নীলাঞ্জন দত্ত

আন্তর্জাতিক আদালতে কুলভূষণ যাদব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। আশা করা যায়, শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রাণ নিশ্চয়ই রক্ষা পাবে। তবে আপাতত এ কথা মোটামুটি সবাই মেনে নিচ্ছে যে, প্রথম রাউন্ড গেছে ভারতেরই পক্ষে। এমনকি পাকিস্তানেও তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই ইতিমধ্যেই সেখানে দোষারোপের খেলা শুরু হয়ে গেছে।

এই ডামাডোলে যে কথাটা চাপা পড়ে যাচ্ছে তা হল, যে রাস্তায় গিয়ে ভারত সরকার এই ফল পেল, সেই রাস্তায় হাঁটতেই এত দিন তার গায়ে জ্বর এসেছে। কী জানি কেন সে ধরেই নিয়েছে, যে কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামের রায় তার বিরুদ্ধেই যাবে। কেবল সরকারকেই বা বলি কেন, এ সব কথা উঠলেই অনেকে রে রে করে ওঠেন, “আমাদের দেশের ব্যাপারে ওরা কথা বলবার কে?” এখন তো দেখা যাচ্ছে, ফলটা সব সময় তেতো হয় না। তাই ইদানীং তাঁদের গলা কম শোনা যাচ্ছে।

কিন্তু ভারত এখনও মানবাধিকার সংক্রান্ত অনেক চুক্তির কিছু কিছু ধারা মানতে নারাজ। যে আন্তর্জাতিক আদালতে কুলভূষণ যাদবের মামলা নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেখানে কেবল রাষ্ট্রগুলিই যেতে পারে। একে বলে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)। ১৯৪৫ সালে এই আদালত তৈরি হওয়ার পর থেকে বিশ্বের মানবাধিকার আন্দোলনের চাপে আরও বহু ফোরাম তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলিতে এমন অনেক ধারা যোগ হয়েছে, যা মেনে নিলে কেবল রাষ্ট্রই নয়, নাগরিকরাও তাঁদের অভিযোগ নিয়ে বিচার চাইতে যেতে পারবেন, সেখানে শুনানির সুযোগ পাবেন এবং আন্তর্জাতিক তদন্তকারী দল এসে নির্দিষ্ট বিষয়ে তদন্তও করতে পারবে।

স্বীকৃতি ঝুলে থাকা কনভেনশনগুলির তালিকা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষা সংক্রান্ত কনভেনশন, এমনকি অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের লোকেদের সুরক্ষা সংক্রান্ত কনভেনশন পর্যন্ত। আর কেন কে জানে, প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে আসা উদ্বাস্তু সমস্যায় জর্জরিত ভারত ১৯৫১ সাল থেকে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু কনভেনশনগুলির কোনোটাতেই এখনও সই পর্যন্ত করে উঠতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট বা আইসিসি) এই রকম একটি ফোরাম। আইসিজে-এর সঙ্গে এর তফাৎ হল, এখানে গণহত্যা, যুদ্ধের সময় করা অপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য কেবল কোনো রাষ্ট্রের নয়, কোনো ব্যক্তিরও বিচার করা যাবে। অভিযোগও আনতে পারবেন যে কোনো ব্যক্তি। ২০০২ সালে ৬০টি দেশ রোম স্ট্যাটিউট সই করে এই আদালত প্রতিষ্ঠা করে। এখন এর সদস্য-দেশের সংখ্যাটা বেড়ে ১২৪-এ দাঁড়িয়েছে। ২০১০ সালে এতে এক দেশের দ্বারা অন্য দেশের ওপর আগ্রাসনকেও অপরাধ বলে গণ্য করার প্রস্তাব এসেছে। এ বছর, ২০১৭-এর মধ্যে অন্তত ৩০টি দেশ এতে সই করলে তার পর এই নতুন ধারাকে আইসিসি-র স্ট্যাটিউটে ঢোকানোর জন্য ভোটে তোলা হবে। কিন্তু ভারত এখনও আইসিসি-র বাইরেই রয়ে গেছে – আমেরিকা, ইরান, ইউক্রেন, তুরস্ক, ইজরায়েল আর পাকিস্তানের সঙ্গে। উপরন্তু সে আমেরিকার সঙ্গে একটা চুক্তিও করেছে – দুই দেশের কোনো নাগরিককেই আইসিসি-তে বিচারের জন্য পাঠানো হবে না।

এর অনেক দিন আগে, ১৯৬৬ সালে, রাষ্ট্রপুঞ্জে গৃহীত হয় ইন্টারন্যাশনাল কভেনান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস বা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদ। ভারত ১৯৭৯ সালে তাতে সম্মতি দেয়। কিন্তু সে আজ পর্যন্ত তার দ্বিতীয় ঐচ্ছিক প্রোটোকল মেনে নেয়নি। এতে লেখা আছে, স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করবে।

এই কভেনান্টের প্রথম ঐচ্ছিক প্রোটোকলেও ভারত সম্মতি দেয়নি। তেমনি সম্মতি দেয়নি নারীদের বিরুদ্ধে সমস্ত রকম বৈষম্য দূর করা এবং বিকলাঙ্গ ব্যক্তিদের অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশনগুলির ঐচ্ছিক প্রোটোকলগুলিতেও। এগুলি মেনে নিলে কী হত? কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিটির কাছে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারতেন এবং কমিটি তার তদন্ত করতে পারত। অবশ্য, অভিযোগকারীকে প্রমাণ দিতে হত যে তিনি আগে দেশের বিচারব্যবস্থার সমস্ত পথ ঘুরে এসেও ন্যায়বিচার পাননি মনে করছেন বলেই আন্তর্জাতিক ফোরামের দ্বারস্থ হয়েছেন।

এ রকম আরও উদাহরণ আছে। সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি বিস্ময় প্রকাশ করেছে, ১৯৯৭ সালে সই করা সত্ত্বেও ভারত সরকার কেন এখনও কনভেনশন এগেনস্ট টর্চার বা নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন অনুমোদন করে উঠতে পারল না। কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সই করার পর তাকে দেশের সংসদে পাস করিয়ে নেওয়াকে বলে অনুমোদন করা। এটা হয়ে গেলে তখন এই চুক্তির বিষয়বস্তু দেশের আইনে স্বীকৃতি পায়। এখনও এই ভাবে স্বীকৃতি ঝুলে থাকা কনভেনশনগুলির তালিকা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষা সংক্রান্ত কনভেনশন, এমনকি অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের লোকেদের সুরক্ষা সংক্রান্ত কনভেনশন পর্যন্ত। আর কেন কে জানে, প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে আসা উদ্বাস্তু সমস্যায় জর্জরিত ভারত ১৯৫১ সাল থেকে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু কনভেনশনগুলির কোনোটাতেই এখনও সই পর্যন্ত করে উঠতে পারেনি।

ভারতের সংবিধানের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদেই লেখা আছে, যে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তিগুলিকে সম্মান করে চলবে। কিন্তু মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এতগুলো কনভেনশন আর প্রোটোকলকে এড়িয়ে যাওয়া কেন? তবে কি রাষ্ট্রের কর্ণধারদের মনে কোথাও একটা ভয় কাজ করেছে, যে মানবাধিকার সংক্রান্ত বিবাদ আন্তর্জাতিক ফোরামে গেলে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে? কুলভূষণ যাদবের মামলায় তো দেখাই গেল যে নিজেরা তথ্য আর যুক্তির শক্ত জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে তা হয় না। ভারত রাষ্ট্র তার বিচারব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ আর ন্যায়নিষ্ঠ বলে দাবি করে। তা হলে কোনো নাগরিক যদি দেশে বিচার পাননি বলে আন্তর্জাতিক ফোরামে যান, সেখানেও তো ভারতীয় বিচারেরই জয় হওয়ার কথা। এ তো আর পাকিস্তানের সামরিক আদালতের গোপন বিচার নয়। তবে আর দ্বিধা কেন?

৪ মে জেনেভায় রাষ্ট্রপুঞ্জের সমস্ত সদস্য দেশকে মানবাধিকার সংক্রান্ত যে ‘ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ’ রিপোর্ট দিতে হল, সেখানে গিয়ে ভারতের প্রতিনিধি মুকুল রোহতগিকে ১১৪টা দেশের কাছ থেকে এই পরামর্শই শুনতে হয়েছে। এই বছরই সেপ্টেম্বর মাসে মানবাধিকার পরিষদের ৩৬তম অধিবেশনে যখন গিয়ে দাঁড়াবে ভারত, তখন কি সে এই প্রত্যাশা পূরণ করবে?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here