shahenshah

চিরঞ্জীব পাল: থানার মধ্যে যুবক পিটিয়ে বির্তকের কেন্দ্রে চলে এলেন আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক নিখিল নির্মল। ফেসবুকের কল্যাণে সবাই দেখতে পেল একজন আইনরক্ষক কী ভাবে থানার মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বেধড়ক মারছেন এক যুবককে। সেই কাজে জেলাশাসকের সঙ্গী হয়েছেন তাঁর স্ত্রী। গোটা ঘটনা ঘটছে থানার ওসির সামনে।

এই ঘটনার পর জেলা শাসককে ১০দিনের ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছে নবান্ন। চলছে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিওর সত্যতা যাচাই। নিখিল নির্মলের স্ত্রী ফেসবুকে স্বামীর স্বপক্ষে একটি পোস্ট লিখেছেন। তাতে তিনি লিখেছেন যোগ্য স্বামীর মতোই কাজ করেছেন জেলাশাসক। বিয়ের সময় স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষার যে শপথ তিনি নিয়েছিলেন তা নিখিল রেখেছেন। এখানেই একটি প্রশ্ন আসে। প্রশাসনিক পদে যোগ দেওয়ার সময়ও তো তিনি কিছু শপথ নিয়েছিলেন। সেগুলি কী ভুলে গেলেন? না কি মনে থাকলেও সেই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্ত্রীর মর্যাদা? হতেই পারে। কিন্তু, আমরা নাগরিক হিসাবে বলে পারি, আপনি ওই ভাবে আইন নিজের হাতে নিতে পারেন না। কারণ, আপনার মাইনে হয় আমার দেওয়া ট্যাক্সের পয়সা। যে ছেলেটিকে আপনি পেটালেন তার বাবার দেওয়া ট্যাক্সের পয়সায়।

এটা সব সরকারি কর্মীরাই ভুলে যান। চেয়ারে বসলে শিরা-উপশিরা দিয়ে অদ্ভুত একটা রক্ত স্রোত বইতে আরম্ভ করে। মনে করেন আমি সর্বশক্তিমান। আমার অঙ্গুলি হেলনে চলছে সব কিছু। ঠিক যেমন জেলাশাসক ছেলেটিকে মারতে মারতে বলছেন, ‘আমার জেলায় কেউ আমার বিরুদ্ধে কথা বলবে না।’ আবার বলছেন, ‘আমি বাড়িতে গিয়ে মেরে আসব।’ শুনছি আর শিউর উঠছি। কে বলছেন কথাটা, একজন জেলা শাসক না কী হাতাকাটা বা মুখকাটা দিলীপ, পল্টু, কালু।

সিনেমাগুলো প্রচুর হাততালি কুড়িয়েছে। আমরাই দিয়েছি। কেন? আসলে আমরাও বোধহয় আইনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ।

ফেসবুকেই দেখছিলাম জেলাশাসকে এই কাজকে অনেকে সমর্থন করেছেন। কেউ বলেছেন বাস্তবের দাবাং, সিঙ্ঘম ইত্যাদি ইত্যাদি। দাবাং, সিঙ্ঘম তো হালের সিনেমা। সেই অমিতাভের শাহেনশার কথা ভাবুন। এমনি সময় সে ঘুষখোর পুলিশ আর অপরাধীদের দমনে সে শাহেনশা। কারণ সে বাবার মৃত্যুতে বুঝে গেছে আইনের মাধ্যমে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। প্রতিকার পেতে গেলে আইনকে নিজের হাতে তুলে নিতে হয়। এই দেখুন এই যে প্রতিকার শব্দটি ব্যবহার করলাম সেটা দিয়েও একটি সিনেমা হয়ে গিয়েছে। যে সিনেমায় অভিনয় করছিলেন ভিক্টর ব্যানার্জি। মা-বোনের খুন ধর্ষণের বদলা নিতে নায়ক গুন্ডা হয়। একের পর দোষীকে সে খতম করে। হলি-বলি-টলিউডে এ রকম ভুরিভুরি উদাহরণ আছে। সিনেমাগুলো প্রচুর হাততালি কুড়িয়েছে। আমরাই দিয়েছি। কেন? আসলে আমরাও বোধহয় আইনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। আইনের জটিলতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক অবস্থার নিরিখে আইন প্রয়োগে ফারাক –এ সবই আমাদের আইনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। দীর্ঘদিন ধরে এটা চলতে চলতে আমাদের মতিষ্ক এটা বিশ্বাস করতে শুরু করে আইন থাকুক আইনের মতো আমি থাকি আমার মতো। গণতন্ত্রের বদলে সামন্ততন্ত্রের রাস্তায় সমাধান খুঁজতে চাই।

আইনরক্ষকের ভূমিকায় থাকবেন বলে জেলাশাসক রীতিমতো পড়াশুনো করে, পরীক্ষা দিয়ে ট্রেনিং নিয়ে চাকরিটা পেয়েছেন। তা সত্ত্বে তাঁর মস্তিষ্কে সেই গেড়ে বসে থাকা ভাবনাটা আইনকে নিজের হাতে তুলে নিতে বলে।

[আরও পড়ুন :স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে ফেসবুকে পোস্ট আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসকের স্ত্রীর, সিনেমার দাবাং বাস্তবে বলে মন্তব্য]

পরিশেষে বলি, ছেলেটির বক্তব্য আমরা জানি না। যা জানছি তা ওই ভিডিওটি দেখে এবং জেলাশাসকের স্ত্রীর ফেসবুক পোস্ট দেখে। খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পরেছি ছেলেটি আর্থিকভাবে দুর্বল শ্রেণিতে অবস্থান করে । তাই বোধহয় জেলাশাসক অমনভাবে পেটাতে পারলেন। আর্থিকভাবে সবল হলে ঘটনাক্রম অন্য রকম হতো।

চারপাশে অসন্তোষের বাতাবরণ। এই ঘটনা তার থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আগামী দিনে ভারতকে পৃথিবীর বৃহত্তর গণতন্ত্রের দেশ বলা যাবে কিনা তা সত্যিই আশঙ্কার।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here