today's teesta
সেই তিস্তা আজ। ছবি সৌজন্যে ইন্ডিয়ান রেল ইনফো।
রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়

জলপাইগুড়ি: দুর্গাপুজো সবে পার হয়েছে। তার পর থেকেই শুরু হল অঝোর ধারায় বৃষ্টি। তিন দিন ধরে বৃষ্টি চলছে। পরের দিনই লক্ষ্মীপুজো। আমাদের বাড়ি থেকে পাড়া-প্রতিবেশীরা লক্ষ্মীপুজোর সময় ভোগ রাঁধার বাসন নিয়ে যেতেন। টিনের বাড়ির সিলিং-এ বাসন রাখা থাকত। বিভিন্ন পার্বণে নামানো হত। বাসন নামানোর জন্য প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে একটা মই আনা হয়েছিল। সেই মইটাই আমাদের বাড়ির সবাইকে বাঁচিয়ে দিল।

ঠিক ৫০ বছর আগের কথা। ১৯৬৮ সাল। অক্টোবরের তিন তারিখ, রাত সোয়া একটা। হঠাৎ প্রচণ্ড হইচই শুনে আমার এক কাকার ঘুম ভেঙে গেল। কীসের হইচই দেখার জন্য বাকিরাও ঘুম থেকে উঠে পড়ল। আমি তখন স্কুলে পড়ি। ইতিমধ্যে একজন কেউ রাস্তা দিয়ে চিৎকার করে বলতে বলতে গেল, তিস্তা নদীর বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। বাড়ির সবাই মিলে উঠোনে নেমে দেখি পায়ের পাতাসমান জল। মূহূর্তের মধ্যে জল হাঁটুর কাছাকাছি চলে এল। মইটা টিনের চালের বারান্দার সঙ্গে লাগানো ছিল। জল ঠেলে মইয়ের কাছে গিয়ে একে একে আমাদের ভাইবোনদের টিনের চালে তুলে দেওয়া হল। তার পর বৃদ্ধা ঠাকুমাকে তোলা হল। সব শেষে কাকারা উঠলেন। মাত্র পনেরো মিনিট। এরই মধ্যে ঘরের মধ্যে বুকসমান জল।

আরও পড়ুন আকাশে এখন হাড়িকাট, চৌরঙ্গি, মোমবাতি, শতরঞ্জির উৎসব

আমরা বাড়ির সবাই টিনের চালের ওপরে বসে আছি। মাথার ওপর বৃষ্টি পড়েই চলেছে। সবাই মিলে বোঝার চেষ্টা করছি জল আর বাড়ছে কিনা। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। জল বেড়েই চলেছে। বাকি রাতটা চালে বসেই কেটে গেল। ভোর হল। চার তারিখের ভোর। ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় দেখলাম আমাদের টিনের চাল ছুঁতে জলের ফুট খানেক বাকি। কিন্তু ওইখানে এসেই জল দাঁড়িয়ে গেল। আর আধ ঘণ্টা পর থেকে জল কমতে শুরু করল। চালায় আরও বেশ খানিকক্ষণ কাটানোর পর বেলার দিকে আমরা নেমে এলাম। জল ততক্ষণে অনেকটাই নেমেছে।

karala river now.
এখনকার করলা।

বিকেলের মধ্যে জল চলে গেল। কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ মনে পড়িয়ে দিল আজ লক্ষ্মীপুজো। সারা দিন সবাই অভুক্ত। কিন্তু কিছু রাঁধতে হলে তো আগুন জ্বালাতে হবে। প্রতিবেশীদের কারও বাড়ি থেকে একটা দেশলাই জোগাড় হল। বাড়িতে ছিপিবন্দি দু’ বোতল কেরোসিন তেল ছিল। তা দিয়ে কী করে যে মা আর কাকিমা ভেজা চাল ডাল ফুটিয়েছিলেন তা আজ আর মনে নেই। নুন আর মশলাবিহীন সে দিনের সেই চালডালসেদ্ধ অমৃত মনে হয়েছিল।

জল তো চলে গিয়েছে। কিন্তু রেখে গিয়েছে বন্যার চিহ্ন। বাড়ির উঠোন ঘরদোর, সব জায়গায় জমাট পলি। কেঊ যে কোথাও একটু হাত-পা ছড়াবে তার উপায় নেই। খাট এবং চৌকি থেকে পলিভর্তি ভেজা বিছানা নামানো হল। কুয়ো থেকে ঘোলা জল তুলে কোনো রকমে ধুয়ে ভেজা খাটে শুয়ে বসে সে দিনের রাত আমরা কাটিয়েছিলাম।

সে দিনের কথা আজও ভুলতে পারেন না বুলগান বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫০ বছর আগের এই দিনটিতেই তিনি তাঁর মা, ছোটো বোন আর দাদুকে হারিয়েছিলেন। শুধু বুলগানই না, বীণা ভট্টাচার্য হারিয়েছিলেন তাঁর শাশুড়িকে, পবিত্র ভট্টাচার্য হারিয়েছিলেন তাঁর মাকে। সেই পবিত্রবাবুও আজ প্রয়াত। সে দিন বুলগান, বীণা, পবিত্রবাবুর মতোই আরও অসংখ্য লোক তাঁদের স্বজনদের হারিয়েছিলেন। সে দিন জলপাইগুড়ি দেখেছিল মৃত্যুর মিছিল। সে দিন জলপাইগুড়ি শহরে যা ঘটেছিল তাকে বন্যা বললে কম বলা হয়, সে ছিল প্রলয়। তিস্তা আর করলার জোড়া ফলায় বিধ্বস্ত হয়েছিল জলপাইগুড়ি। সেই স্মৃতি আমার মতো অনেকেরই দগদগে ঘা হয়ে বেঁচে আছে।

আরও পড়ুন আসামের বাঙালিদের সামনে এখন দুর্যোগের ঘনঘটা

শহরের আগে পাহাড়পুর এলাকা। শহরের শুরুতে টোপামারি, রায়কতপাড়া এলাকা। জল ঢুকতে শুরু করল রাত সোয়া একটা নাগাদ। প্রতিটি বাড়িতে জল। প্রথমে পায়ের পাতা, তার পর একটু একটু করে হাঁটু, তার পর কোমর, তার পর বুক।শহরের অধিকাংশ বাড়িতে তখন টিনের চাল। সেই চালই তখন শহরবাসীর আশ্রয়।

কিন্তু অনেকেই বেরোলেন পাকা বাড়ির সন্ধানে। যেমন বেরিয়েছিলেন রায়কতপাড়ার বাসিন্দা বুলগান বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা। বুলগানবাবুর বাবা সে দিন শিলিগুড়িতে। বাড়িতে একটা ঘরে মা আঙুরবালা তিন ছেলে আর চার মেয়েকে নিয়ে শুয়ে। একান্নবর্তী পরিবারে ছিলেন দাদু, ছিল কাকাদের পরিবারও। হইচই শুনে বুলগানবাবুর মা সবাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। ৫০ মিটার দূরেই একটা পাকা বাড়ি। লক্ষ্য সেইখানে পৌঁছোনো। ইতিমধ্যে জল দ্রুত বাড়ায় এবং প্রচণ্ড স্রোত থাকায় তাঁরা ছিটকে যান।

বুলগানবাবু, তাঁর দিদি এবং দুই বোন স্রোতের টানে পাশের বাড়ির ছাদে গিয়ে ওঠেন। তাঁর ভাই শম্ভু একটা জিকা গাছকে আশ্রয় করে আটকে থাকে। তাকে সেখান থেকে সকালে উদ্ধার করা হয়। আঙুরবালা দেবীর কোলে ছিল বুলগানবাবুর ছোটো বোন পাঞ্চালি। তাদের আর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। ইতিমধ্যে ভোরের আলো ফুটল। দেখা গেল জলপাইগুড়ি শহরের মধ্যে দিয়ে তিস্তা বয়ে চলেছে। তার জলে ভেসে চলেছে অসংখ্য গবাদি পশু। অসংখ্য সাপও। শহরের রায়কতপাড়া, সেনপাড়া, হাকিমপাড়া, সমাজপাড়া, দিনবাজার এলাকায় একতলা সমান জল। বাকি অংশে কিছু কম।

the condition of teestabazar iin 68 floods.
’৬৮-এর বন্যায় তিস্তা। তিস্তাবাজারের ছবি। সৌজন্যে সেভ দ্য হিলস।

বিকেলের দিকে জল চলে যেতে বুলগানবাবুরা মা এবং বোনকে খুঁজতে বেরোলেন। ইতিমধ্যে চিন্তা আর উৎকণ্ঠায় হৃদরোগ হয়ে দাদু সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায় মারা গেলেন। চার তারিখের রাত অনিদ্রা, উৎকন্ঠা, উপবাস আর শোকে কাটল সকলের। পরদিন ৫ তারিখ সকালে ঝকঝকে রোদ। দেখা গেল বুলগানবাবুর মা তাঁর ছোটো বোনকে কোলে নিয়ে একটি বাড়ির কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে আটকে আছেন। তাঁদের উদ্ধার করার পর দেখা গেল তাঁরা তখন মৃত। সেই স্মৃতিচারণা করতে করতে বুলগানবাবু বললেন, “মাকে হারিয়ে সে দিন থেকে আমরা অনাথ হয়ে গেলাম। দাদু আর বোনকেও তিস্তা নিয়ে নিল।”

রায়কতপাড়ার বীণা ভট্টাচার্যের বয়স এখন ৮৫। ‘৬৮-এর বন্যায় তিনি তাঁর শাশুড়ি নগেন্দ্রবালা দেবীকে হারিয়েছিলেন। সে দিনের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, “ওনার পক্স হয়েছিল। খাটের ওপর খাট দিয় ওনাকে ওপরে তুলে রাখা হয়েছিল। জলের স্রোতে সব কিছু ভেঙে যায়। তিনি ঘরের মধ্যে জলে ডুবে মারা যান।” জেলা সিপিআইয়ের পবিত্র ভট্টাচার্যও থাকতেন রায়কতপাড়ায়। পবিত্রবাবুর মা দুলালি দেবী বাড়ির সবাইকে কাছের একটি দোতলা পাকা বাড়িতে তুলে দিয়ে নিজে আর উঠতে পারেননি। স্রোতের ঘুর্ণিপাকে একটি লিচুগাছের তলায় আটকে যান। পরে তাঁর মৃতদেহ মেলে।

জলপাইগুড়ি শহরের উত্তরে পাহাড়পুর। সেবকের দিক তিস্তা নেমে এসে এই পাহাড়পুরে বাঁক নিয়েই জলপাইগুড়ি শহরে ঢুকেছে। শোনা যায় তিন দিনের বৃষ্টিতে ধস নেমে সিকিম এলাকায় তিস্তা নদীতে হ্রদের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই হ্রদ ভেঙে হুড়মুড় করে জল তোড়ে নেমে আসে, বয়ে যায় নদীর বুক চিরে। পাহাড়পুর এলাকায় বাঁকের মুখে বাঁধে ধাক্কা মেরে বাঁধ ভেঙে ফেলে। তার পর দ্রুত জলপাইগুড়ি শহরের মধ্যে ঢুকে বইতে শুরু করে। ‘৬৮-এর সেই প্রলয়ঙ্করী বন্যায় প্রচুর প্রাণহানি ঘটে। অগণিত গবাদিপশু মারা যায়। প্রচুর বাড়িঘর ভেঙে যায়।

এখনও মনে আছে ১৯৬৮ সালের অক্টোবর মাসের পাঁচ কি ছয় তারিখে কলকাতার প্রথম শ্রেণির একটি দৈনিকের প্রথম পাতার ব্যানার হেডলাইন ছিল “বাঁধভাঙা জলের তোড়ে জলপাইগুড়ি শহরে প্রলয়।”

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন