সিদ্ধার্থ বসু

রাজা রামমোহন রায়ের বিলেতযাত্রার প্রায় ৬৫ বছর আগে নদিয়ার মানুষ মির্জা শেখ এহতে শামউদ্দিন প্রথম ইংল্যান্ডে যান। রামমোহন রায় ইংল্যান্ডে যান ১৮৩১ সালে দিল্লির বাদশাহের হয়ে দৌত্যকর্ম করতে। আর তার ঠিক ৬৫ বছর আগে দিল্লির বাদশাহের হয়ে নদিয়ার মানুষ এহতে শামউদ্দিন ইংল্যান্ডে যান। ওই একই কাজ, দৌত্যকর্ম করতে। এখানে দু’জনের কাজের ধরন একই ছিল। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।

এহতে শামউদ্দিনের কথা মানুষের মনে নেই। ফরাসি ভাষায় সুপণ্ডিত এই মানুষটি ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে ১৭৮৪ সালে লেখেন ‘শেগুর্ফনামা–এ-বেলায়েত’ নামে একটি গ্রন্থ। এই গ্রন্থ একই সঙ্গে তাঁর আত্মজীবনী ও ভ্রমণবৃতান্ত।  এই বইয়ের অনুবাদ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজির অধ্যাপক কায়সার হক। বইটির ইংরাজি নাম ‘দ্য ওয়ান্ডার্স অফ বিলায়েত’।

কী ভাবে গেলেন এই পণ্ডিত মানুষটি ইংল্যান্ডে? মুঘল বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের অনুরোধপত্র ও এক লক্ষ টাকার উপঢৌকন নিয়ে দূত যাবে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় জর্জের কাছে। ঢাকায় তখন প্রথম ইংরেজ প্রশাসক  ক্যাপ্টেন সুইন্টন। তিনি এই কাজের জন্য দূত মনোনীত হন। তাঁকে সহযোগিতা করার জন্য নিযুক্ত হন মির্জা শেখ এহতে শামউদ্দিন। ফরাসি ভাষায় লেখা অনুরোধপত্রটি পড়ার কাজেই তিনি নির্বাচিত হয়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন ১৭৬৫ সালে। প্রায় ছ’ মাস লেগেছিল ইংল্যান্ড যেতে। সুদীর্ঘ ছ’ মাস লাগার কারণ, সুয়েজ হয়ে যাওয়া যেত না, তাঁকে যেতে হয়েছিল মরিশাস, কেপ, আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল এবং ফ্রান্সের উপকূল হয়ে। সুদীর্ঘ এই যাত্রাপথে তিনি দেখেছিলেন অনেক বিচিত্র মানুষ, তাদের বিচিত্র জীবনযাত্রা ও তাদের শরিক হয়েছিলেন তিনি। ১৭৬৫ সালে জানুয়ারিতে কলকাতার হিজলি ঘাটের মঁসিয়ে সোরভিসের জাহাজ চড়ে তিনি যাত্রা করেন ইংল্যান্ডের উদ্দেশে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে তিনি মিলিত হন উইলিয়াম জোন্স ও অধ্যাপক ডাঃ হান্টের সঙ্গে। উভয়েই তাঁর পাণ্ডিত্যের প্রশংসা করেন।  এই উইলিয়াম জোন্সই পরবর্তী সময় কলকাতা হাইকোর্টের জজ হন এবং ১৭৮৪ সালে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠা করেন।

নদিয়ার কোথায় বাড়ি ছিল এই এহতে শামউদ্দিনের? ফরাসি ভাষায় পণ্ডিত এই মানুষটির জন্ম ১৭৩০ থেকে ৩২-এর মধ্যে নদিয়ার পাঁজনুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম তাজউদ্দিন এবং পিতামহ শিহারউদ্দিন তালিশ। ‘তারিখ-এ- আসাম’ গ্রন্থের লেখক ছিলেন শিহারউদ্দিন তালিশ। ‘তারিখ-এ-আসাম’ গ্রন্থে আছে মীরজুমলার অসম অভিযানের বর্ণনা। তালিশ ভারতবর্ষে আসেন ইরান থেকে। তার পর পাকাপাকি ভাবে বসবাস করতে শুরু করেন বাংলাদেশে। পাঁজনুর থেকে গ্রামটি পঞ্চনুর নামে পরিচিত হয়। এই গ্রামটি চাকদহ থানার অন্তর্গত।

আরও পড়ুন: বাঙালির মাছ-বিলাসের রূপকার বিজ্ঞানী হীরালাল চৌধুরীকে আমরা ভুলতে বসেছি 

পরবর্তী কালে ১৮৫৫-৫৭ সালে যখন গর্ভনর জেনারেল ছিলেন লর্ড ডালহৌসি, সেই সময়ে রেলের রেভিনিউ সার্ভে ম্যাপে এই পাঁজনুর গ্রামের নাম পরিবর্তিত হয়ে যায়। পাঁজনুর থেকেই পরিবর্তন হয়ে ওই জায়গার নাম হয় কাজীপাড়া। যেখানে প্রথম ইংল্যান্ড যাত্রী শেখ এহতে শামউদ্দিনের জন্মস্থান। কোনো সংরক্ষণ নেই। আজও অজানা থেকে গেছেন মানুষটি। অথচ লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সযত্নে রাখা আছে এহতে শামউদ্দিনের লেখা ফরাসি গ্রন্থটি। ফরাসি ‘শিশ্যফর্মনামা-এ-বেলায়েত’ যার অর্থ হল ‘বিলাতযাত্রা বৃত্তান্ত’।

লেখাটি বহুভাষ পত্রিকায় প্রকাশিত

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here