চিরঞ্জীব পাল

বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। ক্লাসে চলছে পরীক্ষা। ভূগোল পরীক্ষা। মাটির সোঁদা গন্ধ গোটা হল জুড়ে ম ম করছে। পরীক্ষার খাতায় কি আর মন বসে? তবু বসাতেই হচ্ছে।

সবে তিন নম্বর প্রশ্নটা প্রায় শেষ করে ফেলেছি, হঠাৎ একটা পেনের খোঁচা। আমার বেঞ্চের অপর প্রান্তে বসেছে মন্টু। ভালো নাম একটা আছে, তবে পাড়ায় ওই নামেই ‘জনপ্রিয়’। তাই মন্টু নামটা স্কুলেও প্রচলিত। সে আমার অজান্তে কখন আমার কাছে চলে এসেছে বুঝতেই পারিনি। মন্টু পেনের খোঁচা দিয়ে ইশারা করে আমাকে ওর কাছে আসতে বলছে। স্কুলে আমার ভালো ছেলে এবং বন্ধুবৎসল বলে একটা পরিচিতি আছে। এ সব ক্ষেত্রে নিজের সামর্থ্যমতো আমি যে সাহায্য করে থাকি, তা আমার সাহায্যপ্রার্থী বন্ধুরা অনেকেই জানে। মন্টুও জানে। তাই কোনো দ্বিধা না করেই আমাকে পেনের খোঁচা দিয়ে ডেকেছে।

স্যার মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। বাইরের বৃষ্টির শব্দ ক্লাসের ভেতর ফিসফিস গুনগুন শব্দকে  কার্যত চাপা দিয়ে ফেলেছে। আমি একটু সরে এলাম। মন্টু বলল, “কত নম্বর কোয়েশ্চেন লিখছিস।”

–“তিন নম্বর।”

মন্টু বলল, “তা হলে প্রথম পাতাটা একটু সামনে রাখ।”

আমি খাতাটা সামনে বার করে রাখলাম। এমন ভাবে যেন লিখতে লিখতে বেখেয়ালে ও ভাবে খাতাটা রেখেছি। গার্ড স্যারও এ সব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছেন না। কী হতে পারে যেন ওঁর আগে থেকেই জানা। তাই পরিস্থিতিকে না ঘাঁটিয়ে মন দিয়ে কাগজ পড়ছেন। মন্টু আমার খাতা দেখে টুকতে লাগল।

বাইরে সমান তালে বৃষ্টি পড়ে চলেছে।

আমি কেন ওকে এ ভাবে খাতা খুলে কপি করতে দিলাম?

আসলে এটার পেছনে অন্য একটা কারণ আছে, পরে তলিয়ে ভেবে সেটা বুঝতে পেরেছি। আমার খাতা দেখে কেউ নকল করছে, এটা ভেবে আমি খুব গর্বিত হতাম।  আমি জানি ও যতই করুক আমার সমান নম্বর পাবে না। কিন্তু আমি তো ওর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছি। কেউ একজন আমার লেখা উত্তর কপি করছে। একটা অদ্ভুত অনুভূতি এনে দিত।

আচ্ছা, সেই সময় যদি আমাদের কম্পিউটারে পরীক্ষা দিতে হত, এই টোকার কাজটা কত সহজ হত মন্টুর কাছে। কোনো ভাবে ফাইলটা ওর কাছে পাঠিয়ে দিলে ও কপি করে জাস্ট পেস্ট করে দিত। কোনো ঝক্কি নেই। কপি আর পেস্ট। কপি আর পেস্ট।

ভারী মজার ব্যাপার। যুদ্ধদৃশ্য শ্যুটিং-এর সময় ক্যামেরার সামনে মাত্র জনাচারেক লোককে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখানো হল। এডিটের সময় গ্রাফিক্স সফটওয়্যারে ফেলে কপি আর পেস্ট, হয়ে গেল এক লাখ সৈন্য। ভারী মজা না!

ভাইরাস হল এক প্রকার অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অণুজীব যারা জীবিত কোষের ভিতরেই মাত্র বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এরা অতি-আণুবীক্ষণিক এবং অকোষীয়। ভাইরাস জীব হিসাবে বিবেচিত হবে কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিমত আছে।

এই তো নববর্ষের দিন হোয়াটস অ্যাপ চালু করতেই দেখি এক গুচ্ছ নোটিফিকেশন। নববর্ষের শুভেচ্ছাবার্তা। খুলে দেখি দশ জনের মধ্যে সাত জনই এক রকম ছবি পাঠিয়েছে। কপি আর পেস্ট। কেউ হয়তো একজনকে  পাঠিয়েছে সেই ছবি, তার পর সেটা কপি পেস্ট হতে আরম্ভ করেছে।

নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে হবে। হাতের কাছে ওই ছবিটি পাওয়া গিয়েছে। দিলাম পাঠিয়ে, অত খোঁজাখুঁজির দরকার কি? বা দরকার কি মাথা খাটিয়ে শুভেচ্ছাবার্তা বানানোর। শুভেচ্ছা জানাতে হবে, হাতের কাছে ‘মাল’ পেলুম ব্যাস, কে অত মাথা খাটায়।

একেই বোধহয় বলে ‘ভাইরাল’। শব্দটা এসেছে ভাইরাস থেকে। উইকিপিডিয়াতে দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী ভাইরাস হল এক প্রকার অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অণুজীব যারা জীবিত কোষের ভিতরেই মাত্র বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এরা অতি-আণুবীক্ষণিক এবং অকোষীয়। ভাইরাস জীব হিসাবে বিবেচিত হবে কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিমত আছে। মানুষ, পশুপাখি, উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী ভাইরাস। এমনকি, কিছু ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যে বংশবৃদ্ধি করে। এদের ব্যাক্টেরিওফাজ (Bacteriophage) বলা হয়।

এই ভাইরাল ব্যাপারটার দু’টো দিক আছে। একটি ভালো, অন্যটি গোলমেলে। ধরা যাক কোনো একটি অসামাজিক কাজের ছবি বা কোনো শিশুর চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়ে কেউ পোস্ট করেছে বা হোয়াটস অ্যাপে কাউকে শেয়ার করেছে।  তার পর সেটি ‘ভাইরাল’ হয়ে গেল। এতে অনেক সময় লাভই হয়। ওই অসামাজিক কাজের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়। ভাইরাল হতে দেখে চাপে পড়ে প্রশাসনও ব্যবস্থা নেয়। অথবা শিশুটির সাহায্যের জন্য অনেকেই হাত বাড়িয়ে দেন।

এ বার গণ্ডগোলের বিষয়টা নিয়ে দু-চার কথা আলোচনা করা যাক। হিন্দু, হিন্দুত্ব নিয়ে আজকাল যা চলছে। মাঝে মাঝেই দেখি এই সব পোস্ট চলে আসে। গত কয়েক বছর ধরে পৃথিবী জুড়ে অদ্ভুত এক বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। অনেকের মধ্যে সুপ্ত থাকা সাম্প্রদায়িকতাবোধ জেগে উঠছে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি — এ সবের চেয়ে কে কোন জাত, এই বিষয়টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আমাদের অনেকের কাছে। নিজের জাতের স্বপক্ষে ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে যুক্তি খুঁজে বেড়াচ্ছি অহরহ। নিজের মনের মতো কিছু যুক্তি পেলেই কপি আর পেস্ট। ওই পোস্টে লেখা তথ্যের সত্যতা কতটা তা আর কেউ যাচাই করছে না। তার পর ক্রমশ দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে সেই পোস্ট। শুধু হিন্দু মৌলবাদ কেন মুসলিম মৌলবাদও ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাবে। জীবিত কোষের ভেতর দ্রুত বংশবৃদ্ধি করছে এই মৌলবাদের ভাইরাস।

এ সবের জন্য শুধু ফেসবুক বা হোয়টাসঅ্যাপকে গাল পেড়ে লাভ নেই। বিনা পরিশ্রমে নিজের যুক্তির স্বপক্ষে পাওয়া তথ্য ধ্রুব সত্য মেনে নেওয়ার অভ্যাসটা আমাদের সেই ছোটোবেলা থেকে তৈরি হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে যা আছে তাকে সত্য বলে মেনে নিয়ে মুখস্থ করা এবং পরীক্ষার খাতায় বমি করে আসা, এই তো অভ্যাস করেছি আমরা। ভালো ছেলেমেয়েরা বড়োজোর চাট্টি বাড়তি রেফারেন্স বই পড়ছে। পাঠ্যবইয়ে লেখা লাইনগুলোর সঙ্গে আরও বাড়তি দু’চার লাইন যুক্ত করে মার্কসটাকে বাড়িয়ে নিয়েছে। ছোটো থেকে আমাদের অভ্যাসই করানো হয়নি মুক্ত মনে সব কিছু চিন্তা করতে, ভাবতে, হাতেকলমে পরখ করে দেখে যাচাই করতে। অদ্ভুত এক দাসত্ব চর্চা করেছি আমরা, এখনও করে চলেছি। চিন্তার দাসত্ব। আর আমাদের যুক্তিবোধগুলো তৈরি হয়েছে সেই দাসত্বের চর্চা থেকে। আমরা ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ নামক সোশাল নেটওর্য়াটগুলোতে সেই দাসত্বের চর্চাই করছি।

মন্টু আমার খাতা থেকে টুকে উত্তর লিখত। আপাতদৃষ্টিতে মন্টুকে মনে হবে আমার চিন্তার দাস। আজকে আমার মনে হয়, ভালো ছেলে নয়, আমি আসলে ভালো দাস। মন্টুর থেকেও ভালো। জানি না এই দাসত্ব থেকে কবে নিজেদের মুক্ত করতে পারব। কবে আসবে সেই স্পার্টাকাসের ডাক।

1 মন্তব্য

  1. ‘কবে আসবে সেই স্পার্টাকাসের ডাক’ পড়লাম। খুব ভালো লাগলো ! অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক তুলে ধরার জন্য চিরঞ্জীবকে অনেক ধন্যবাদ!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here