ভাঙড়ে ‘উসকানিদাতা মাওবাদীরা’ টাকা পাচ্ছে ‘আন্দোলনে’ বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে?

0
729
নীলাঞ্জন দত্ত

কথাটা শেষ পর্যন্ত আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকেই শুনতে হল। ভাঙড়ে নতুন রাস্তার শিলান্যাস করতে গিয়ে তিনি বললেন, সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের পাওয়ার গ্রিড প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছে যে ‘মাওবাদীরা’, তারা ভেনেজুয়েলা থেকে টাকা পাচ্ছে। এই দেশটার নাম এখানে কত জন শুনেছেন জানি না। বরং, আমরা আগে শুনতে অভ্যস্ত ছিলাম, এখানকার মাওবাদীরা – তারও আগে সিপিএমরা কিংবা নকশালরা – টাকা পায় চিনের কাছ থেকে। তার মধ্যে তবুও একটা যুক্তি ছিল – চিনই তো মাও সে তুং-এর দেশ।

কিন্তু ভেনেজুয়েলা! হ্যাঁ, ভারতের এবং বাংলার বামপন্থীদের মুখে দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিশভাষী এই দেশটার নাম গত দুই দশকে কয়েক বার শোনা গেছে বটে। তার কারণ, সেখানে ১৯৯৮-৯৯ সালে একটা ‘বিপ্লব’ শুরু হয়েছিল, যদিও তাকে মাওবাদী বিপ্লব বলা হয়নি। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে বিপ্লবী নেতার কোনো অভাব নেই। সেই রকমই এক জন প্রবাদপ্রতিম নেতা, উনিশ শতকের গোড়ার দিকের সিমোন বোলিভারের নামে তার নামকরণ হয়েছিল ‘বোলিভারিয়ান বিপ্লব’।

এই বিপ্লবের নেতা ছিলেন উগো চাভেস। এর ‘একবিংশ শতকের সমাজতন্ত্র’র তত্ত্ব সেই মন্দার বাজারে সারা পৃথিবীতেই খানিকটা সাড়া ফেলে দিয়েছিল। চাভেসের তুমুল জনপ্রিয়তার ভিত্তি ছিল মূলত তিনটে – বিশাল বিশাল জোত বা ‘লাতিফুন্দিয়া’র মালিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভূমিসংস্কার করা, শহরের খেটে-খাওয়া মানুষ আর নিম্নমধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রার মান বাড়ানো আর তাঁদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলা আর প্রকাণ্ড তেল কোম্পানিগুলোকে সরকারের দখলে নিয়ে আসা। এই সব স্বাভাবিক ভাবেই সেখানকার বড়লোকদেরই কেবল চটায়নি, চটিয়েছিল আমেরিকাকেও। বিশেষ করে তেলের ওপর তার খবরদারি কেউ মানবে না, এটা তো সে কখনোই সহ্য করতে পারে না।। তখন থেকেই মার্কিন মদতে ভেনেজুয়েলার দক্ষিণপন্থী বিরোধীপক্ষ নানা ভাবে ‘আন্দোলন’ করতে শুরু করে। আর তাদের সমর্থনে উঠেপড়ে প্রচারে নামে বড়ো বড়ো কাগজ আর টিভির মালিকরা।

এক দিকে ‘আন্দোলন’ আর এক দিকে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেও চাভেসকে পাকাপাকি ভাবে সরানো যায়নি। কিন্তু একনায়ক হওয়ার একটা মুশকিল আছে। তিনি চলে গেলে কী হবে, সেটা কেউ ভাবেনি। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও তাই হল। ২০০৫-এ কলকাতায় চাভেসকে নাগরিক সংবর্ধনা দিল যারা, ২০১৩ সালের মার্চ মাসে তিনি মারা যাওয়ার পর থেকে সেই বামপন্থীরা ভেনেজুয়েলায় যেন আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। আমাদের মিডিয়াও এ সব খবর বড়ো একটা দেয় না। কিন্তু ভেনেজুয়েলা আক্ষরিক অর্থেই জ্বলছে। আর চাভেসের উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো টালমাটাল অর্থনীতি আর প্রবল মদতপুষ্ট প্রতিপক্ষকে সামলে দেশ চালাতে যথেষ্ট বেগ পাচ্ছেন।

এ বছর এপ্রিল মাস থেকে বিরোধীরা যে অবস্থা তৈরি করেছে, তা ভয়াবহ। রাস্তায় রাস্তায় রোজ সংঘর্ষ চলছে। ১৩ জুন দুপুরে এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে, তখন তারা রাজধানী কারাকাসে সুপ্রিম কোর্ট বিল্ডিং-এ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ওপর এত রাগ হল কেন? কারণ, এই সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছে, ৩০ জুলাই থেকে মাদুরো জাতীয় সংবিধানসভার যে অধিবেশন ডেকেছেন, তা বৈধ। আগের দিন তারা আবাসন মন্ত্রকের একটি বাড়িতে হামলা চালালে সেখান থেকে ৯০০ কর্মী এবং ৪৫ জন শিশুকে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ৮১ জন নিহত ও ১২০০ জন আহত হয়েছেন।

অন্য দিকে আর একটা দৃশ্যের অভিনয় চলছে। আমেরিকা ‘সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের’ তালিকায় ভেনেজুয়েলাকে জুড়তে চাইছে। ‘গোপন গোয়েন্দা রিপোর্ট’ উদ্ধৃত করে সে দেশের তাবড় তাবড় মিডিয়া ক্রমাগত বলে চলেছে, ভেনেজুয়েলা ড্রাগ পাচারে সাহায্য করে, সন্ত্রাসবাদীদের অবাধে ঢুকতে দেয়, ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, ইসলামিক গোষ্ঠীদের মদত দেয়, ইত্যাদি। মাত্র কয়েক দিন আগে, ৬ জুন, রাষ্ট্রপুঞ্জে মার্কিন স্থায়ী প্রতিনিধি নিম্রতা ‘নিক্কি’ হ্যালি মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় ক্ষোভ জানান, “এটা মেনে নেওয়া কঠিন যে এই কাউন্সিল কখনও ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে একটাও প্রস্তাব নেওয়ার কথা ভাবেনি, অথচ মার্চ মাসে একমাত্র ইজরায়েলের বিরুদ্ধেই পাঁচখানা পক্ষপাতপূর্ণ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।” এ রকম ভাবে চললে যে আমেরিকা মানবাধিকার কাউন্সিল ছেড়ে বেরিয়েও আসতে পারে, এমন প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

ভেনেজুয়েলাকে যখন বিশ্বরাজনীতির নতুন ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে, ঠিক তখনই খোদ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ভেনেজুয়েলার মাওবাদী যোগের কথা বললেন। নিঃসন্দেহে গুরুতর অভিযোগ।

Foreign-Minister-and-Oil-Minister-of-Venezuela-visit-India
করমর্দন করছেন ভেনেজুয়েলার তেল মন্ত্রী ও ভারতের বিদেশমন্ত্রী

তবে জট একটা রয়েই গেল। ২০১৬ সাল থেকে ভারত-ভেনেজুয়েলা অর্থনৈতিক সম্পর্ক তুঙ্গে উঠেছে। এতে দুই দেশেরই স্বার্থ রয়েছে। ভারত এখন আমেরিকা আর চিনের পরেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারী দেশ। ভেনেজুয়েলা তার সমস্যা অনেকটাই মেটাতে পারে। রিলায়েন্স ইতিমধ্যেই তার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-র সঙ্গে ১৫ বছর ধরে দিনে চার লক্ষ পিপে তেল আমদানি করার চুক্তি করেছে। আবার ভারতের ওএনজিসি, ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন আর অয়েল ইন্ডিয়া ভেনেজুয়েলার তেলের খনিগুলিতে মোটা টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেছে। এ হেন দেশকে হঠাৎ এ সবের মধ্যে টানাটানি করলে কোনো সমস্যা হবে না তো?

আরও পড়ুন: রামনবমী, হনুমানজয়ন্তীর পর এ বার পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের টার্গেট রথযাত্রা

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here