hegemony of tmc in west bengal panchayet election
দেবারুণ রায়

এগারোর বাংলায় প্রায় সব মত ও পথের ‘মানুষ’ ‘মাটি’কেই মহিমান্বিত করে ‘মা’য়ের নামে সঁপেছিল তাদের আগামী দিন। সিঙ্গুরের চারশো একর না ছাড়ার কৌশলগত ভুল আর নন্দীগ্রামে ‘লক্ষণ’রেখা মেনে চলার ফাঁদে পা দিয়ে ‘২৩৫’-এর সরকার ৩৫ বছর পূর্ণ করতে পারেনি। যাঁর হাতে বাম জমানার এভারেস্ট জয়, সেই বুদ্ধদেবই হয়ে উঠলেন লাল দুর্গের বাহাদুর শাহ জাফর। শাসনযন্ত্রকে দলদাস বানানো থেকে শুরু করে গণতন্ত্রকে দলতন্ত্র করার দুর্লক্ষণ কালবোশেখির কালো মেঘ হয়ে ‘পরিবর্তন’কে স্বাগত জানিয়েছিল। ক্ষমতার কারবারিরা বাংলার মসনদে টিকে থাকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছকতে গিয়ে সে দিনের শাসককেও কার্যত বন্দি করেছিল চক্রব্যূহে। দলে নিয়ন্ত্রণহীন শাসককে ব্যবহার করে প্রায় পঁচিশ বছরে শিকড় ছড়ানো কায়েমি স্বার্থ শেষ পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন হল বাকি দশ বছরে। প্রমাণ হল জনপ্রিয় নেতারও ছাড় নেই জনতার আদালতে। দলতন্ত্রের তর্জন মানুষ সহ্য করে না। এটা সব দেশে সব কালেই সত্যি। বিশেষ করে বাংলায়। কিছু দিন কিছু মানুষ ভুল করতে পারে। কিন্তু চিরকাল সব মানুষ ভুল করে না।

buddhadeb bhattacharya
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

বাংলার বাহাত্তরের সরকার তার জ্বলন্ত সাক্ষী। ষাটের শেষ থেকে সত্তরের গোড়া পর্যন্ত এই অগ্রগামী রাজ্যের চূড়ান্ত অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বাহাত্তরের দুর্যোগ এসেছিল। তাকে রোখার শক্তি ছিল না মানুষের। ফলে পঁচাত্তরের চার বছর আগেই সারা দেশের ল্যাবরেটরিতে লিটমাস হয়ে উঠেছিল বাংলা। একাত্তরের বাংলা দাওয়াই সফল হওয়ার চার বছর পর সারা দেশে জারি হল জরুরি অবস্থা। তার পরেই সাতাত্তরের ভারত দেখল পরিবর্তনের রামধনু-রং।

ইতিহাসের এই স্বরলিপিগুলোই সুর ছড়াচ্ছে মা-মাটি-মানুষের সরকারের রাজ্যে। গ্রামবাংলায় ক্লিশে হয়ে যাওয়া এই শব্দবন্ধের পুরোটাই তার অর্থ হারিয়েছে। পরিবর্তনের শাসন ধাপে ধাপে পা ফেলেছে। প্রথমে ছোটো ছোটো উপনির্বাচন। তার পর ইতিউতি পুরভোটে কারচুপির অভিযোগ ওঠা দিয়ে শুরু। এরই মধ্যে ধৈর্যশীল স্থিতধী মানুষ দেখেছে পঞ্চায়েতে, পুরসভায় দলে দলে দলবদল। শূন্য থেকে পূর্ণ হয়ে নেতারা আন্দোলন করেছেন, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে বাংলা। একের পর এক বাম-ডান বিরোধী দুর্গের পতন হয়েছে, হচ্ছে, ভোট ছাড়াই। এ বার ‘উন্নয়ন পথ আটকাল’। রণক্ষেত্র হয়ে উঠল একের পর এক জেলা। মাথা ফাটল বিরোধীদের। রক্তে ভিজল ‘মাটি’। সন্ত্রস্ত ‘মানুষ’ দেখল বীরভূমের পর বাঁকুড়াও কার্যত বিরোধীশূন্য। বিনা লড়াইয়ে একচ্ছত্র শাসকদল। ‘মা’য়ের মুখে উৎকণ্ঠা, আতঙ্কের ছাপ দেখতে পেলেন না শাসক। বললেন, মহম্মদবাজার, নলহাটি, সন্দেশখালি, শাসন, আর জেলা বলতে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, উত্তর দিনাজপুরে ঘটেছে কিছু সামান্য ঘটনা। ‘সামান্য ক্ষতি’। অশান্তি বলতে কিছুই হয়নি। ‘বিরোধীদের রান্না কি আমি গিয়ে রাঁধব?’

g devarajan, all india forward block
জি দেবরাজন

দিল্লি থেকে খবর এল। একটি ছোট্টো বাম দলের নেতা সর্বভারতীয় বিবৃতি জারি করেছেন। দলটির নাম ফরওয়ার্ড ব্লক। নেতার নাম জি দেবরাজন। সর্বভারতীয় সম্পাদক। তিনি বলেছেন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সারা দেশে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রীয়তাকে বাঁচানোর স্বার্থে বিরোধীদের গণতান্ত্রিক জোট গড়ার ডাক দিয়েছেন। কলকাতা থেকে দিল্লি হয়ে সুদূর হায়দরাবাদ, চেন্নাই পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর বার্তা। বিরোধী নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা, দেখাসাক্ষাৎ চলছে। রাজধানীতে এসেও নানা নেতার সঙ্গে দেখা করে উপযুক্ত বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর নিজের রাজ্যেই তো গণতন্ত্র কাঁদছে। বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত গড়ার ডাক দিচ্ছেন তাঁর দলের নেতারা, প্রকাশ্যে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সে সব কথাকে খণ্ডন করে কোনো মন্তব্য শোনা যায়নি তাঁর কাছ থেকে। অথচ যে বিরোধীদের নিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক জোট গড়তে চান, তাঁরাই তো প্রতি দিন আক্রান্ত হচ্ছে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে। তাদের ভোটে লড়ার ন্যূনতম অধিকারও স্বীকার করা হচ্ছে না। প্রকাশ্যে বাহুবলীরা রুখে দিচ্ছে বিরোধী প্রার্থীদের। মহিলা প্রার্থীরাও শারীরিক নিগ্রহ থেকে ছাড় পাচ্ছেন না। এমন অবস্থায় গণতান্ত্রিক জোটের কথা বলার অধিকার নেই বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর, দাবি করেছেন দেবরাজন। প্রসঙ্গত স্মরণীয় ইন্দিরা জমানার কথা। যখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাম শিবিরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলার পাশাপাশি ইন্দিরা দেশে বাম, অবাম নির্বিশেষে বিরোধীদের নিধন করেছেন।

রাজ্যের সুপ্রিম নেত্রীর কাছে অকিঞ্চিৎকর দেবরাজন। যদিও বিরোধী শিবিরে প্রথম আওয়াজ তুললেন তিনিই। এমনকি বাম শিবিরেও। বাম ফ্রন্টের নেতা সিপিএম বা মেজো ভাই সিপিআই এখনও নীরব। দেশের নেতার নীরব-নীতির পদাঙ্কই কি অনুসরণ করতে শুরু করেছেন বিরোধী শিবিরের নেতানেত্রীরাও?

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন