, আলোকবর্ষ দূরের মহাকাশে সৃষ্টির আদি সঙ্কেত কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন ধরার কল আবিষ্কার করে ফেলেছে বিজ্ঞান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক হিসেবে ফাদার জর্জ লেমিত্রে এমন শান্তির মৃত্যু কল্পনাও করতে পারেননি।

ব্রহ্মাণ্ড ফুলছে বেলুনের মতো। সম্প্রসারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে  গ্যালাক্সিগুলি। প্রথম সে কথা বলেছিলেন ডায়োসিজ চার্চের প্রিস্ট লেমিত্রে। শুনে অবাক হয়েছিলেন আইনস্টাইন স্বয়ং। এ কী কথা! ঊনবিংশ শতকের সেই সময়ে বিজ্ঞানীকুলের সমাজপতিদের বিশ্বাস তখনও ঢলেছিল নিউটনের স্থির বিশ্বের তত্ত্বের দিকেই। আর আইনস্টাইন নিজেও সেই মতের প্রধান প্রবক্তা। তবে যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে তিনি নিজে বারবার পড়েছিলেন তা লেমিত্রের ক্ষেত্রে হতে দেননি আইনস্টাইন। বরং লেমিত্রের তত্ত্ব সকলের সামনে তুলে ধরার জন্য নিজেই মঞ্চ ছেড়ে দেন আইনস্টাইন। খানিকটা সঞ্চালকের ঢংয়েই বলেন, “এবার একটা চমৎকার ভাবনা আপনাদের শোনাতে আসছেন  জর্জ লেমিত্রে”। স্থান, বেলজিয়াম। সময়টা ১৯৩৩ সালের মে মাস। বক্তৃতা শেষে লেমিত্রের বক্তব্যের প্রশংসাও করেন মহাবিজ্ঞানী।

১৮৯৪ সালের ১৭ জুলাই বেলজিয়ামের শ্যার্লেরইতে জন্ম হয় লেমিত্রের। শৈশব থেকেই জেসুইট চার্চের প্রভাব তাঁর ওপর ছিল। ঈশ্বরে বিশ্বাস নিয়ে নিজেও কম দোলাচলে পড়েননি। খানিকটা বৈশেষিক দর্শনের প্রবক্তা কণাদের মতোই সংশয়বাদ গ্রাস করেছিল তাঁকে। অর্থাভাবে তৈরি হয়েছিল নানা সংশয়। বিপরীতমুখী হলেও, ছাত্রাবস্থায় মাইন ইঞ্জিনিয়ারিং আর দর্শন দুই-ই ছিল তাঁর পাঠ্য। ১৯১৩ সালে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি পেয়েই টাকা উপায়ের রাস্তা বাছলেন তিনি। কিন্তু বাধ সাধল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানি  বেলজিয়াম আক্রমণ করে বসল। কম্পাস-স্কেল ফেলে কাঁধে বন্দুক নিয়ে ফ্রন্টে দৌড়তে হল লেমিত্রে আর তাঁর ভাইকে।

যুদ্ধশেষে লেমিত্রে ফিরলেন অন্য মানুষ হয়ে। অঙ্কে ব্যাচেলর ডিগ্রি পেলেন। তারপর প্রিস্ট হয়ে যোগ দিলেন চার্চে। কিন্তু, আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি ঘুম কেড়ে নিয়েছিল তাঁর। চার্চে থাকাকালীনই এমআইটি থেকে পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করলেন তিনি। এত কিছু করে চার্চে ?  প্রতিভার অপমৃত্যু ? এ কথা অবশ্য তখন ছিল ব্ল্যাশফেমি। যে ‘অপরাধে’ শহিদ হয়েছিলেন জিওর্দানো ব্রুনো, জীবন থাকলেও, মরমে মরেছিলেন গ্যালিলিও। তখন অবশ্য গোটা দুনিয়াতেই হাতে গোনা নাস্তিক। আর লেমিত্রে ছিলেন ভগবানের থাকা ও না-থাকার শ্রোয়েডিঙ্গার সুলভ দ্বন্দ্বে। চার্চও অবশ্য ঠেকে ঠেকে অনেক শিখেছে তত দিনে। তারা বাধা দেয়নি লেমিত্রেকে। দর্শনের অনন্ত ভাবনা আর অঙ্কের পৌন‌ঃপুনিকতা মিলেমিশে এই ব্রহ্মাণ্ডের আদিকণা, সিঙ্গুলারিটি ও মহাবিস্ফোরণ তখন লেমিত্রের মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে। বলেও ফেললেন জনে জনে। সেই শুরু হল, বিগ ব্যাঙ থিওরির পথ চলা। ইনফ্লেশন তত্ত্বের শুরুওয়াত। তৎকালীন পোপ পায়াস – ১২ আগ বাড়িয়ে বলে বসেছিলেন,  “লেমিত্রের তত্ত্বের মাধ্যমেই ভগবানের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলবে”। চার্চের আওতায় থাকলেও স্বয়ং পোপের সেই মন্তব্যের বিরুদ্ধে কার্যত কামান দেগেছিলেন বেলজিয়ামের প্রাক্তন আর্টিলারি অফিসার লেমিত্রে। তার পর, অবশ্য আর এ সব নিয়ে মন্তব্য করার সাহস কোনও দিন দেখাননি পোপ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ খুবলে দিয়েছিল লেমিত্রেকে। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল তাঁর সাধের লেউভেন বিশ্ববিদ্যালয়। নাৎসিদের হাতে বন্দি হয়েছিলেন তাঁর বহু বন্ধু। হৃদয়ে জোর ধাক্কা পেয়েছিলেন। মনে মনে মরে গিয়েছিলেন তিনি। সেই ধাক্কা আর কোনও দিনই কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু চার্চের চৌহদ্দিতে থেকেও চালিয়ে গিয়েছিলেন অদম্য লড়াই।

নোবেল পাননি লেমিত্রে। কিন্তু বিজ্ঞান তাঁকে সেন্টহুড দিয়ে বরণ করে নিয়েছে। বিগ ব্যাঙ তত্ত্বকেই সিলমোহর দিয়েছেন প্রায় সকলে। ভ্যাটিকানের ছত্রছায়ায় থেকেও ঠিক যেমন সভ্যতার কুর্নিশ আদায় করে নিয়েছিলেন বেকন, গ্রেগর মেন্ডেলের মতো বিজ্ঞানীরা। চার্চের ঘণ্টার প্রবল শব্দেও তাঁদের যুক্তিবোধ হারিয়ে যায়নি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here