mukul roy
মুকুল রায়, দিলীপ ঘোষ। ছবি সৌজন্যে হিন্দুস্তান টাইমস।
debarun roy
দেবারুণ রায়

তৃণমূল তখন সবে মুকুলিত হচ্ছে। ২০০৯-এর লোকসভা ভোট। গাছে গাছে মুকুল এলে যা হয়। বেশ একটা আবহ তৈরি হয়ে যায় চতুর্দিকে। নিঃশ্বাসও হয়ে ওঠে বার্তাবহ। রাজ‍্যে তখনও তো দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী বামফ্রন্ট সরকার, ৩৫ আর ২৩৫-এর রেজাল্ট চোখের সামনে তখনও জ্বলজ্বল করছে। তবু কোথায় কার চোখের ভুলে যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে গোকুলে বেড়ে ওঠার গল্প। যাঁদের বোঝার কথা তাঁরা বুঝেছেন। কিন্তু গোছগাছ করতে গিয়ে আর অবুঝদের বোঝানোর দায় নিতে তাঁরা নারাজ। তা ছাড়া সব্বাই বুঝে গেলেও তো বিপদ। তাই নিজেদের আখের গুছিয়ে নিত্য সাধু সাবধানি হয়ে পা ফেলা। অন্তত বছর চারেক এই ব‍্যালেন্সের খেলাটা খেলে গেছেন পুলিশপ্রশাসনের গণ‍্যমান‍্য বরেণ্যরা। বামফ্রন্ট বললে গৌরবে বহুবচন হয়, আসলে মূল শাসকদল সিপিএমের ঘরে বাইরেও তখন এই মরশুমি পাখিরা অনেক কাল সোনার খাঁচা ছেড়ে খোলা আকাশে ওড়াউড়ি না করার জড়তা কাটাচ্ছেন ডানা ঝেড়ে। আর বিবেক যাদের বাম সেই শরিক কোকিলকুল কাকের বাসায় ডিম পেড়ে সিঙ্গুর থেকে নন্দীগ্রামের আকাশ মাতিয়ে তুলেছেন কলতানে।

আরও পড়ুন মায়াজাল চন্দ্রবাবুর : সায় মমতার, জোটে এ বার মায়াবতী?

তখন থেকেই ইট পাতার উৎসব শুরু। যাঁরা যারা ভাগ্যগণনায় তুখোড় তাঁরা বসে নেই। সেই দারুণ গ্রীষ্মকালে গান ধরেছিলেন যে সব ভীষ্মলোচন শর্মা, দিল্লি থেকেও তাঁদের আওয়াজ দিব্যি শোনা যাচ্ছিল। সেই অনুযায়ী দফতর বণ্টন চলছিল। দিল্লি বনাম বাংলা প্রক্সি ওয়ার তখন নব পর্যায়ে। এক ঝটকায় বাম হাত কালীঘাটের গঙ্গায় ধুয়ে সদ‍্য সিপিএমকে মুরগি করেছেন মনমোহন। পরমাণু অস্ত্র রুখেছেন ডিটারেন্ট মমতায়। দু’কৌশলেই বাজিমাত সনিয়া-মনমোহন জুটির। কেন্দ্রে দুর্দিনে কংগ্রেস দশ বছরের রাজত্ব কিনেছে বাংলার দুই বিপরীত মেরুর দলের কাঁধে চেপে। এখন ৪৪-এর অঙ্ককে ২৭২-এর অঙ্কে পৌঁছোতে বাংলায় তৃণমূল, কেরলে সিপিএমের সঙ্গ চাই। কারণ এ মেরু অন্য মেরু। সাম্প্রদায়িক বনাম সেকুলার। ফলে, প্রশ্ন জটিল। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সা্রা দেশের বিরোধী শক্তিকে এক ছাতার নীচে আনার চেষ্টা চলছে। এই অবস্থায়, যে রাজ‍্যে যে দল শক্তিশালী সেই দলই একা লড়ুক, প্রস্তাব দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলায় একাই ৪২ বিজয়ের ডাকও দিয়েছেন তিনিই। জোরকদমে তাল ঠুকছেন বরকন্দাজগণ। কং-তণমূল ভাই ভাই, রাজ্যে আসন নাই, প্রধানমন্ত্রী চাই। হাইকম‍্যান্ডকে হাতে রাখতে চান সবাই‌। যেমন মায়াবতীও। কিন্তু রাহুলের হাইকম‍্যান্ড সনিয়ার মতো হাইফাই নন। কিছুটা ডাউন টু আর্থ। রাহুলকে বুঝতেই হয়েছে, জমানা বদলেছে। এখন প্রতিদ্বন্দ্বী বাজপেয়ী নন। ফিল গুড আডবাণীও নন। এখন অচ্ছে দিনের গদি। গদিয়ান মোদী। নয়া রাজনৈতিক কালচার। ম‍্যাটার অফ ফ‍্যাক্ট শাহই শাহেনশাহ। যদিও ওঁরা রাহুলকে ইদানীং পাপ্পু বলা ছেড়েছেন। কিন্তু বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শত গুণ। তবু মোদীর আন্তর্জাতিক আলিঙ্গনকে দেশি ঝাপ্পি বানিয়ে আর হিন্দু ধর্মের মর্মবাণী শিখে রাহুল কিন্তু আম ভারতে চর্চায় চলে এসেছেন। এতে খরচা বাড়ছে বিজেপির। অমিতবিক্রম বিজেপি সভাপতির যাত্রাপথের দিকে তাকান। ছত্তীসগঢ় আর রাজস্থানের কথা ছাড়ুন। মধ‍্যপ্রদেশের এমন কোনো জেলা থেকে তহশিল নেই যেখানে ঢুঁ মারছেন না অমিত শাহ। প্রচার যখন স্তিমিত হয়ে এসেছে তখনও তিনি ছুটছেন। কারণ শিয়রে শমন। উনিশের মুখে মধ্যপ্রদেশ হাতছাড়া হতে হবে না, কিছুটা টসকে গেলেও সাড়ে সর্বনাশ। সিপিএমের একদা বঙ্গের মতো এটা ভাজপা-তালুক। এখানে বার্তা বিগড়ে গেলে মার্জিন দেবে কে?

আরও পড়ুন আসরে চন্দ্রবাবু, অশনিসংকেত বিজেপির

এই বাজারে দুর্গরক্ষার দায়ে পড়ে বাংলারথ পিছিয়েছে। আসলে বাংলা বাজারে মূল সারথি নিয়ে একটু ‘পবলেম’। তৃণমূলের পালটা দিলীপ বেশ জুৎসই। যে ভাবে হাঁকডাক করেন, মনে হয় না মোটে তিন। মানে, তাঁকে ধরে। বিধানসভায়। আসানসোল কি আর সোল সম্পত্তি আছে? দার্জিলিং? তবু কুকথায় ক‍্যাডার গরম হয়। কিন্তু ক‍্যাডার আর কত? শাসকদের পাশে তো ক্লাইভের সৈন্য। দিলীপের হুমকিতে অন্য বিরোধী দলের লোকেরা খুশ হয়। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে। ছুটপুট কিছু ভোটও জোটে। কিন্তু সে তো যেখানে একটু পকেট টকেট আছে। সবই তো প্রায় মরুভূমি! কিন্তু এ সব আসলে হাতির দৃশ্য দাঁত‌। এ দাঁত দিয়ে পেট ভরে না। আসলে গঙ্গার তীরে নিরীহ বকের বেশে ধর্মরাজ লক্ষ রাখছেন স্রোতের দিকে। দেখছেন মাছেদের চলাচল। এ তো খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক নয়, নিতান্তই দাদা-ভাইয়ের। সময়মতো উনি ঠোঁটে করে জলাশয় বদলে দেবেন এই যা। সে জন্যই প্রতীক্ষা। সময়ের অনন্ত ইন্তেজার। দলে, মানে রাজ‍্যদলে কিছু লোক হাওয়া গরম করছেন। তৃণমূলের নাম্বার টু হয়েও বা কী হল? সবাই তো ভেবেছিল বিরাট তোলপাড় হয়ে যাবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে অষ্টরম্ভা!

আরও পড়ুন এসে গেছে অচ্ছে দিন, আম আদমি বুঝে নিন

কিন্তু রাজ‍্যের দিলীপপন্থীদৈর এ সব কথায় দিল্লির মসনদে আসীন বিজেপির চিড়ে ভেজে না। ওঁরা গভীর জলের মাছ। কাজেই ওঁরা সতীর্থদের বিলক্ষণ চেনেন। ওয়েভলেংথে বাজিয়ে নেন বারেবারে। মাছ গভীর জল থেকে কখন অক্সিজেন নিতে জলের ওপরের স্তরে আসে আর ঘনঘন মুখ দেখায় তা তো না-জানার কথা নয়। তাই আরও কিছু সময় মঞ্জুর করাই আছে। এমনি এমনি মুখ দেখে তো আর মুকুলকে লোকসভা ভোটের মুরুব্বি করা হয়নি। চিনে মাঞ্জার মতো অদৃশ্য ফাঁদ পাতা ভুবনে। খেরোর খাতায় সবার দিনক্ষণ নাকি ঠিক করা আছে। যতই চাঁদ সদাগরের লৌহবাসর হোক, কালনাগিনীর রাস্তা কে রুখবে? এমনই আস্ফালন। অবশ্যই পুরাতনী চাণক্য-চাল। তবে সাম-দাম পর্যন্ত এগোলেই নাকি রফা পাকা। দণ্ড-ভেদ দরকার পড়ছে না। বঙ্গে পদ্মের মুকুলিত হওয়ার মরশুম শুরুর দাবি বেশ জোরদার। গুজরাতি জহুরিদের জমানায় যদিও ভারে কিছু কাটে না, খাটে শুধু ধার। কর্জ নয়, অস্ত্রের ধার। লোকসভার ক’টা আসনের ঘাটতি পুষিয়ে দিতে পারবে বাংলা? এটাই মোদ্দাকথা। এখন শিরে সংক্রান্তি দিল্লির মসনদ। শির থাকলে তবে তো শরীর। কলকাতার গল্প একুশে। সুতরাং মসনদি মদত নিয়ে প্রস্তুত দিল্লি। এভারেস্ট জয় নেহাতই হিলারিকে দিয়ে হবে না। চড়াই উৎরাই খানা খন্দ আপদ সম্পদ চেনার জন্য চাই শেরপা তেনজিং। বাংলার দুর্জয় মাটি বিজেপির অচেনা। সংঘের তাবৎ রথী রথ নিয়ে বেরোলেও ফেঁসে যাবেন ভুলভুলাইয়ায়। কঠিন রাজনীতি আর জটিল পথ জানা দক্ষ কারিগর চাই। বাজিকর দিয়ে বাংলার বাজিমাত অসম্ভব বুঝেই এখানে অন্য ছকে চলছেন মোদী। সিবিআই নিয়ে তিনি মারমূখী নন। সবটাই শোভন অশোভন বুঝে চলা। এবং ভালোবেসে কেউ যদি অস্থায়ী সুখের চেয়ে নিরাপদ স্থায়িত্ব পেতে চায় তাদের জন্যই প্রতীক্ষা। এই রকম ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনতে শুনতেই বাংলার শোভন-বৈশাখী কাণ্ড ঘটে গেল। বৈশাখী নাকি বিজেপির ঘনিষ্ঠই। যদিও এটা কালবৈশাখীর সময় নয়, তবুও নেতারা নাচছেন – নাচে ওই কালবোশেখি, কাটাবি কাল বসে কি?

মালুম হচ্ছে, একটা অকালবৈশাখীর হিড়িক তোলা হচ্ছে। ২৩৫ -কে ৩০-এ নামিয়ে আনার স্টাইলে। এ খেলার খিলাড়ি কে?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here