sridevi

প্রসিত দাস

কী বলব একে? দিগন্তে মেঘের টিকিটিরও দেখা ছাড়াই বজ্রপাত, নাকি অন্য কিছু! একেই কি বলে নিয়তির পরিহাস? নইলে কিনা ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’-র তিরিশ বছর পূর্তির কয়েক মাসের মধ্যেই চলে গেলেন শ্রীদেবী, আর তা-ও কিনা মাত্র চুয়ান্ন বছর বয়সে!

অনেকেই যদিও মনে করেন ‘সোলওয়া সাওয়ন’ (১৯৭৮)-ই তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি, তথ্যটা সঠিক নয়। তার আগেই ‘জুলি’ (১৯৭৫) ছবিতে মাত্র বারো বছর বয়সে নায়িকার বোনের ভূমিকায় অভিনয় করে ফেলেছেন। আর তামিল-তেলুগু ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ তো তারও পাঁচ-ছ বছর আগেই। কিন্তু অমল পালেকরের বিপরীতে পি ভারতীরাজা পরিচালিত ‘সোলওয়া সাওয়ন’-ই নায়িকা হিসেবে তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি। আর সেই পর্ব শেষ ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কোন সাচ্চা কোন ঝুটা’ দিয়ে (এ ক্ষেত্রেও অনেকেই ঘরের ছবি ‘জুদাই’-কে তাঁর শেষ ছবি মনে করলেও কথাটা ঠিক নয়, ‘জুদাই’ মুক্তি পেয়েছিল ওই বছরেই, তবে একটু আগে)। অর্থাৎ মেরেকেটে বছর কুড়ির বলিউডি কেরিয়ার। আর এই কুড়ি বছরের জন্যই শ্রীদেবী শ্রীদেবী।

sridevi in Mr. India
‘মিঃ ইন্ডিয়া’-তে।

এমনিতেই আশির দশক সময়টা বলিউডের পক্ষে খুব ভালো নয়। অমিতাভ যুগ তখনও চলছে। মনমোহন দেশাই ও প্রকাশ মেহরার হাত ধরে যে ফর্মুলা সিনেমা আবির্ভূত হয়েছিল তা তখন যুক্তির সব সীমাকে ছাড়িয়ে বহু দূর চলে গেছে। এর মধ্যেই হইহই করে এসে পড়েছে ডিস্কো যুগ, আর সত্তরের দশকের নায়িকারা তখনও মধ্যগগনে, রেখার দ্বিতীয় ইনিংস চলছে। এর মধ্যেই ‘হিম্মতওয়ালা’ (১৯৮৩)-র সৌজন্যে শ্রীদেবী নামে এক নতুন নায়িকার উত্থান। যে ছবির চিত্রনাট্য ১১০ শতাংশ নায়ক জিতেন্দ্রকে ভেবে লেখা সেখানে এক সপ্রতিভ, স্বতস্ফুর্ত তরুণী নায়িকাকে আবিষ্কার করা গেল। আর পরিচালক-প্রযোজকরাও হাতে চাঁদ পেলেন।

sridevi in chandni
‘চাঁদনি’তে।

একের পর এক ছবিতে তাঁরা শ্রীদেবীকে দিয়ে কী না করিয়েছেন! প্রায়-বাপের বয়সি নায়কের সঙ্গে প্রেম, বিচিত্র কস্টিউম পরে ততোধিক বিচিত্র নাচানাচি, অলীক অ্যাকশন, মাথামুণ্ডুহীন চিত্রনাট্যে চূড়ান্ত সেন্টিমেন্টাল অভিনয়। আর যা-ই তিনি করেছেন তাকেই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পেরেছেন, তাতেই মাতিয়ে দিতে পেরেছেন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা, করোলবাগ থেকে কালীঘাট। আর একের পর এক ছবি কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। ১৯৮৭ সালে ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’-র বছরে তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির সংখ্যা ৬, আর ১৯৮৯ সালে সুপারহিট ‘চালবাজ’ ও ‘চাঁদনি’-সহ তাঁর মোট মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির সংখ্যা ৭! আর এর মধ্যেই তামিল-তেলুগু-মালায়ালাম-কন্নড় মিলিয়ে অন্তত গোটা ষাটেক ছবিতে শুধু অভিনয় নয়, প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জন্য আলাদা জায়গাও তৈরি করে ফেলেছেন।

পর্দা-উপস্থিতি আর সপ্রতিভতার জন্য হিন্দি ছবির অভিনেত্রীদের মধ্যে যদি কোনো প্রতিযোগিতা হয় তবে শ্রীদেবী নিশ্চিত ভাবেই প্রথম দিকে থাকবেন। ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ ছবিতে জুয়ার আড্ডায় তাঁর সেই চ্যাপলিনেস্ক অভিনয়ের কথা মনে পড়ছে? এই ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রসঙ্গে এক সমালোচক বলেছেন, শ্রী-কে দেখে মনে হয় তিনি যেন শুধু আঙুল দিয়েও অভিনয় করতে পারেন। আবার এর পাশাপাশি আছে ‘সদমা’ (১৯৮৩) বা ‘লমহে’ (১৯৯১)-র মতো ছবি। মনে রাখবেন সে যুগে নায়িকাদের ভেবে চিত্রনাট্য লেখার রেওয়াজ ছিল না। আর আজকের প্রিয়াঙ্কা-দীপিকা-ক্যাটরিনাদের বলিউডেও যা ঘটে না, হিন্দি ছবির ইতিহাসে যা ঘটেছে শুধুমাত্র রেখা এবং খুব অল্প সময়ের জন্য মাধুরী দীক্ষিতের ক্ষেত্রে, শ্রীদেবীর ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছিল। তাঁকেই নায়ক করে, তাঁরই চওড়া দু’ কাঁধের ভরসায় পরপর ছবি তৈরি হয়েছে সেই আশির দশকের শেষাশেষি নাগাদ আর নব্বইয়ের গোড়ায়। তরুণ শাহরুখ খানও এ রকম একটা ছবিতে (‘আর্মি’) শ্রীদেবীর বিপরীতে অভিনয় করেছেন।

sridevi in english vinglish
‘ইংলিশ ভিংলিশ’-এ।

মাঝখানে প্রায় পনেরো বছরের লম্বা বিরতি। এর মধ্যে অবশ্য মুক্তি পেয়েছে অক্ষয় কুমারের সঙ্গে ‘মেরি বিবি কা জবাব নেহি’ (২০০৪)। বিভ্রান্ত চিত্রনাট্যের মধ্যেও কিছু একটা খাড়া করতে আপ্রাণ চেষ্টাও করেছেন শ্রীদেবী, তবে ওই পর্যন্তই। তার পর আবার চমকে দিলেন গৌরী শিন্ডে-র ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ (২০১২)-এ। বিশ্বায়ন-উত্তর দুনিয়ায় এক মধ্যবয়সি গৃহবধূর ক্ষমতায়নের গল্প, ইংরাজি শেখার মধ্যে দিয়ে। গত বছর ‘মম’-এ তাঁকে দেখে ঠিক মন ভরেনি। কিন্তু আমরা তাঁর দ্বিতীয় ইনিংস দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। ভারতীয় ছবিতে মধ্যবয়সি অভিনেত্রীদের জন্য চিত্রনাট্য লেখার চল নেই, কিন্তু সুখের বিষয় বলিউডও বদলাচ্ছে। কিন্তু ওই যে বলেছি, নিয়তির পরিহাস, তাই এই বদলাতে-থাকা বলিউড আর তাঁকে পেল না।

তাঁর পরিণত বয়সের পরিচালক গৌরী শিন্ডে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, শ্রী মানুষটা এমনিতে শান্তশিষ্ট, প্রায় লাজুকই বলা চলে, কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই ওঁর মধ্যে একটা প্রায়-জাদুকরী পরিবর্তন হয়। আজকের গ্ল্যামারশোভিত বলিউডে পর্দায় সে রকম আরও কিছু জাদু দেখার থেকে বঞ্চিত হলাম আমরা!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here