swamiji ai chicago art institute
শিকাগো ধর্ম সম্মেলনে স্বামীজি।

নিজস্ব প্রতিনিধি: শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে বসেছে ‘দ্য পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস’। ভারত থেকে এক তরুণ সন্ন্যাসী এসেছেন, হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি হয়ে। তাঁর বক্তৃতা করার পালা এল প্রায় বিকেলের দিকে। কিছুটা যেন নার্ভাস। জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীকে প্রণাম করে শরীরে-মনে যেন একটা নতুন উদ্যম পেলেন। মনে হল তাঁর শরীরে কে যেন ভর করেছেন। বক্তৃতা শুরু করলেন ‘সিস্টারস অ্যান্ড ব্রাদার্স অব আমেরিকা’ সম্বোধন করে। সাত হাজার দর্শক-শ্রোতা দাঁড়িয়ে উঠে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানালেন সেই তরুণ সন্ন্যাসীকে। দু’ মিনিট ধরে চলল হাততালি। ফলে সেই সন্ন্যাসীর জন্য বরাদ্দ সময় বাড়াতে বাধ্য হলেন উদ্যোক্তারা। আমেরিকা-সহ বিদেশ জয় শুরু হল স্বামী বিবেকানন্দের।

স্বামীজির বিশ্বজয়ের সেই সূত্রপাতের ১২৫ বছর পূর্ণ হল আজ, এই ১১ সেপ্টেম্বর।

১৮৯৩-এর ১১ সেপ্টেম্বর। শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে বসেছিল ‘দ্য পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস’। সে দিন আমেরিকাবাসীর মন কেড়ে নেওয়ার ফলস্বরূপ ১১-এর পরে আরও পাঁচ দিন বক্তৃতা করতে হয়েছিল স্বামীজিকে। ১৫, ১৯, ২০, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর। ধর্ম, সংস্কৃতি, সভ্যতা নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন তিনি। কিন্তু সব চেয়ে বড়ো কথা হল, সে দিন তিনি এমন কিছু বলেছিলেন, যা আজ একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের পৃথিবীতে সমান প্রাসঙ্গিক।

শিকাগোর সভায় কী বলেছিলেন তিনি, এক বার খুব সংক্ষেপে মনে করা যেতে পারে।

১১ সেপ্টেম্বরের প্রারম্ভিক বক্তৃতায় স্বামীজি যা বলেছিলেন, তার সারমর্ম:

“… আমরা শুধু সব ধর্মের প্রতি সহনশীল, তা-ই নয়। আমাদের কাছে সমস্ত ধর্মই সমান সত্যি। পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের, সমস্ত জাতির তাড়া খাওয়া মানুষ, শরণাগত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে যে জাতি, আমি সেই জাতির এক জন বলে গৌরববোধ করি। রোমানরা যে বছর ভয়ংকর অত্যাচারে ইজরায়েলের মানুষদের পবিত্র মন্দির ধ্বংস করেন, সে বছরই সে দেশের বহু মানুষ দক্ষিণ ভারতে এসে আশ্রয় নেন। কোটি কোটি মানুষ যে স্তোত্র আজও পাঠ করেন, আমিও যা ছোটোবেলা থেকে উচ্চারণ করে আসছি, তার কয়েকটা লাইন বলছি: ‘নানা নদীর উৎস নানা জায়গায়, কিন্তু যেমন তারা সবাই একই সমুদ্রে তাদের জল ফেলে মিশে যায়, তেমনই, হে ঈশ্বর, মানুষ আলাদা আলাদা সংস্কারের বশে, জটিল বা সরল যে পথেই থাক না কেন, সকলের গন্তব্য এক তুমিই’।

… সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি আর তার ভয়ংকর পরিণাম ধর্মোন্মত্ততা, এই সুন্দর পৃথিবীকে ছেয়ে ফেলেছে। পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করেছে, মানুষের রক্তে ভিজিয়ে দিয়েছে, সভ্যতাকে ধ্বংস করে সমস্ত বিশ্বকে হতাশায় ডুবিয়ে দিয়েছে। এই ভয়ংকর দানবগুলো না থাকলে মানুষের সমাজ এখন যতটা না এগিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে যেত।”

আরও পড়ুন ১৯ ফেব্রুয়ারি, বজবজে রাত কাটিয়ে ট্রেনে শিয়ালদহে এলেন শিকাগো-ফেরত স্বামীজি

১৫ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে মতপার্থক্যের ফলে ধর্মমহাসভার ছন্দপতনে উপক্রম হয়। তখন স্বামীজি উঠে দাঁড়িয়ে ‘কুয়োর ব্যাঙের গল্প’টি বলে সবার মুখ বন্ধ করে দেন।

“… সংকীর্ণ ভাবনাই আমাদের মধ্যে এত ঝগড়াঝাঁটির কারণ। আমি একজন হিন্দু – আমি আমার ছোট্ট কুয়োর মধ্যে বসে আছি আর সেটাকেই গোঁটা পৃথিবী ভাবছি। খ্রিস্টান ধর্মে যিনি বিশ্বাসী, তিনি তাঁর নিজের ছোট্টো কুয়োয় আর সেটাকেই গোটা দুনিয়া মনে করছেন। মুসলমানও নিজের ছোট্টো কুয়োয় বসে আছেন আর সেটাকেই গোটা জগৎ মনে করছেন।”

২৭ সেপ্টেম্বরের বিদায় সম্ভাষণেও স্বামীজি ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর প্রথম বক্তৃতার সুরে। দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, …কেউ যদি স্বপ্ন দেখে, তার নিজের ধর্মটি, একলা বিরাট হয়ে বেঁচে থাকবে, আর অন্যগুলি নিপাত যাবে, তবে তিনি বাস্তবিকই কৃপার পাত্র। তাঁকে স্পষ্ট ভাবে বলে দিতে চাই যতই বাধা আসুক না কেন, সব ধর্মের পতাকায় খুব শীঘ্রই লেখা থাকবে, ‘বিবাদ নয়, সহায়তা। বিনাশ নয়, আত্মস্থ করা। মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি’।”

শিকাগো ধর্মসভা সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক বক্তৃতা আজ ফিরে দেখা খুবই জরুরি – আমাদের দেশ, আমাদের মহাদেশ এবং আমাদের বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে। পবিত্র সেই সেপ্টেম্বরে বিনম্র নিবেদন –

কেন আজ আমার এ দেশে/আমার এই পৃথিবীতে/নিয়ত ষড়যন্ত্র করে/অমানবিক হিংস্রতা?/কেন আমার দেশের/আর আমার পৃথিবীর/আজকের নাম হল/মৃত্যুর উপত্যকা?/যদিও, ‘শৃন্বন্ত বিশ্বে’/সবাই ‘অমৃতস্য পুত্রার’ –/তবুও কেন খুন হয় মানুষ/অন্য এক মানুষের হাতে?/যদিও পৃথ্বীর নীল আকাশে/ধ্বনিত ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ –/তবুও মানুষ নিপীড়িত হয়/এক অন্য মানুষের ছলনায়।/ওগো পৃথিবীর অধিদেবতা,/আমার স্বদেশের গণদেবতা –/বাঁচাও আমার দেশ-পৃথিবীকে/ফিরিয়ে দাও তার শাশ্বত পরিচয় –/সেই অনির্বাপিত শান্তির যজ্ঞে/দধীচির অস্থির মতো/দিতে পারি আমার সব কিছু —/যদি প্রয়োজন হয়।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন