প্রবীণ চিত্রগ্রাহকের স্মৃতিতে উত্তমকুমারের শেষ শ্যুটিং

0
1482
পায়েল সামন্ত

দৃশ্য এক

আশির দশকের শ্যুটিংয়ের হুলস্থুল! কী নেই সেখানে— ক্যামেরা, ট্রলি, মেক-আপ ম্যান, লাইট কত কিছু। আর রয়েছে বিস্তর হাঁকডাক — এটা আন, সেটা আন, এটা কোথায়, সেটা কোথায়, অমুকটা খুঁজে পাওয়া যায়নি, তমুকটা নেই। তবে পরিচালক লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন বললেই মুখে কুলুপ। এ ক্ষেত্রেও তাই! শ্যুটিং শুরু হতেই সব্বার চোখ সে দিকে। ক্যামেরার চোখও তখন মহানায়ক উত্তমকুমারকে প্রতিটি ফ্রেমে মাপছে— দাড়ি কামাতে কামাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার একটি অসাধারণ দৃশ্যে। ছবির নাম ‘ওগো বধূ সুন্দরী’।

দৃশ্য দুই

টাইম মেশিনে চেপে ২০১৭-য় ফিরে আসুন। ৩৭ বছর পার করে নেমে পড়ুন নিউ আলিপুরের জ্যোতিষ রায় রোডে। একটা পুরোনো বাড়ির দোতলার ঘরে দেখা পাবেন এক অশীতিপর বৃদ্ধের — সেই আশির দশকের টালিগঞ্জ পাড়ার খোকনদা ওরফে পঙ্কজ দাস। বয়স আশির ঘরে হলেও তিনি দিব্যি মনে করতে পারেন ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-র সেটের সেদিনকার দৃশ্য।

ক্যামেরার পিছনে তিনি কাটিয়েছেন কয়েক দশক। উত্তমকুমারকে ক্যামেরার পিছনে রেখে প্রায় খান পঁচিশেক ছবিতে তিনি কাজ করেছেন। বাড়িতে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র সিডি নেই। আজও টিভিতে দেখালেই তিনি বসে পড়েন। প্রত্যেক বারেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দিনটা। জুলাই মাস এলে স্মৃতি চাগাড় দেয়। জ্যোতিষ রায় রোডের আলো-আঁধারি ঘরে শুরু হয়ে যায় শ্যুটিং। লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন…!

কী ঘটেছিল সে দিন? ১৯৮০ সালের জুলাইয়ের সেই সকালে। বর্ষীয়ান চিত্রগ্রাহক বলেন, মহানায়ক তো ভীষণই খুঁতখুঁতে ছিলেন। শট পছন্দ না হলে বারবার দৃশ্যগ্রহণ করাতে তিনি জুড়িহীন। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-তে এর জন্যই যত বিপত্তি। যত বারই পরিচালক দৃশ্যটা টেক নিচ্ছেন, মহানায়ক বারবার ডায়লগ বলে ঘাড় নাড়ছেন। কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না।

পঙ্কজ দাস।

সে সময় পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের চিত্রগ্রাহক ছিলেন বিজয় ঘোষ। পঙ্কজ দাস ছিলেন বিজয়বাবুর সহকারী। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে স্মৃতিগুলি যেন কুড়িয়ে নেন। ফের বলতে থাকেন, “এ ভাবে রিটেক হচ্ছিল বার বার। পরিচালক সলিল দত্তের শট পছন্দ হলেও উত্তমকুমারের পছন্দ হয় না। আমরাও ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছি। কিন্তু মহানায়কও নাছোড়বান্দা, নিখুঁত না হলে হাল ছাড়বেন না। আজও এটা ভাবলে অবাক লাগে, যিনি এত খ্যাতি আর সম্মান পেয়েছেন, তিনি অভিনয় জীবনের সায়াহ্নে এসেও কতটা পারফেকশনিস্ট। এর পরই অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা ঘটে যায়।” সেই কথা মনে করার চেষ্টা করতে মেঘলা হয় প্রবীণের মুখ। জানলার বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, মনেও। অশীতিপর বলেন, “রিটেক করতে করতে হঠাৎ মহানায়ক হাঁফাতে শুরু করলেন। জোরে জোরে শ্বাস পড়ছিল তাঁর। কোনও রকমে বসে পড়লেন। আমরা হতচকিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সবাই তাঁকে ঘিরে ধরল। হইচই শুরু হয়ে গেল। হাঁফাতে হাঁফাতে জল চাইলেন মহানায়ক। তার আগেই কে যেন একটা গেলাস ভর্তি জল নিয়ে এসেছিল। কোনো একটা ওষুধ সঙ্গেই থাকত। আর এক জন একমুঠো ওষুধ উত্তমকুমারের হাতে দিল। কোনওক্রমে জলটা মুখে ধরে রেখে ওই কটা ওষুধ খেয়ে নিলেন।” তার পর কী হল? পঙ্কজবাবু বলেন, “ওষুধ খেয়ে দেখলাম ধাতস্থ হলেন। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হল। তবু তাঁকে বেশ মলিন লাগছিল, যেন ভারী একটা ধকল গিয়েছে। কিন্তু, মুখের হাসি অমলিন। সবাইকে অভয় দিলেন, তাঁর কিচ্ছু হয়নি। ভয় পাওয়ার কারণ নেই। সে দিনের মতো শ্যুটিং মুলতুবি হয়ে গেল।”

দেখুন: উত্তমের কিছু বিরল মুহূর্ত : অশোক বসুর অ্যালবাম থেকে

তখন মহানায়ক ৫৪। শরীরে অনেক অবাঞ্ছিত মেদ। তাই তিনি অভয় দিলেও ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র কলাকুশলীদের মনে আশঙ্কার তিরতিরে স্রোতটা বইছিল। প্রবীণের ভাষায়, “আমরা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু, মহানায়ক অন্য ধাতুতে গড়া। সে দিন রাতেই আবার একটি পার্টিতে গিয়েছিলেন। কারও নিষেধ শোনেননি। সেখানে একটু বেশি খাওয়াদাওয়াও করে ফেলেছিলেন। তার পর ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেলভিউয়ে ভর্তি করা হয়। আর ২৪ জুলাই…!”
‘বহ্নিশিখা’ ছবির শুটিঙে সেটে উত্তমের সঙ্গে পঙ্কজ দাস।

এই শোকের সরণি থেকে পঙ্কজ দাসকে সুখের স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনার দায় প্রশ্নকর্তারই বর্তায়। তাই সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে উত্তমকুমারের সখ্যের কথা পাড়তেই হাসির ঝিলিক বৃদ্ধের ঠোঁটে, জানলার বাইরেও যেন মেঘ কেটেছে! বলেন, “উত্তমদার জন্য সুপ্রিয়াদি কত কিছু রান্না করতেন। আমাকেও কত বার খাইয়েছেন। উত্তমদার পছন্দ ছিল পোস্ত, বিউলির ডাল। এক বার চিংড়ির বড়াও আমাকে ভেজে খাইয়েছিলেন। উত্তমদার সঙ্গে বসে খেয়েছি।”

পঙ্কজবাবুর মনে পড়ে ‘অগ্নীশ্বর’-এর শ্যুটিংয়ে নকশালপন্থীদের হুমকির কথা। সময়টা গত শতকের ষাটের দশক। বলেন, “বিহারের তোপচাঁচির হোটেলে দিনের শ্যুটিং শেষে ফিরেছি। হঠাৎ একটা ফোন। গম্ভীর গলায় কেউ মহানায়ককে চাইল। তখন আমি সেখানে দাঁড়িয়ে। ফোন কানে নিয়ে উত্তমদার ভুরু কুঁচকে গেল। বুঝলাম, বেগতিক কোনও ব্যাপার। এক লক্ষ টাকা চেয়েছিল নকশালপন্থীরা। অরবিন্দদা (পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়) পুলিশ সুপারকে ফোন করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন।”

২৪ জুলাই আবার এসেছে। মেঘে-মেঘে ফিরেছে এমন কত হর্ষ-বিষাদের স্মৃতি। এই দিনটায় টিভির সামনে বসে থাকেন পঙ্কজ দাস। চ্যানেল ঘুরিয়ে বিভিন্ন সিনেমার সিকোয়েন্স পরখ করেন। তখন ক্যামেরার পিছনে তিনি, আর সামনে শুধু মহানায়ক!

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here