nilanjan dutta
নীলাঞ্জন দত্ত

মস্ত বড়ো মার্কিন খুচরো ব্যবসায়ী ওয়ালমার্ট ভারতের জনপ্রিয় অনলাইন দোকানদার ফ্লিপকার্টের ৭৭ শতাংশ শেয়ার কিনে নিচ্ছে, এই খবর প্রচারিত হওয়ার পর বাম ও দক্ষিণ দুদিক থেকেই গেল গেল রব উঠেছে। সংঘ পরিবারভুক্ত স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ তো রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাতেই শুরু করেছে। সিপিএম পলিটব্যুরো বলেছে, এটা ভারতের বিশাল খুচরো ব্যবসাক্ষেত্রে পেছনের দরজা দিয়ে বিদেশি পুঁজি ঢোকার পথ পরিষ্কার করবে।

তা, ‘বিদেশি পুঁজি’ ঢুকতে আর কিছু বাকি আছে নাকি? এমনই ‘ভারতীয়’ এই কোম্পানি, যার হেড অফিস বেঙ্গালুরু আর রেজিস্ট্রেশন সিঙ্গাপুরে! ২০০৭ সালে এই ‘স্টার্টআপ’ বা নতুন প্রজন্মের ব্যবসা তৈরি করেছিলেন দিল্লি আইআইটির দুই প্রাক্তনী, সচিন বনসল আর বিন্নি বনসল। এরা দুজনেই আগে আরেক বিশ্বজোড়া মার্কিন খুচরো ব্যবসাদার আমাজনে কাজ করতেন। প্রথমে ফ্লিপকার্ট কেবল অনলাইনে বই বিক্রি করত। তারপর একে একে তার পণ্যসম্ভার বাড়তে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের লগ্নিপুঁজির মালিকরা এইরকম নতুন অথচ সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের জায়গা ভীষণ পছন্দ করে।

ফ্লিপকার্ট শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ৫০টারও বেশি আন্তর্জাতিক ফাটকাপুঁজির ‘ফান্ড’ এতে টাকা ঢেলেছে। তার মধ্যে আছে হংকং-এর ডিএসটি গ্লোবাল, চিনের টেনসেন্ট, আমেরিকার টাইগার গ্লোবাল, দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাসপার্স, আরও কত কী। এক সময় এর বাজারদর ১,৫০০ কোটি ডলারে উঠেছিল। এর ব্যবসার বিশেষত্ব হল, মাঝে মাঝেই একটা ‘ধামাকা’ লাগিয়ে দেওয়া, অর্থাৎ খুব কম সময়ের জন্য কিছু আকর্ষণীয় জিনিস জলের দরে বিক্রি করা হবে ঘোষণা করে দিয়ে একবারে বিপুল সংখ্যায় ক্রেতা জোগাড় করে মুনাফা করা। কিন্তু ২০১৪ সালে এর ‘বিগ বিলিয়ন সেল’ আশানুরূপ লাভ করতে না পারায় তার বাজারদর কমতে থাকে। নভেম্বর ২০১৬-য় আর্থিক মন্ত্রণাদাতা সংস্থা মর্গ্যান স্ট্যানলির মতে তা সাড়ে পাঁচশ কোটি ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে।

সেই সময় ফ্লিপকার্টের সবচেয়ে বড় অংশীদার টাইগার গ্লোবাল একটা মরিয়া চেষ্টা করেছিল, একেবারে ঝুঁটি ধরে ঝাঁকিয়ে তাকে টেনে তোলার। কর্মিরা কেউ আগে থেকে বিন্দুমাত্র আঁচ পায়নি। ৯ জানুয়ারি ২০১৭ হঠাৎ একটা নোটিস এল, বিন্নি বনসলের বদলে ফ্লিপকার্টের সিইও পদে কল্যাণ কৃষ্ণমূর্তিকে বসানো হচ্ছে। ইঙ্গিত বুঝতে পেরে প্রতিষ্ঠাতা দুই বন্ধু টাইগার গ্লোবালের হাতে পরিচালন ক্ষমতা তুলে দিতে বাধ্য হলেন। বিন্নিকে ‘গ্রুপ সিইও’ নামে একটা সাম্মানিক পদ সৃষ্টি করে সেখানে বসিয়ে দেওয়া হল। সচিন নামেমাত্র ‘এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান’ রইলেন।

টাইগারের ঝাঁপানোয় কাজ যে হল না তা নয়। ২০১৭-র এপ্রিল মাসের মধ্যেই টেনসেন্ট ঢুকলো, মাইক্রোসফট সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল আর ই-বে ফ্লিপকার্টের সঙ্গে জুড়ে গেল। এখন তো ওয়ালমার্টের সঙ্গে লেনদেন হওয়ার সময় এই কোম্পানির দাম নাকি ২,০০০ কোটি ডলার বলে হিসেব করা হয়েছিল।

মজার কথা হল, টাইগার গ্লোবাল যদিও ফ্লিপকার্টে বড় অঙ্কের পুঁজি লাগিয়ে রেখেছে, আবার তার প্রতিযোগী আমাজনেও ছোট করে হলেও লগ্নি করেছে। যেমন ফ্লিপকার্টের আরেক বিনিয়োগকারী (কম নয়, প্রায় ২০ শতাংশ) সফটব্যাঙ্ক টেনসেন্টের প্রতিযোগী চিনেরই আলিবাবার মধ্যে দিয়ে পেটিএম আর স্ন্যাপডিলেও ঢুকে বসে আছে। অথচ ফ্লিপকার্ট-এর ‘ফোন পে’ অ্যাপ (সম্প্রতি যার বিজ্ঞাপন নিশ্চয়ই কাগজে সবার চোখে পড়েছে) অবশ্যই পেটিএম-এর প্রতিদ্বন্দ্বী, আর স্ন্যাপডিল তো তারই মতো ইন্টারনেটে জিনিস বেচার কারবারই করে।

আসলে, এইরকম দুপক্ষেই গুটি সাজিয়ে রাখাটাই আজকের লগ্নিপুঁজির খেলার নিয়ম। তাতে একদিকে ঝুঁকি কমে — যেই যখন ওপরে থাকুক, সবসময়েই কিছুটা মুনাফার গ্যারান্টি থাকে। আর একদিকে, নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চালালেও লগ্নিপুঁজির বাজারটাকে চালু রাখবার ব্যাপারে এদের সবার একটা সহযোগিতাও থাকে।

এসব কথা জানে সবাই, কিন্তু বলবে না। ডানপন্থীরা যে বলবেই না, তা না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু আমাদের ‘বামপন্থী’রাও কেন যে বলে না, তা বোঝা মুস্কিল। হয়ত, তারা ক্ষমতায় এলে এই বাজারব্যবস্থাটার মধ্যেই মিলেমিশে কাজ করতে হবে, এটা জানে বলেই। যাইহোক, তারা অন্তত এই প্রশ্নটা তুললেও তো পারে, যে এই ‘উন্নত’ মার্কিন বহুজাতিকের কল্যাণে একটা ‘ভারতীয়’ স্টার্টআপ কোম্পানির শ্রমিকদের কপাল একটুও ফিরবে কি?

একটু মনে করিয়ে দিই, ২০১৫র জুলাই মাসে মুম্বইতে ফ্লিপকার্ট ও তার শাখা ‘মিন্ত্রা’র প্রায় ৪০০ ‘ডেলিভারি বয়’ ধর্মঘট করেছিল। এই ধর্মঘট খুব একটা সফল হয়নি, কারণ একমাত্র মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা প্রভাবিত কামগর সেনা ছাড়া কোনও বড় ইউনিয়ন বা পার্টি তাদের পাশে দাঁড়ায়নি, বামপন্থীরাও না। কিন্তু এই ধর্মঘট ফ্লিপকার্টের মতো এক ‘নতুন যুগের কোম্পানি’র শ্রমিকদের শোচনীয় অবস্থাকে সামনে এনেছিল।

আন্দোলনকারী ডেলিভারি বয়রা জানিয়েছিলেন, তাঁদের কোনও কাজের সময়ের কোনো ঠিক নেই, কাজের জায়গায় টয়লেট পর্যন্ত ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না এবং ইএসআই-এর সুবিধাও নেই। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই মোটরবাইকে চেপে ডেলিভারি করতে বেরোন এবং তাড়াতাড়ি চালাতে গিয়ে রাস্তায় মাঝে মাঝে দুর্ঘটনাও ঘটে, কিন্তু কোম্পানি তার জন্য চিকিৎসা বা অন্য কোনও দায়িত্ব নেয় না। কামগর সেনার সেক্রেটারি সচিন গোলে বলেছিলেন, কেবল ফ্লিপকার্ট আর মিন্ত্রা নয়, সমস্ত ‘ই-কমার্স রিটেইলার’ কোম্পানিতেই এই একই চিত্র।

ওয়ালমার্ট এলে কি এই চিত্রটা অন্যরকম হবে? সে আশা না করাই ভাল, কারণ খোদ আমেরিকাতেই এই বিশাল কোম্পানিটির বিরুদ্ধে তার শ্রমিকদের একগাদা অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ সালে তারা দুবার ধর্মঘট করতে বাধ্য হয়, প্রথমে দক্ষিণ ক্যালিফর্নিয়ায়, তারপর ইলিনয়ে। তাদের সমর্থনে ৩৭,০০০ মানুষের সই করা এক দাবিপত্র শিকাগোয় ওয়ালমার্টের করপোরেট দপ্তরে জমা পড়ে। ওয়ালমার্টের কনট্র্যাক্টর রোডলিংক-এর শ্রমিকরা ফেডারেল কোর্টে একটি মামলাও দায়ের করে। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে বেশি সময় কাজ করিয়ে কম সময়ের মজুরী দেওয়া, ওভারটাইম না দেওয়া, এমনকি ন্যুনতম মজুরি পর্যন্ত না দেওয়া। তবে একটাই ভরসা। ওয়ালমার্ট এলে ওয়ালমার্চও আসতে পারে।

ওয়ালমার্চ আবার কী? সে এক আশ্চর্য মিছিল – অনেকটা আমাদের মহারাষ্ট্রের কৃষকরা কিছুদিন আগে যেমন করেছিল। ওয়ালমার্টের হাজার হাজার ওয়্যারহাউস মজদুর – এমনকি যারা অমানুষিক পরিবেশে কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়ে অথবা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বসে যেতে বাধ্য হয়েছে তারাও – আর তাদের সমর্থকরা ৫০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে লস এঞ্জেলেস-এ এসে জানিয়ে গেছে তাদের ক্ষোভ, তাদের দাবি।

একতার জোরে এমন দুর্দান্ত করপোরেটকেও হার স্বীকার করিয়েছে শ্রমিকরা। আন্দোলনের জেরে ওয়ালমার্টের সাপ্লায়ার সিজে’স সিফুড কোম্পানি বাধ্য হয়েছে আটজন ছাঁটাই হওয়া বিদেশি শ্রমিককে ফেরত নিতে আর বকেয়া মজুরি ও ক্ষতিপূরণ দিতে। তারা মার্কিন নাগরিক না হওয়া সত্ত্বেও।

ভয়ের কী আছে? এখানেও ওয়ালমার্ট আসুক। ওয়ালমার্চও আসুক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here