indian judiciary
দেবারুণ রায়

আদালতই শেষ কথা বলছে। সংবিধানের প্রাতঃস্মরণীয় প্রণেতাদের পথনির্দেশ সেই রকমই ছিল। তাই জাতীয় জীবনে গণতন্ত্র যখনই পদদলিত হয়েছে, সরকার ভ্রষ্ট হয়েছে শপথের পথ থেকে, সংবিধানের নামে শপথ নিয়েও সেই আপ্তবাক্যের মর্যাদা রাখেনি, তখনই কড়া হাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে আদালত। প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ স্তম্ভ নিয়ে মানুষের আস্থা টলে গেলেও তৃতীয় স্তম্ভ নিয়ে মানুষের অহংকার জোরালো হয়েছে বারবার। আগামী দিনের জনতার রায়কে ভাষা দিয়েছে আদালতের রায়। বন্ধ্যা শাসনের নখদাঁত দেখে, সর্ব অর্থেই সাজানো পুতুলদের দিয়ে গণতন্ত্রকে বনসাই করে রাখা হয়েছে দেখে, হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টের চৌকাঠে মাথা রেখেছে মানুষ। গণতান্ত্রিক শাসনের মৌলিক দায়বদ্ধতাকে স্মরণ করাতে, অবিচারের মুখোশ খুলে তার মূলোচ্ছেদ করতে বিচারের বাণী শুনিয়েছে বিচার বিভাগ, লোকশাহির শেষ ভরসাস্থল।

আরও পড়ুন: কোথায় বাংলার মা-মাটি-মানুষ?

এ বার পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে বাংলার রঙ্গালয়ে যে ধরনের অলীক কুনাট্য মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে, সেই পালার দ্বিতীয় অঙ্কে আদালতের একের পর এক নির্দেশ স্বৈরতন্ত্রের চর পড়া নিস্তরঙ্গ গঙ্গায় জোয়ারের স্রোত এনেছে। সর্বোচ্চ আদালত এ প্রসঙ্গে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে না চেয়েও সন্ত্রাসের মুখে আপামর জনতার সুবিচার পাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে। ভোটপ্রক্রিয়ার মধ্যে এ ধরনের অনিয়মের নিষ্পত্তি করার ভার দেওয়া হয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে। কিন্তু অন্যায় অবিচার হতে দেখলেও আদালত চোখ বুঁজে থাকবে, সে কথা বলেনি। মানুষের দাবিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যে কারণে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাজ্যের শাসকদলের নিচুতলা থেকে উল্লাস প্রকট করে সবুজ আবির ছড়িয়ে শক্তিহীন বিরোধীদের বুকে কাঁপন ধরানো হলেও, ওপরতলা থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। বিষয়টি বাঁধা থেকেছে মূলত কৌঁসুলি স্তরে।

সুপ্রিম কোর্টের মূল সুরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে। ঘটনা পরম্পরার গভীরে না ঢুকে যদি ‘আদালতের হস্তক্ষেপ কেন’ বলে প্রশ্ন তোলা হয়, তা মেনে নেওয়ার কোনো জায়গা যে নেই, তা-ও স্পষ্ট করে দেওয়া হয় হাইকোর্টের অবস্থানে।

কিন্তু যাঁর বোঝার তিনি বুঝেছেন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মর্মবাণী। এবং সেইমতোই ঘটনা পরম্পরা চলছে। সুপ্রিম কোর্ট যে দায়িত্ব অস্বীকার করেনি, তার প্রমাণ, ৯ এপ্রিলের নির্দেশে বলা হয়েছিল, হস্তক্ষেপ যেমন তাঁরা করতে চান না, তেমনই কমিশনের উচিত অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু ঘটল কী? সেই দিনই কমিশন মনোনয়ন জমা নেওয়ার দিন বাড়িয়ে ঠিক পর দিনই চাপের মুখে তা তুলে নিল। ওই ভাবে নির্দেশ প্রত্যাহার করা না হলে আদালতের হস্তক্ষেপের যে প্রয়োজন হত না, তা হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি জানিয়ে দেন। বুঝিয়ে দেন, সুপ্রিম কোর্টের মূল সুরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে। ঘটনা পরম্পরার গভীরে না ঢুকে যদি ‘আদালতের হস্তক্ষেপ কেন’ বলে প্রশ্ন তোলা হয়, তা মেনে নেওয়ার কোনো জায়গা যে নেই, তা-ও স্পষ্ট করে দেওয়া হয় হাইকোর্টের অবস্থানে।

আপাতত হলেও বিচারের বাণী ধ্বনিত হওয়ায় বিরোধী রাজনৈতিক মতামত শ্বাসপ্রশ্বাসের কিছুটা অক্সিজেন পেয়েছে। এইটুকু অক্সিজেনও কম নয়। এই প্রাণবায়ুই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিমণ্ডলকে সুজলা-সুফলা-শ্যামলা করে তুলবে। এমন নজির আধুনিক ভারতের ইতিহাসেই খুঁজে পাওয়া যাবে একাধিক ক্ষেত্রে। পঁচাত্তরের জরুরি অবস্থা আদালতে যাওয়ার অধিকারও কার্যত কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু এলাহাবাদ হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে যথাসময়ে নির্বাচন খারিজ হয়েছিল দেশের সব চেয়ে শক্তিশালী নেত্রীর। তার পর কী হয়েছিল, বিচার বিভাগের ওপর দুঃশাসনের খড়গ কী ভাবে নেমে এসেছিল, তা কারও অজানা নয়। এবং স্বৈরশাসনের বীজ ছড়াতে গিয়ে ইন্দিরা কী ভাবে কংগ্রেসের মসৃণ পিচ খুঁড়ে দিয়েছিলেন, তা-ও। এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি মনোনয়ন করার ক্ষেত্রে কেন ও কী ভাবে বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের বদলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল বিচারপতি অজিতনাথ রায়কে, সেটাও।

যে কোনো স্বৈরশাসক ভারতের যে কোনো অংশে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে দাপট দেখানোর আগে এক বার সত্তরের স্মৃতিচারণ করুন। যদি ভুলে গিয়ে থাকেন তা হলে একটু সময় নষ্ট করে মাত্র চল্লিশ বছর পিছনের ইতিহাসের পাতা ওলটান। দেখতে পাবেন, ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলি, বিশেষ করে বাংলা, স্বাধীনতার কুড়ি বছর হতে না হতেই পরিবর্তনের আওয়াজ তুলেছে। আর সদ্য যৌবনেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও স্বৈরশাসনের শিকড় উপড়ে ফেলেছে। সেই স্বাধীনতা এখন সত্তর বছরের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। তার রুপোলি চুলে কোনো কৃত্রিম রং লাগেনি। মরশুমি পাখিদের কলকাকলি শুনে শুনেও কোকিলের ডাক চিনতে আর ভুল হয় না। মাটিতে পা রেখে আকাশে উন্মুখ হলেই বুঝে নিতে পারেন কোনটা আসল আর কোনটা নকল বসত।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here