hunting festival of adivasis
ছোটন দত্ত গুপ্ত

‘দিসুম সেন্দ্রা’ বা শিকার আদিবাসীদের এক আদি সংস্কৃতি। শিকার আদিবাসীদের বীরত্বের পরব। আদিবাসীদের মধ্যে একটি প্রবাদ আছে, যে মরদ শিকারে যায়নি সে মায়ের গর্ভেই রয়ে গিয়েছে। মানুষের শিল্পের যে সব আদিম রূপ তা কিন্তু সবটাই এসেছে প্রকৃতিকে জয় করার জন্য যে লড়াই, তার মধ্যে দিয়েই। তাই আদিবাসীদের নাচ, গান, শিকার বিনোদনের বিষয় নয়, এগুলি তাদের কাছে দৈনন্দিন সংগ্রামের হাতিয়ার। মানুষ মেহনত করার সময় তালে তালে গান গায়। শ্রমিকরা ভারী জিনিস বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় গান গায়, তেমনি ধান কাটার গান, নৌকা বাওয়ার গান। শিকারে যাওয়ার সময় বিভিন্ন মেহনতের টোন তাদের শরীরী ভাষায় ফুটে ওঠে। মেহনতের সঙ্গে তাঁদের জীবনের প্রতিটি অনুভূতি দিয়ে গড়া তাঁদের জীবন-জীবিকা, সমাজ ও সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির সঙ্গে শহুরে মোচ্ছব গুলিয়ে ফেলবেন না। এ সমাজ-সংস্কৃতি মানে যদি ভাবা হয় পঁচিশে বৈশাখ পালন, গায়ে পাউডার দিয়ে, শুভ্র পাঞ্জাবি পরে অনুষ্ঠানে যাওয়া, শুধু নিজের ক্লাস ধরে রাখতে, অথবা ওখানে বসেই রবি ঠাকুরের মুখের দিকে তাকিয়ে শেয়ারবাজারের ওঠা-নামার হিসাব কষা, তা কিন্তু একদমই নয়। সভ্য মানুষের উৎসব আর আদিবাসীদের পরব এক ভাববেন না। ওদের পরবের রীতিনীতি প্রকৃতির থেকে শিক্ষা নিয়ে তিলেতিলে গড়ে উঠেছে। আদিবাসীদের থেকে প্রকৃতিকে ভালো কেউ বাসে না।

বন্যপ্রাণ রক্ষা একান্ত প্রয়োজন। তা বলে বন্যপ্রাণ রক্ষার নামে আদিবাসীদের শিকার পরব বন্ধ করা মানে প্রকৃতির সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট করা। পৃথিবী ভারসাম্য হারাচ্ছে সে দিন থেকে, যে দিন থেকে মানুষ অধিক উৎপাদন শুরু করেছে। আরও সর্বনাশ শুরু হয়েছিল সে দিন থেকে, যে দিন উৎপন্ন ফসল শ্রমের বিনিময়ে ভাগ বন্ধ হল। মালিকের জন্ম হল। মজুতঘর যত ভরো, ততই ঘর বড়ো হতে থাকে। তখন থেকেই পৃথিবীর ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন: পায়ে পড়লেন মহিলা বনাধিকারিক, শিকার পরব কি চলা উচিত, বিতর্ক তুঙ্গে

আদিবাসীরা শিকার করে দলবদ্ধ ভাবে নির্দিষ্ট সময়ে। সারা বছর ধরে তারা এই শিকারের পরব চালায় না। তারা শিকারের ফসল মজুত করে না। কোনো ফসল পণ্যে পরিণত করে না। শিকার দলবদ্ধ্ব ভাবে সমান ভাগ করে খায়। এ শিকারে তারা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না। প্রাচীন অস্ত্র, তীর-ধনুক, বর্শা দিয়েই শিকার করে। আজকের শিরোনামে বন্যপ্রাণ বলতে বুনো শুয়োর, বনমুরগি, খরগোস থাকে। এই শিকারে থাকে না বড়ো কোনো পশু। এই কারণে এ পরব বা শিকার বন্ধ হলে যেটুকু ভারসাম্য আছে তা অবশ্যই নষ্ট হবে।

আদিবাসীদের শিকারে বন্যপ্রাণ যেটুকু নষ্ট হচ্ছে বলে আমরা শহুরে বাবুরা চিৎকার করছি, তার চেয়েও চোরাশিকারিদের জন্য বন্যপ্রাণ বিলীন হয়ে যাচ্ছে হাজার গুণ। যে বন্যপ্রাণের দাম বেশি সেটাই হত্যা করে চোরাশিকারিরা। এটা ভয়ংকর, অথচ এই হত্যালীলা আমাদের দেশ আটকাতে পারে না।

আদিবাসীদের অনাহার, অপুষ্টি, জলাভাব থাকা সত্ত্বেও ওরা লোভী হয়নি, ওরা লোভ কী তা জানে না। প্রকৃতি এখনও যতটুকু রক্ষিত আছে তা ওদের জন্যই আছে।

একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। ধরুন, সুন্দরবনের এই যে বাঘের সঙ্কট তার পিছনে তো এই চোরাশিকারিরা। সুন্দরবনের কোনো আদিবাসীর পরবে বাঘ শিকার করার প্রথা নেই। তা হলে কমছে কেন বাঘ! সেটা পরিষ্কার। চোরাশিকারে যে মূল ক্ষতি হয় তা হল প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের দ্বারা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হয়। আদিবাসীদের শিকার পরব কিন্তু সেই ভারসাম্যই রক্ষা করছে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্নানিগুলো একের পর এক বন ধ্বংস করে দিচ্ছে, পাহাড় গুঁড়িয়ে খনিজ উত্তোলন করছে, শহরে বড়ো বড়ো ইমারত বানাচ্ছে, স্যাটেলাইটের সাহায্যে সন্ধান করে সমুদ্র থেকে হাজার হাজার টন মাছ ও জলজ প্রাণী তুলে নিচ্ছে — এ ভাবেই পৃথিবীর ভারসাম্য সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু এ ভারসাম্য নষ্ট করার পাণ্ডা যার তাদের ছোঁয়া যায় না। কলকাতা শহরতলিতেই এত বড়ো জলাভূমি, আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত রামসার জোন, যেখানে যে কোনো নির্মাণ বেআইনি, সেখানে কী করে জলাভূমি বুজিয়ে দেওয়া হচ্ছে? নদী উবে যাচ্ছে। গঙ্গা-যমুনার যা দূষণ তাতে জলজ প্রাণীর অবস্থা সংকটে। নাম ছিল জঙ্গল মহল, সে জঙ্গল গেল কই? ভারসাম্যের আছেটা কী? আমরা কি আটকাতে পারছি!

আদিবাসীদের অনাহার, অপুষ্টি, জলাভাব থাকা সত্ত্বেও ওরা লোভী হয়নি, ওরা লোভ কী তা জানে না। প্রকৃতি এখনও যতটুকু রক্ষিত আছে তা ওদের জন্যই আছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here