rahul and mamata
ছবি সৌজন্যে ডিএনএ ইন্ডিয়া।
দেবারুণ রায়

সোমেন মিত্রকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদে বসিয়ে সুনির্দিষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন রাহুল গান্ধী। প্রথম এবং শেষ বার্তা হল, বাংলায় কংগ্রেসের সুদিন ফিরিয়ে আনা ও দলকে যতটা সম্ভব ঐক্যবদ্ধ করা। ২০ বছর আগের আর আজকের পটভূমির মধ্যে সহস্র যোজন দূরত্ব। এই সময়ের মধ্যেই কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূলের জন্ম ও বাংলায় প্রথমে কংগ্রেস ও পরে বামফ্রন্টকে কার্যত অর্থহীন করে দিয়ে মসনদে সাত বছর কাটিয়ে দেওয়া। এই কুড়ি বছরে বাংলার রাজনীতিও নানা ঘাটের জল খেয়েছে। জন্মলগ্নে এনডিএর শরিক হয়ে বাম ও কংগ্রেসের বিপুল শক্তির মোকাবিলা করেছে তৃণমূল। ভূমিষ্ঠ হয়েই দিল্লির তখতে বসে বাংলায় জমি তৈরি করেছে। আবার শক্তি সঞ্চয় করে এক বার কংগ্রেস ও এক বার বিজেপির সঙ্গে জোট করে বামবিরোধী মূল শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এবং শেষ লড়াইয়ের পরিকল্পনায় জমির মতো বাম ইস‍্যুতে আন্দোলনের জোট তৈরি করে সিপিএমকে অন্তিম আঘাত হেনেছে, হয় বিজেপি নয় কংগ্রেসের হাত ধরে। সেই তৃণমূলই এখন কংগ্রেসের বিজেপিবিরোধী লড়াইয়ের মূল অস্ত্র বললে অত‍্যুক্তি হয় না।

শক্তিহীন, সর্বহারা সিপিএমকে মতাদর্শগত কারণে সঙ্গে রাখতে চায় কংগ্রেস। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী জোটের ভাবমূর্তির জন্য। কিন্তু জানে বাংলার ৪২টি লোকসভা আসনের একটিতেও তাদের জেতানোর ক্ষমতা নেই সিপিএম বা বামেদের। যার অন্যতম কারণ কংগ্রেস সমর্থকদের তীব্র বাম-বিরোধিতা। কংগ্রেস বাম হাত ধরলে কংগ্রেসের কিছু পকেটে টিকে থাকা  ভোটাররা বেশির ভাগই তৃণমূলকে ভোট দেবেন, সংগঠকদের এই শঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছেন না নেতৃত্ব। সিপিএমও এ কথা বিলক্ষণ জানে। গত বিধানসভা ভোটের পর এ কথাই বলেছিলেন সিপিএম নেতারা। যে, সমঝোতার তত্ত্ব মেনে বাম ভোটাররা জোটের কংগ্রেস প্রার্থীদের ভোট  দিলেও বামবিরোধী কংগ্রেস ভোটাররা বাম প্রার্থীদের ভোট দেননি। এই একই ঘটনা ঘটেছিল উত্তরপ্রদেশে, ৯০-এর গোড়ায় বিধানসভা ভোটে। মায়াবতী কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার পর প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওকে বলেছিলেন, আমার ভোটাররা কংগ্রস প্রার্থীদের ভোট দিলেও কংগ্রেসের ভোটাররা কিন্তু বিএসপিকে দেয়নি‌। সুতরাং আপনার সঙ্গে জোট বেঁধে আমার কী লাভ?

আরও পড়ুন ‘দিল’ যদি বড়ো হয় দেওয়াল কী ভাবে আটকাবে!

ভোট ট্রান্সফারের এই সমস্যার পিছনে আছে সমাজের উচ্চনীচ এবং ধনী-দরিদ্র ভেদ। এ জন্য পথে নেমে আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা জোটই একমাত্র স্থানীয় সরকার-বিরোধী সমঝোতার পথ প্রশস্ত করতে পারে। দু’ দলেরই পোড় খাওয়া নেতৃত্ব  এ ব‍্যাপারে সক্রিয় প্রয়াস চালাচ্ছেন।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নেতা পরিবর্তনের আগে রাজ‍্যের সর্ব স্তরের কংগ্রেস সংগঠক ও জনপ্রতিনিধিদের দিল্লিতে ডেকে পাঠান রাহুল গান্ধী। তাঁর তরুণ দলের গৌরব গগৈরা যেমন নেমে পড়েন গ্রাউন্ড ওয়ার্কে, তেমনি রাহুল এ বিষয়ে মাঠে নামান আহমেদ প‍্যাটেলের মতো পোড়খাওয়া প্রবীণকেও। আহমেদ নিজের সমঝদারিকে জারিয়ে নেন কংগ্রেসের প্রকৃত মার্গদর্শকদের মতামতে। কংগ্রেসের মার্গদর্শকদের বিজেপির মতো সুগঠিত কোনো মণ্ডলী নেই। তাঁরা কেউ কেউ দলের ওল্ড গার্ড হিসেবে যেমন পরিচিত তেমনি কেউ বা প্রত‍্যক্ষ রাজনীতির সংস্রবেই নেই। শুধু কংগ্রেসের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ান। যেমন প্রণব মুখোপাধ্যায়‌। দলের জটিল ও সুদূরপ্রসারী কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতারা তাঁর শরণ নিয়ে থাকেন। রাজ‍্য কংগ্রেসের নানা গোষ্ঠীর মতামত সংগ্রহ এবং আশু চ‍্যালেঞ্জের প্রশ্নে ওয়াকিবহাল হওয়ার পর তাঁর মতো প্রবীণতম ও নেতা হওয়ার দৌড়ে শামিল প্রত‍্যেকের সম্পর্কে অবহিত ব‍্যক্তির পথনির্দেশও চাওয়া হয়। হাইকমান্ড কী চাইছেন তা জেনে নিয়ে সম্পূর্ণ নির্মোহ মতামত দেন প্রণববাবু। দলীয় সূত্রের  মতে, ‌প্রণব মুখোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ আহমেদ ভাই-ই তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর মতামত আহমেদ প‍্যাটেলের সঙ্গে মিলে যায়। সোমেনকেই দলের এক সময়ের সব চেয়ে নিপুণ সংগঠক হিসেবে এই জটিল মুহূর্তে হাল ধরার উপযুক্ত বলে রায় দেন। বলেন, ওঁর কাজ হবে বাংলায় কংগ্রেসের আগামী দিনের নেতাকে চিহ্নিত ও অভিষিক্ত করা। সংগঠক সোমেনই জহুরির মতো আগামীর জননেতাকে তৈরি করতে পারবেন তা মনে করছেন হাইকমান্ড। যিনি হবেন মমতার বিকল্প।

অধীরকে সরিয়ে মুখ‍্যমন্ত্রীকে বার্তা ও মৃদু চাপের কূটনৈতিক অঙ্ক করল কংগ্রেস। জোটের জন্য কংগ্রেস প্রস্তুত কিন্তু তা আত্মবিক্রয়ের পথে নয়।

এ দিকে, এ বার প্রদেশের নেতা হওয়ার দৌড়ে কে না ছিলেন? এআইসিসিও বাছাই করতে গিয়ে সবাইকেই যাচাই করে নিয়েছে। কারও সঙ্গেই বৈষম্য করেনি। সেই সঙ্গে চেষ্টা করেছে জনপ্রিয় বিদায়ী নেতা অধীর চৌধুরীকেও কোনো আক্রমণ না করতে। সনিয়ার আশীর্বাদধন‍্য অধীরকে যত দিন সম্ভব রাখার চেষ্টা করেছেন রাহুলও। কিন্তু রাজ‍্য দলে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়া অধীরের বিরুদ্ধে এমন সব অরাজনৈতিক অভিযোগের স্রোত পৌঁছোতে থাকে দিল্লিতে যে নেতাদেরও আর কিছু না করে উপায় ছিল না। অথচ এই সব অভিযোগের কোনোটাতেই প্রত্যক্ষ ভাবে অধীর জড়িত ছিলেন না। কার্যত নিস্ক্রিয়তার দায়েই দায়ী হন তিনি। যদিও এআইসিসি এখনও মনে করে প্রকৃত জননেতা হিসেবে অধীরের জনপ্রিয়তাই রাজ‍্য কংগ্রেসে সর্বাধিক। যদিও জেলা বা তার লাগোয়া অঞ্চলের গণ্ডি পেরোতে পারেননি অধীর। এবং সমন্বয়ের প্রশ্নে তাঁর খামতি যথেষ্ট। সর্বোপরি, অধীর বিশেষ করে মমতার এতটাই চক্ষুশূল যে তাঁকে নিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে জোট রাজনীতি করা অসম্ভব। সে জন্য অধীরকে সরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বার্তা দেওয়াটাও জরুরি ছিল। কারণ কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য বাংলা নয়, দিল্লি। মমতা নয়, মোদীকে হঠানোই মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং যে রণনীতিতে বাড়তি আসন হাতে আসবে সেটাই হবে চূড়ান্ত নীতি। সিপিএমের সঙ্গে জোট গড়লে আসনের লক্ষ্যপূরণ হবে না। গত বারের জেতা আসনগুলোও রাখা যাবে না। চার জন সাংসদের মধ্যে তিন জনই তৃণমূলের সঙ্গে জোট করার পক্ষে রায় দিয়েছেন। একমাত্র অধীর চান বামেদের সঙ্গে সমঝোতা। এই অবস্থায় তৃণমূলের সঙ্গে জোট না হলে ডালুবাবু ও মৌসম তো বটেই, অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ও দলে থাকবেন কিনা সন্দেহ। আভাসে ইঙ্গিতে ডালু ও মৌসম দলকে জানিয়েই দিয়েছেন। অভিজিৎ বামেদের সঙ্গে যাওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

আরও পড়ুন ‘অচ্ছে দিন’, ‘কংগ্রেসহীন দেশ’ নারা হাতছাড়া, ইস্যুহীন আরএসএসে জোটের আতঙ্ক

এই অবস্থায় দায়িত্ব নিয়েই সোমেন মিত্র বলেছেন দলের আইডেন্টিটি আর তৃণমূলের আগ্রাসনের মুখে কংগ্রেসকে বাঁচানোর কথা। সিপিএমের নামে কোনো গালিগালাজ না করে ভিন্ন গোষ্ঠীর সমালোচনার পাত্র হয়েছেন। আক্রমণ করেছেন বিজেপিকে। এবং তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে জোট নিয়ে প্রশ্নে বলেছেন, ও ব‍্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে দিল্লি। তীব্র স্বাধিকারে বিশ্বাসী সোমেনবাবু কংগ্রেসের মতো জাতীয় দলের প্রদেশ শাখা চালনোর স্বাভাবিক বিধি অস্বীকার করেননি। যে ভাবে অধীর বলতেন সে ভাবেই বলেছেন। হাইকমান্ড এ বিষয়ে স্পষ্ট ম‍্যানডেট দিয়েই পাঠিয়েছেন সোমেনকে। অধীরের প্রতি তৃণমূল নেত্রী যতটা বিরূপ, সোমেনের প্রতি তার চেয়ে কম তা মোটেই নয়। কিন্তু অধীরের নেতৃত্বে এখনও বঙ্গে জেগে আছে কংগ্রেসের একটি মরুদ্যান, যা সোমেনের নেই। কংগ্রেসের শেষ ঘাঁটি বলতে তো এখনও মুর্শিদাবাদ‌। আরও গুরুত্বের কারণ এই জেলার মুসলমান জনসংখ্যা। শুধু এই অঞ্চলের বাঙালি মুসলমানরাই এখনও মনেপ্রাণে কংগ্রেসের সঙ্গে। তৃণমূল এখনও কলকে পায়নি বলেই সাম দাম দণ্ড ভেদ তীব্র হচ্ছে দিনে দিনে। এবং অধীর বশ‍্যতা স্বীকার করেননি, করার কোনো লক্ষ্মণও নেই।
পরিস্থিতি এক নয় মালদা জেলায়। তৃণমূল অনেকটাই দখল করেছে বরকতের জমি। এবং রাজনীতিতে ও দলে শিকড়বিহীন ডালু ও মৌসম শুধুই ভাই ও ভাগ্নি। নেতা নন। ফলে বরকতের শূন্যতা পূরণ সহজ মমতার পক্ষে। দুই সাংসদের কেউই মমতাকে চ‍্যালেঞ্জে অক্ষম। অতীতে বরকত যা অনায়াসে পেরেছেন এবং এখনও পারছেন অধীর।
আর সোমেন মিত্র বড় সংগঠক হলেও পায়ের তলার মাটি হারিয়েছেন। এই ধরনের নেতা বরাবরই দিল্লির মনপসন্দ। যখন সোমেনের হাতে সমর্থনভূমি ছিল তখন তাঁকে অপছন্দ করত দিল্লি। মধ্য কলকাতার জমিহারা সোমেনকে ডায়মণ্ড হারবারে নিয়ে গিয়ে কার্যত টবের শোভা বনসাই করে দেয় তৃণমূল। শিয়ালদায় অপরাজেয় ছিলেন সোমেন। এখন সেই কেন্দ্রই বিলুপ্ত।সোমেন এখন সোনার খাঁচা ছেড়ে উড়ে গিয়েছেন পুরোনো ঠিকানায়। তবু অধীরকে সরিয়ে মুখ‍্যমন্ত্রীকে বার্তা ও মৃদু চাপের কূটনৈতিক অঙ্ক করল কংগ্রেস। জোটের জন্য কংগ্রেস প্রস্তুত কিন্তু তা আত্মবিক্রয়ের পথে নয়। জোটের বিকল্প চতুর্মুখী লড়াই। তেমন পরিস্থিতি হলেও এগিয়ে থাকবে তৃণমূলই। কিন্তু ৪২ এর আশা পূর্ণ হবে কি? সে ক্ষেত্রে বিজেপির পকেটে চলে যেতে পারে ছুটছাট দু’চারটে। কংগ্রেস-তৃণমূল জোট হলে যা হবে না। নিশ্চিত নিশ্চিহ্ন হবে বিজেপি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন