রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা

এ বার শীতটা বেশ জম্পেশ ভাবেই শুরু হয়েছে উত্তর ভারতে। সেপ্টেম্বরেই আচমকা তুষারপাত হয়ে গিয়েছিল হিমাচলের লাহুল-স্পিতি অঞ্চলে। বরফে ঢেকে গিয়েছিল রোটাং পাসও। সেই শুরু। তার পর থেকে মাঝেমধ্যেই তুষারপাত হয়ে চলেছে কাশ্মীর, হিমাচল, উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন জায়গায়। কিছু দিন আগেই মরশুমের প্রথম তুষারপাত হয়েছে মানালিতে। তার দু’ দিন পরেই বরফ পেয়েছে সিকিমের কিছু জায়গা।

বোঝাই যাচ্ছে, এ বার নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই তুষারপাত শুরু হয়ে গিয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে। স্বভাবতই মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে তা হলে কি এ বার বরফে সাদা হতে পারে দার্জিলিং শহর? ওয়েদার আল্টিমার তরফ থেকে এই ব্যাপারেই কিছু বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেগুলি তুলে ধরা হল।

শেষ কবে বরফ পড়েছে দার্জিলিং-এ

শেষ বার দার্জিলিং শহরে বরফ পড়েছিল ২০০৮-এর ২৬ জানুয়ারি। কিন্তু সেটা সাধারণ মানুষের আশ মেটাতে পারেনি। কারণ বরফ পড়া মাত্রই তা শুকিয়ে যায়। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০০৭-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি, শেষ বার প্রবল তুষারপাত দেখেছিল দার্জিলিং শহর। সারা দিন ধরে চলা সেই তুষারপাতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে দার্জিলিং, ঘুমে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিতে হয়।

বরফে ঢাকা ঘুম স্টেশন। এ রকম ছবি এখন আর দেখা যায় না।

তার পর অবশ্য সে ভাবে তুষারপাত দেখেনি দার্জিলিং শহর। মাঝেমধ্যে শিলাবৃষ্টির মধ্যে দিয়েই বরফের সাধ মিটিয়েছে দার্জিলিং। টাইগার হিল, জলাপাহাড়ের মতো আরও উঁচুতে অবস্থিত কিছু জায়গা বরফের দেখা পেয়েছে। তবে সান্দাকফু, ফালুট অঞ্চলে প্রতি বছরই বরফ পড়ে। এ বছর ৩১ মার্চেও বরফ পড়েছে সান্দাকফুতে।

কেন দার্জিলিং-এ বরফ কম পড়ে

সমুদ্রতল থেকে মাত্র ৬ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মানালি আর ৬,৭০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত দার্জিলিং। কিন্তু তুষারপাতের নিরিখে দার্জিলিংকে বরাবরই দশ গোল দেয় মানালি। আসলে দার্জিলিং তথা পূর্ব হিমালয়ের অবস্থানগত কারণের জন্যই দার্জিলিং-এ বেশি বরফ পড়ে না।

পশ্চিম এবং উত্তর দিক থেকে দার্জিলিংকে ঘিরে রেখেছে উঁচু উঁচু পাহাড়। তুষারপাত ঘটানো পশ্চিমী ঝঞ্ঝার বাতাস ওই দিক দিয়েই আসে। কিন্তু উঁচু উঁচু পাহাড়ের ফলে সেগুলি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে যায়, ফলে দার্জিলিং-এ তুষারপাতের ঘটনা ঘটে না।

অন্য দিকে কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড, হিমাচলে তুষারপাত নামায় শক্তিশালী পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। বেশির ভাগ ঝঞ্ঝাই পূর্ব হিমালয়ে আসার পথে দুর্বল হয় যায়। যার ফলে তাদের তুষারপাত ঘটানোর ক্ষমতাও থাকে না।

এ ছাড়া গত এক দশকে দার্জিলিং-এর আশেপাশে প্রচুর গাছ কাটা হয়েছে। থাবা বসিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। ফলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এখন আগের তুলনায় অনেকটাই বেশি। ফলে শীতকালে বৃষ্টি হলেও দার্জিলিং-এ এখন আর বরফ দেখা যায় না বললেই চলে।

বর্তমান পরিস্থিতি কী জানান দিচ্ছে?

এই মুহূর্তে উত্তরবঙ্গে প্রবল ঠান্ডা চলছে। দার্জিলিং-এর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩-৪ ডিগ্রির আশেপাশে ঘুরছে। শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি-কোচবিহারের তাপমাত্রাও এখন রয়েছে ১১ থেকে ১৩ ডিগ্রির মধ্যে। নভেম্বরেই এই ঠান্ডা যখন, তখন অনেকেই ভাবছেন, এ বার দার্জিলিং-এর তুষারভাগ্য খুলবেই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখে সব কিছু বিচার করা যায় না। এখন প্রবল ঠান্ডা চললেই, কয়েক দিন পর থেকে আবার তাপমাত্রা বাড়বে সমগ্র উত্তরবঙ্গে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝির আগে শীত স্থায়ী ভাবে পড়বে না।

cool weather in jalpaiguri
জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছে জলপাইগুড়িতে। নিজস্ব চিত্র।

অন্য দিকে ৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা হলেই যে বরফ পড়বে সেটাও ঠিক নয়। কারণ বরফ পড়ার পরিস্থিতি অনুকূল হলেই তবে বরফ পড়বে এই সব অঞ্চলে।

আবহাওয়ার কী পরিস্থিতি হলে দার্জিলিং-এ তুষারপাত হয়?

উত্তর ভারতের দিক থেকে বয়ে আসা পশ্চিমী ঝঞ্ঝা দার্জিলিং পাহাড়ের কাছাকাছি এলে দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হয় আরব সাগর থেকে বয়ে যাওয়া জলীয় বাষ্প। আরব সাগরের এই জলীয় বাষ্পের জোগান নতুন করে শক্তি বৃদ্ধি করে পশ্চিমী ঝঞ্ঝাকে। নামে বৃষ্টি, শুরু হয় তুষারপাত। যে হেতু আরব সাগর থেকে জলীয় বাষ্পের জোগান খুব একটা বেশি হয় না, সে হেতু বরফের খুব একটা দেখা মেলে না এই সব অঞ্চলে।

অন্য দিকে জেট স্ট্রিমের আগমন ঘটার ফলে তুষারপাত হয়। জেট স্ট্রিম হল এক ধরনের শীতল বাতাস, যা আসে সুমেরুর দিক থেকে। জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই শীতল বাতাস সুমেরু থেকে কর্কটরেখার দিকে ধেয়ে যায়।

তা হলে এ বার কি দার্জিলিং-এ তুষারপাত হবে?

এ বার আসা যাক আসল কথায়। বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করে দেখা গিয়েছে এ বার দার্জিলিং শহরে তুষারপাত হওয়ার ভালো রকম সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি বেশ অনুকূলই। অল্প সময়ের জন্য হলেও বরফে ঢেকে যেতে পারে দার্জিলিং-এর সবার পছন্দের ম্যাল। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথমাংশের মধ্যে এই তুষারপাত হতে পারে।

তবে দার্জিলিং শহরের তুষারপাত হলে সেটা সাময়িক ঘটনা হবে। হালকা তুষারপাতের সম্ভাবনাই বেশি। দার্জিলিং শহরে ভারী তুষারপাতের সম্ভাবনা কার্যত নেই। তাই দার্জিলিং ম্যালে বরফ পড়লেও তা দ্রুত গলে যেতে পারে।

বরফে ঢাকা সান্দাকফু

তবে দার্জিলিং-এ হালকা তুষারপাত হলেও, জোর তুষারপাত হতে পারে সান্দাকফু-ফালুটে। ভালো বরফ দেখতে পারে টাইগার হিল, এমনকি ঘুমও। বরফে সাদা হতে পারে জলাপাহাড় এলাকাও। পরিশেষে বলতে হয়, যদিও খামখেয়ালি আবহাওয়া মাঝেমধ্যেই ভেলকি দেখাতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এটাই বোঝা গিয়েছে যে এ বার দার্জিলিং-এ তুষারপাতের সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল।

পর্যটকদের জন্য একটা কথাই বলতে হয়, সময় থাকতে থাকতে দার্জিলিং ভ্রমণের একটা পরিকল্পনা করে ফেলুন। কে বলতে পারে, গ্লেনারিজে গরম কফিতে তৃপ্তির চুমুক দিতে দিতে হয়ত দু’তিন ফোঁটা বরফ পড়ল আপনার পরনের শীতবস্ত্রের ওপরে।

(লেখক বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থা ওয়েদার আল্টিমার কর্ণধার)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here