পাপিয়া মিত্র

মস্ত লাল মেঝের দালান। মস্ত রান্নাঘরে বড়ো বড়ো মাটির উনুনে গনগন করছে আগুন। পাতা শিলে চলছে বাটনা। জালা-কুঁজো মায় চৌবাচ্চাও তোলা জলে ডুবুডুবু। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পুব থেকে পশ্চিম, সব জানলা-দরজা হাট করে খোলা। জষ্টির গরম হাওয়া হুহু করে ধাইছে। শুধু লেবুপাতার গন্ধে বাতাস খানিক থমকে দাঁড়ায়।

সব ঠিকঠাক ছিল। বাড়িতে তেরো পাব্বণের এক পাব্বণ। জ্যৈষ্ঠ মাসে জামাইষষ্ঠী, শ্রাবণ মাসে লোটনষষ্ঠী, ভাদ্র মাসে চাপড়াষষ্ঠী, আশ্বিন মাসে দুর্গাষষ্ঠী, অগ্রহায়ণ মাসে মূলাষষ্ঠী, পৌষ মাসে পাটাইষষ্ঠী, মাঘ মাসে শীতলষষ্ঠী, চৈত্র মাসে অশোকষষ্ঠী। এ ছাড়া বারব্রত তো লেগেই আছে সারা বছর। বারো মাসে তেরোষষ্ঠী সাট সাট সাট। যতই জামাইয়ের জন্য ষষ্ঠী পালন করো না কেন, লুকিয়ে আছে সেই মেয়ের জন্য শুভকামনা। মেয়ে না থাকলে জামাই কোথায়?

সকাল সকাল রান্না শুরু হয়ে গেছে। নবৌদি, রাঙাবৌদি, ফুলবৌদি, মেজোপিসিমা, ছোটমামিমা, বেনেবৌ, গয়লাবৌদের গয়নার রিনরিনে, ঝনঝন আওয়াজ তোলা হাতে ভাঁড়ার ঘরে সাজানো হচ্ছে বাদামসমেত লাল নটেশাক ভাজা, বোঁটাসমেত পোস্ত ছড়ানো বেগুন ভাজা, আদা-রাঁধুনি-সহ দুধ দিয়ে শুক্তো, নারকেল-ডুমো দিয়ে মুগের ডাল, পুকুরের মাছের কালিয়া, পেটিভাজা, পুঁটিমাছ ভাজা আর চুনোমাছের টক। টগবগ করে ফোটা খাসির মাংসের গন্ধে প্রায় ঠাকুরতলা পর্যন্ত ম ম করছে ঠিক তখনই সকলে বিস্ময়ে হতবাক।

কী সেই বিস্ময়? ধরা যাক শ্বশুরমশাইয়ের নাম ‘কুবের’, তিনি হাড়কিপ্টে, সুদখোরও বটে। শাশুড়ি মা ‘ইন্দ্রাণী’, যিনি সারাদিন স্বামীর মুখঝামটা খেয়ে চলেছেন। মেয়ে ‘সরোজ’, জামাইবাবাজীবন ‘শ্রীধর’। তিনি শান্ত-লাজুক। এমনই এক জামাইকে জামাইষষ্ঠীর দিন শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে! আর এই মহান কম্মোটি করছেন কিপ্টে শ্বশুরমশাই। এ হেন ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল ‘জামাইষষ্ঠী’ চলচ্চিত্রে। এবং এটি ছিল প্রথম বাংলা সবাক ছবি। ১৯৩১-এর ১১ এপ্রিল এই ছবির মুক্তি ঘটে। নির্মাতা, পরিচালনা, চিত্রনাট্য ও অভিনয়ে অমর চৌধুরী (অমর রায়চৌধুরী)। যে পার্বণটি শুধু খাওয়াদাওয়ার ব্যাপার, নেহাত সামাজিক লোকাচার- তা নিয়ে কত না কল্পকাহিনি, মজাদার, রসালো গল্প নিয়ে আজও নানা ছবি, নাটক হয়ে চলেছে। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে আজ থেকে ৮৬ বছর আগে অমর চৌধুরীর মতো একজন দূরদর্শীসম্পন্ন মানুষ জামাইষষ্ঠী নিয়ে এই রকম কোনও ছবি তৈরি করেছিলেন, শুধু তা-ই নয়, সেটি ছিল প্রথম ‘মুখর’ ছবি। এবং এই মহান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় অমর চৌধুরীমশাই।

ছবিতে যে ৯টি গান ছিল তার প্রত্যেকটির গীতিকার অমর চৌধুরীর। সুর ও কন্ঠ দিয়েছিলেন ক্ষীরোদগোপাল মুখোপাধ্যায়। সেই সময় ছবি চলাকালীন উইংসের পাশে বসে গান গাইতেন ক্ষীরোদবাবু। যাই হোক, আবার ফিরে তাকাই বাড়ির পানে।

জামাইষষ্ঠীর দিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও জামাইকে নেমতন্ন করেন শ্বশুর কুবের। বেচারা জামাই শ্বশুরবাড়িতে পা দিতেই শরীর খারাপের দোহাই দিয়ে তাকে প্রায় বের করে দেন। এ দিকে বাড়ির দুই চাকর কুবেরকে জাঁকিয়ে হেনস্থা করে ঘরের মধ্যে এক বারবনিতাকে ঢুকিয়ে। সব মিলিয়ে জমজমাট ছবি ‘জামাইষষ্ঠী’ যেন জামাইয়ের পাতের শেষ অঙ্ক উত্তর কলকাতার মালাইদই।

তখনকার বোদরা থানা মানে এখনকার দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় এলাকার পাইকহাটি গ্রামে যদুনাথ রায়চৌধুরী ও মতিলাল রায়চৌধুরীর জেষ্ঠ সন্তান অমর। জন্ম ১৮৯৭-এর ২৭ জুন। ছোটো থেকে কথায় কথায় ছড়া কাটতে ভালোবাসতেন। ১৯১৮-তে চলে আসেন কলকাতার বৌবাজার অঞ্চলে। চাকরি কলকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনে। চাকরির পাশাপাশি চালিয়ে গিয়েছেন লেখালেখিও। সেই সূত্র ধরে প্রথম নির্বাক পূর্ণাঙ্গ ছবি ‘বিল্বমঙ্গল’-এর পরিচালক জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ। এবং তাঁর ইচ্ছেতে ‘মাতৃস্নেহ’ গল্প ও চিত্রনাট্য লেখেন অমর চৌধুরী। ১৯২৩-এ ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেডের প্রযোজনায় এবং জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নির্বাক ছবিটি মুক্তি পায়। এর পরে ‘কমলে কামিনী’(১৯২৪) ‘ধর্মপত্নী’(১৯২৬) ‘ভারত রমণী’ (১৯৩০) ‘কেরানির মাসকাবার’ (১৯৩১)-ছবিগুলির গল্প ও চিত্রনাট্য লেখেন এবং অভিনয় করেন অমর চৌধুরী।

১৯৩১-এ যুগান্তকারী ঘটনা ঘটল রুপোলি পর্দায়। এল সবাক চলচ্চিত্রের যুগ অমর চৌধুরীর হাত ধরে। ‘জামাইষষ্ঠী’ ক্রাউন হলে মুক্তি পেল। একে একে গল্প-পরিচালনা ও অভিনয়ে মুক্তি পেতে থাকল ‘তৃতীয় পক্ষ’ (৬ ডিসেম্বর, ১৯৩১) ‘চিরকুমারী’ (১ জুলাই, ১৯৩২) ‘কলঙ্ক ভঞ্জন’ (ডিসেম্বর, ১৯৩৩) ‘সত্যপথে’ (২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৫)। জামাই বাবাজীবনের হাত ধরে সবাক চলচ্চিত্রের পথ এগিয়ে চলেছে আজও।

ঋণ: সাবর্ণ সংগ্রহশালা ও পৌত্র অঞ্জন রায়চৌধুরী।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here