নভেম্বরের শুরুতে কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই ভারত সরকার ঘোষণা করল দু’টি উচ্চমানের নোট বাতিলের কথা,  ৫০০ আর ১০০০। এর ফলে দেশের টাকার বাজার থেকে তুলে নেওয়া হল শতকরা আশি শতাংশের বেশি নগদ। দেশ জুড়ে তোলপাড়, বিক্ষোভের মাঝে সবার আড়ালেই রয়ে গেল কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ওয়াশিংটনের ভূমিকা। সবার নজর এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাটাও বেশ অবাক করা। কারণ, সরকারের বিমুদ্রাকরণের ঘোষণার পেছনে ওয়াশিংটনের হাত আড়াল করার প্রচেষ্টা যথেষ্ট মজবুত ছিল না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা করেছিলেন, চিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে তাঁর বিদেশনীতিতে অগ্রাধিকার পাবে ভারত-মার্কিন কৌশলী অংশীদারত্ব। এই অংশীদারিত্বের পরিপ্রেক্ষিতেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উন্নয়ন সংস্থা ‘ইউএসএআইডি’ (ইউনাইটেড স্টেটস্‌ এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট) ভারতের অর্থ মন্ত্রকের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি করেছে। চুক্তির অন্যতম লক্ষ্যই হল, ভারত-সহ সারা বিশ্বে নগদ লেনদেনকে পিছনে ঠেলে দিয়ে ডিজিটাল লেনদেনকে জনপ্রিয় করে তোলা।

নভেম্বরের ৮ তারিখ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করলেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাতিল হয়ে যাবে সব ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পুরোনো নোট জমা দেওয়ারও খুব স্বল্প সময় ঘোষণা করা হল সরকার থেকে। নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার যে ক্ষমতা জনসাধারণের রয়েছে, তাতেও ব্যাপক ভাবে কাটছাঁট করা হল। ভারতের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই। কাছাকাছি কোনো ব্যাঙ্কের শাখা নেই, এ রকম জনসংখ্যাও নেহাত কম নয়। ভারতের অর্থনীতি প্রধানত নগদনির্ভর। ফলত, বিমুদ্রাকরণের ঘোষণার পর থেকেই ব্যাপক নগদ সঙ্কট অনুভূত হল সারা দেশ জুড়ে। সমাজের সব চেয়ে নিচু তলার মানুষ যাঁরা, যাঁরা চূড়ান্ত দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন প্রতি দিন, তাঁরাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন সরকারের এই সিদ্ধান্তে। অসংগঠিত ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকায়, জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য সামগ্রী বা পরিষেবা (পর্যাপ্ত খাবার, ওষুধ, হাসপাতাল) পেতে তাঁদের পোয়াতে হল বাড়তি ঝক্কি। নভেম্বর পেরিয়ে ডিসেম্বর এল, কিন্তু বিশৃঙ্খলতা রইল একই রকম।

চার সপ্তাহ আগে

সরকারের নোট বাতিলের ঘোষণার সপ্তাহ চারেক আগেই ভারতে নগদহীন লেনদেনকে ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘ক্যাটালিস্ট, ইনক্লুসিভ ক্যাশলেস পেমেন্ট পার্টনারশিপ’ তৈরির কথা ঘোষণা করে ইউএসএআইডি। ১৪ অক্টোবরের প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “সার্বিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে সুবিধাজনক করে তুলতে ইউএসএআইডি এবং অর্থ মন্ত্রকের অংশীদারিত্বের পরবর্তী ধাপ এই ক্যাটালিস্ট”। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ইউএসএআইডি-র ওয়েবসাইটে প্রেস বিবৃতির তালিকায় এই বিবৃতির কোনো উল্লেখ নেই। জেনেশুনে ইচ্ছাকৃত ভাবে ‘ভারত’ শব্দটিও ব্যবহার করা হয়নি। আপনি যদি জানেন এ ধরনের বিবৃতির অস্তিত্ব আছে, তা হলে তা খুঁজে বের করতে আপনাকে ওয়েব সার্চে গিয়ে তন্ন তন্ন করে ঘাঁটতে হবে। যাই হোক, এই ধরনের আরও কিছু বিবৃতি, যা কিনা আপাতদৃষ্টিতে খুবই একঘেয়ে, ৮ নভেম্বরের পর তা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং সেগুলো থেকে ক্রমশই বেরিয়ে আসছে নানা তথ্য।

ইতিমধ্যেই যা ঘটে গিয়েছে, তার আলোকে যদি এই বিবৃতিগুলো পড়া যায় তা হলে এই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, কোনো রকম সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি না করে যাতে ভারতবাসীর নগদ ব্যবহারে আঘাত হানা যায় তার জন্য এই ‘ক্যাটালিস্ট’ এবং ইউএসএআইডি ও ভারতের অর্থ মন্ত্রকের সমঝোতাকে, যা থেকে ‘ক্যাটালিস্ট’-এর জন্ম, কাজে লাগানো হয়েছে।    

ক্যাটালিস্টের ইনকিউবেশন প্রোজেক্টের ডিরেক্টর হলেন অলোক গুপ্তা, যিনি এর আগে ছিলেন ওয়াশিংটনের ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিটিউটের মুখ্য অপারেটিং অফিসার। এই ইনস্টিটিটিউটের প্রধান স্পনসর হল ইউএসএআইডি। এখন ভারতে সব ধরনের পরিচয়পত্রের ‘বড়ো ভাই’ যেটি, সেই বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র ‘আধার’ তৈরির পেছনেও যে দল কাজ করেছিল তার অন্যতম সদস্য ছিলেন এই অলোক গুপ্তা।

ভারতের সংবাদপত্র ‘ইকনমিক টাইম্‌স’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, তিন বছরের জন্য ক্যাটালিস্টকে অর্থ জোগানোর জন্য দায়বদ্ধ ইউএসএআইডি। টাকার অঙ্কটা অবশ্য গোপন রাখা হয়েছে।

‘ক্যাটালিস্ট’-এর সিইও হিসাবে নিযুক্ত হওয়ার আগে বাদল মল্লিক ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন বাজার ‘স্ন্যাপডিল’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বাদলবাবু মন্তব্য করেছেন, “সমন্বয়ঘটিত যে সব সমস্যা ব্যবসায়ী এবং নিম্ন আয়ের ক্রেতাদের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে, সেই সব সমস্যার সমাধান করাই ক্যাটালিস্টের লক্ষ্য। একটা সুস্থায়ী ও প্রতিরূপ মডেল তৈরি করার চেষ্টা করছি আমরা। ডিজিটাল লেনদেনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সরকারের তরফে সুসংহত প্রচেষ্টা চালানো হলেও, যখনই ব্যবসায়ীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও সমন্বয়ের বিষয়গুলি সামনে আসছে, তখনই বোঝা যাচ্ছে, অনেক ফারাক আছে।  আমরা এই সব প্রশ্নের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে চাই।”

দশ মাস আগে

সমন্বয়ঘটিত বহুমুখী সমস্যা এবং নগদ-বাস্তুতন্ত্র সংক্রান্ত যে বিষয়ের উল্লেখ বাদলবাবু করেছেন, তা আগেই বিশ্লেষণ করা হয়েছিল ইউএসএআইডি-র একটি রিপোর্টে। ভারতের অর্থ মন্ত্রকের সঙ্গে নগদ-বিরোধী সমঝোতার প্রেক্ষিতে ওই রিপোর্ট পেশ করা হয় ২০১৬-এর জানুয়ারিতে। ওই রিপোর্টটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিয়ন্ড ক্যাশ’।  ইউএসএআইডি-র ওয়েবসাইটে প্রেস বিবৃতির তালিকায় যথারীতি তারও কোনো উল্লেখ নেই।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, “ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারাও নগদ-বাস্তুতন্ত্রের ফাঁদে পড়ে গিয়েছে।” এবং এই মনোবৃত্তিই তাঁদের ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহী হতে বাধা দিচ্ছে। যে হেতু খুব অল্প সংখ্যক ব্যবসায়ী ডিজিটাল লেনদেন করেন তাই খুব কম ক্রেতা এতে উৎসাহী, আবার যে হেতু খুব কম ক্রেতা ডিজিটাল লেনদেন করেন, তাই খুব কম ব্যবসায়ী এতে উৎসাহ দেখান।  তার ওপর নগদহীন লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক এবং লেনদেন পরিষেবা প্রদানকারী অন্যান্য সংস্থা একটা ফি নিয়ে থাকে। দু’পক্ষই ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপারে পারস্পরিক আগ্রহ দেখাবে, এই রকম উচ্চতায় কার্ডের ব্যবহারকে নিয়ে যেতে হলে বাইরে থেকে বিপুল শক্তি প্রয়োগ করা দরকার।

নভেম্বরে বোঝা গেল, এই শক্তি সৃষ্টি করার জন্য ঘোষিত ‘পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি’র মধ্যে রয়েছে নগর-বাস্তুতন্ত্রটি কিছু দিনের জন্য ধ্বংস করে দেওয়া এবং ব্যাঙ্ক থেকে উপভোক্তাদের নগদ তোলার ব্যাপারটিকে সংকুচিত করে নগদের বাজারটিকে একটু একটু করে শুকিয়ে ফেলা। পুরো ফল পেতে হলে আঘাতটি যে হঠাৎ করে করা দরকার তা বুঝে ‘বিয়ন্ড ক্যাশ’ সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হয়নি এবং ‘ক্যাটালিস্ট’-এর প্রবক্তারা তাঁদের পরিকল্পনা খোলাখুলি বলতে পারেননি। নিজেদের লুকিয়ে রাখতে ধূর্ত চাতুরির আশ্রয় নেন তাঁরা। বিশেষজ্ঞদের মতামত শোনা-সহ নানা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চালানোর কথা তাঁরা প্রকাশ্যে বলেন। তাঁরা আগাগোড়া সীমিত ক্ষেত্রে পরীক্ষার কথা বলে এসেছেন। তাঁরা ওপরে ওপরে দেখিয়ে এসেছেন এটাই তাঁদের পরিকল্পনা।               

নোট বাতিলের ঘোষণার সপ্তাহ চারেক আগেই বাদল মল্লিক বলেন, “আমাদের লক্ষ্য যে কোনো একটি শহরকে বেছে নিয়ে ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সেখানকার ডিজিটাল লেনদেনের হারকে ১০ গুন করা”। কোনও একটা নির্দিষ্ট শহরে এই প্রস্তুতি সীমিত না রেখে, কোন শহর বা অঞ্চল ক্ষেত্র-পরীক্ষার সব চেয়ে উপযুক্ত জায়গা তা নির্ধারণ করতে ‘বিয়ন্ড ক্যাশ’ এবং ‘ক্যাটালিস্ট’ একটা বড়ো অঞ্চল জুড়ে পরীক্ষার চালানোর কথা বলে। কিন্তু নভেম্বরেই এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, নগদের উপর নির্ভরতা কমাতে বিশ্বব্যাপী অভিযান শুরু করার জন্য গোটা ভারতকেই গিনিপিগ বানানো হচ্ছে। গোটা প্রেক্ষাপটটি মাথায় রেখে ভারতে ইউএসএআইডি-র মিশন ডিরেক্টর জোনাথন অ্যাডেলটনের একটি বিবৃতি যদি পড়া যায়, তা হলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তলে তলে তিনি সে ঘোষণাই করেছিলেন যখন নোট বাতিলের চার সপ্তাহ আগে তিনি বলেছিলেন, “অর্থনীতিকে ডিজিটাইজ করা এবং যে জনসংখ্যার কাছে পৌঁছোনোও অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার সেই তাঁদের কাছেও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত একেবারে সামনের সারিতে রয়েছে। এমনকি প্রতিদিনের কেনাকাটাকেও নগদহীন করার যে চ্যালেঞ্জ তা বাস্তবায়িত করতে সমর্থন জুগিয়ে যাবে ‘ক্যাটালিস্ট।”      

নগদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যারা তুখোড় তাদের ভুমিকা

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নগদ অর্থনীতির বিরুদ্ধে এই যে যুদ্ধ ঘোষণা হল, এর পেছনে ঠিক কোন কোন প্রতিষ্ঠানের হাত রয়েছে? ‘বিয়ন্ড ক্যাশ’ রিপোর্ট পেশ করার সময় ইউএসএআইডি ঘোষণা করেছিল, “প্রায় ৩৫টি ভারতীয়, মার্কিন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা এই উদ্যোগে অর্থ মন্ত্রক এবং ইউএসএআইডি-র সঙ্গে শামিল হয়েছে।” ক্যাটালিস্ট ডট ওআরজি ওয়েবসাইটে লগ ইন করলে যে কেউ বুঝবে, এদের বেশির ভাগই তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা যারা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে দু’ পয়সা করতে চায়। জার্মানির ডয়েশে বুন্দেশবাঙ্কের শীর্ষ স্থানীয় এক আধিকারিকের ভাষায় বলা যায়, “এদের মধ্যে অনেকেই নগদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত স্বার্থসংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির ঝানু সৈনিক।” এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স’, ‘ওমিডিয়ার নেটওয়ার্ক (ই বে)’, ‘দ্য গেটস ফাউন্ডেশন (মাইক্রোসফট্‌)’, ‘দ্য ডেল  ফাউন্ডেশন মাস্টারকার্ড’ ভিসা, মেটলাইফ ফাউন্ডেশন ইত্যাদি। (আগামী পর্বে শেষ)

সৌজন্যে : গ্লোবাল রিসার্চ

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here