19th feb, 1897, budgebudge rail station
১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৭। বজবজ রেলস্টেশন।
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের পথে। নিরাপত্তারক্ষী আর প্রতিবেদকের মধ্যে বাধা বড়োসড়ো লোহার গেট। কয়েক হাত দূরে পুণ্যতোয়া গঙ্গা, পণ্যবাহী জাহাজ আর বিপরীতে সেই ঐতিহাসিক ঘাট। যে ঘাটে নেমেছিলেন শিকাগো-ফেরত স্বামী বিবেকানন্দ। বর্তমানে সেটি পোর্ট ট্রাস্টের অধীনে রক্ষীদের বসার জায়গা।

এই গেট থেকে পথ এসেছে ঘুরে বর্তমানে যা পুরোনো বজবজ রেলস্টেশন নামে পরিচিত সেই দিকে। এই পথের মধ্যেই পড়ল কোমাগাটা মারু শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ।

komagata maru memorial
কোমাগাটা মারু স্মারক।

এই জায়গা যে কতখানি ঐতিহাসিক তা সহজেই অনুমেয়। এখানে ওয়েস্টবেঙ্গল ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের বোর্ড থাকলেও তা পড়ার অযোগ্য। অথচ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতায় এই জায়গা অন্য রূপে ধরা দিত। পুরোনো রেলস্টেশন খাঁ খাঁ। লাইনে দাঁড়িয়ে রেলের তেলের ট্যাঙ্কার।

১৮৯৭-র ১৮ ফেব্রুয়ারি বিবেকানন্দের জাহাজ এস এস মোম্বাসা নোঙর করল বজবজের গঙ্গায়, সন্ধের পরে। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী সূর্যাস্তের পরে জাহাজ থেকে নামা নিষেধ ছিল। তাই রাতটুকু জাহাজে কাটিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি নেমে এলেন বজবজের ঘাটে। বিশ্রাম করলেন বজবজ স্টেশনের প্রথম শ্রেণির কক্ষে। সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন সেভিয়ার, মিসেস সেভিয়ার, মিস্টার গডউইন, মিস্টার আনন্দ চারলু, স্বামী নিরঞ্জনানন্দ ও স্বামী শিবানন্দ। সেই প্রথম শ্রেণির কক্ষটি এখন রেলের ইয়ার্ড মাস্টারের অফিসঘর।

the room where swamiji took rest
বজবজ স্টেশনের এই ঘরেই বিশ্রাম করেছিলেন স্বামীজি।

এই ঘরের দক্ষিণপশ্চিম কোণে স্বামী বিবেকানন্দের ছোটো মূর্তি রাখা আছে। আছে ভারতে আসা স্বামীজির সঙ্গীদের ছবি দেওয়ালে। একটু যত্নবান হলে এই ঘর অন্য রকম ভাবে সাজালে তা দর্শনীয় স্থানে পরিণত হত। এলাকা ছাড়িয়ে কিছু মানুষের কাছে খোঁজ নিয়েও শোনা গিয়েছে অনেকেই এই ঘটনা জানেন না। প্রতি বছর একটি রেলগাড়িকে ‘পুণ্যবাহন পূর্ব রেল স্বামী বিবেকানন্দ স্পেশাল’ নামে সাজানো হয় অত্যন্ত আনন্দ ও উদ্দীপনার সঙ্গে। বজবজবাসী সহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা এবং আলমবাজার সহ বিভিন্ন মঠ ও মিশনের সন্ন্যাসীরা থাকেন সংরক্ষিত কামরায়। ট্রেনটির গন্তব্য শিয়ালদহ। এ বারেও এর ব্যত্যয় হচ্ছে না। বজবজ পুরসভার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান বহু মানুষ। এই কর্মকাণ্ডের অন্যতম পুরোধা তৎকালীন পুরসভার চেয়ারম্যান প্রবীণ গণেশ ঘোষ আজও সমান উৎসাহিত।

old budgebudge rail station
পুরোনো বজবজ স্টেশন।

শিকাগো-ফেরত স্বামীজি ভারতের নানা জায়গায় বক্তৃতা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ঠিক হয় জলপথে কলকাতা ফিরবেন। তাই সূচি বদলিয়ে আসেন জাহাজে, নামেন নির্জন নীরব বজবজ স্টেশনে। রাজধানী কলকাতার বাইরে বজবজের কথা তখন কেউ ভাবেনি। তাই রাতভর রেলের বিশ্রামকক্ষে বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন সকালে সাড়ে সাতটার লোকাল ট্রেনে শিয়ালদহে পৌঁছোন।

সাত বছর আগে, যে দিন বিবিদিষানন্দ বেরিয়েছিলেন, মঠ ছিল বরাহনগরের এক পোড়ো বাড়িতে। পরে ১৮৯২ সালে তরুণ সন্ন্যাসীরা চলে আসেন আলমবাজারের বাড়িতে। বিবেকানন্দ তখন খেতড়িতে। খবরটা পান চিঠিতে। খেতড়ির রাজা তাঁকে ‘বিবেকানন্দ’ নাম দেন। নিজের বালভূমিতে ফিরে সেই ১৯ ফেব্রুয়ারি আলমবাজার মঠে তাঁর প্রথম পদার্পণ।

আরও পড়ুন: ১৫৬তম জন্মদিনে স্মরণ করি শিকাগো-ফেরত স্বামীজির বজবজে পদার্পণের দিনটিকে

2 মন্তব্য

  1. এই মূল্যবান তথ্য সমৃদ্ধ লেখার দুটি বিষয়ে লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণের বিনীত অনুরোধ–(১)প্রথম প্যারায় লিখেছেন যে ১৮৯৭ সালের ১৮ ই ফেব্রুয়ারীর রাতটুকু স্বামীজী জাহাজেই কাটিয়ে পরের দিন ১৯ শে ফেব্রুয়ারী নেমে এলেন বজবজের ঘাটে যেহেতু তখন সূর্যাস্তের পর জাহাজ থেকে অবতরণ করা নিষেধ ছিল কিন্তু তৃতীয় প্যারায় আবার লিখেছেন যে তাই রাতভর রেলের বিশ্রাম কক্ষে বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন ট্রেনে শিয়ালদহ পৌঁছন | সুতরাং, দুটি প্যারায় দুরকম তথ্য হয়ে যাচ্ছে | কোনটা সঠিক তা জানার অপেক্ষায় থাকবো | (২) স্বামীজীর সঙ্গে ছিলেন মিস্টার আনন্দ চিকলু (চারলু নয়) এবং সঙ্গে খুব সম্ভবত ওনার স্ত্রী ও ছিলেন | প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্বামীজীর সফরসঙ্গী শ্রী আনন্দ চিকলু ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এর সর্বভারতীয় সভাপতি | লেখক কে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলছি আমার বলা বা বোঝায় কোনো ভুল হয়ে থাকলে মার্জনা করবেন |

    • আপনাকে ধন্যবাদ। অনবধানতা বশত প্রথম ভুলটি হয়েছে। স্বামীজি ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতটা জাহাজে কাটিয়ে পরের দিন ১৯ তারিখ বজবজ স্টেশনে এসে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেন। তখন তো হাতে গোনা ট্রেন ছিল। তাই স্টেশনে বেশ কিছুক্ষণ কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু ‘রাতভর’ স্টেশনের বিশ্রামকক্ষে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। এই ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে আবার ধন্যবাদ।
      দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে জানাই, স্বামীজির সফরসঙ্গীর পুরো নাম পনামবক্কম আনন্দ চারলু। তিনি পেশায় ছিলেন অ্যাডভোকেট। স্বাধীনতা সংগ্রামী আনন্দ চারলু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের গোড়ার দিকের নেতাদের অন্যতম। ১৮৯১ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে তিনি দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হন।
      আবার ধন্যবাদ। খবর অনলাইনের সঙ্গে থাকুন, পাশে থাকুন।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন