yechury and karat
দেবারুণ রায়

সিপিএমের ইতিহাসে এই প্রথম সংখ্যালঘু লাইনের প্রবক্তা নিজের অবস্থান অটুট রেখে দলের সাধারণ সম্পাদকপদে নির্বাচিত হলেন। এবং কার্যত পায়ের তলার মাটি হারাতে হল সংখ্যাগরিষ্ঠ কট্টরপন্থীদের নেতা প্রকাশ কারাটকে। যে রাজনৈতিক লাইন প্রতিষ্ঠা পেল হায়দরাবাদের ২২তম পার্টি কংগ্রেসে, তার সঙ্গে কিন্তু সিপিএমের আজন্ম অনুসৃত রণকৌশলের কোনো সংঘাত নেই। বরং বলা চলে, প্রথাগত লাইনই স্বীকৃতি পেল নতুন করে।

ষাট, সত্তর বা আশির দশকের কট্টর কংগ্রেসবিরোধী সিপিএম নেতারাও সর্বভারতীয় রাজনীতির দিশা নিরূপণের ক্ষেত্রে অন্ধ কংগ্রেস বিরোধিতা আঁকড়ে থাকেননি। পি সুন্দরাইয়ার জমানায় ’৬৭-তে কংগ্রেসের ভেতর ‘প্রগতিশীল’ হিসাবে চিহ্নিত ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকার টিকিয়ে রাখতে লোকসভায় অনুকূল রণনীতি নিয়েছিল সিপিএম সংসদীয় দল। ’৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরার ভূমিকার সমর্থনেও অগ্রণী ছিল সিপিএম। কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হওয়ার ক্ষত তখনও যথেষ্টই দগদগে। সে সময় এস এ ডাঙ্গের লাইনে ইন্দিরাকে সমর্থনে মুক্তকচ্ছ তো ছিলই সিপিআই। কিন্তু জ্ঞাতিশত্রুতার প্রভাব সিপিএমের কর্মসূচিতে আগাগোড়া জ্বলজ্বল করলেও মূল প্রশ্নে তাদের বিরোধ ছিল না সিপিআইয়ের সঙ্গে। বিরোধ প্রকট হল আরও এক বছর পরে। তবে দুই কমিউনিস্ট পার্টিরই রাজ্য ও সর্বভারতীয় রণনীতিতে কিছুটা তফাত ছিল ’৬৭ থেকে ’৭১ পর্যন্ত। কারণ বাংলায় দীর্ঘ ২০ বছরের কংগ্রেস জমানার অবসান ঘটিয়ে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে ’৬৭-তেই। এ বার সেই সরকার ফেলার খেলায় ইন্দিরার পরের পর ‘৩৫৬’ রাজ্যে সিপিএমকে পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে সাহায্য করে। যুক্তফ্রন্টের নানা পরীক্ষানিরীক্ষায় অপেক্ষাকৃত ছোটো শরিক হিসাবে শামিল ছিল সিপিআই। এবং ফ্রন্টের নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে আসা বাংলা কংগ্রেসের নেতা অজয় মুখোপাধ্যায়। তাঁর ভাই বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন সিপিআইয়ের শীর্ষ নেতাদের অন্যতম ও যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী। সেই সময়েই রাজনীতিতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের উত্থান, বাংলা কংগ্রেসেই। ওই প্রথম বাম জমানার রাজ্যসভা সদস্য হিসেবে তাঁর দিল্লিতে পদার্পণ।

public meeting on the occasion of 22nd party congress of cpm
পার্টি কংগ্রেস উপলক্ষে প্রকাশ্য জনসভা।

বাহাত্তরে অতীত মুছে ফেলে গরিষ্ঠ ডাঙ্গেপন্থীরাই সিদ্ধার্থশংকরের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে যেতে বাধ্য করে রাজ্য সিপিআইকে। ওই ভোটই বাংলায় প্রথম রিগিংয়ে কলঙ্কিত হয়। বরানগরে কংগ্রেস সমর্থিত সিপিআই প্রার্থী শিবদাস ভট্টাচার্যের কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান জ্যোতি বসু। যদিও ভোটের দিন ছাপ্পা ভোটের বোলবোলা দেখে বেলা বারোটাতেই সাংবাদিক বৈঠক ডেকে জ্যোতিবাবু ঘোষণা করেছিলেন সারা রাজ্যেই কারচুপির ভোট হচ্ছে – “ইলেকশন ইজ রিগড্‌”। সুতরাং পরিণাম কী হবে জানাই ছিল। এর পর সিপিএম পুরো পাঁচ বছরই বিধানসভা বয়কট করে। বামেদের মধ্যে শুধু আরএসপি যোগ দেয় বিধানসভায়। আর সিপিআই কংগ্রেসের সঙ্গেই থাকে।

আরও পড়ুন: কোথায় বাংলার মা-মাটি-মানুষ?

তার পর জয়প্রকাশের জনজাগরণের ডাক ও জরুরি অবস্থা। এই সময় সিপিএমের কংগ্রেস বিরোধিতার লাইন তীব্র হয়। জয়প্রকাশের হাত ধরেই জ্যোতি বসু সিপিএমকে কার্যত বন্ধ্যাদশা থেকে মুক্ত করেন। কেন্দ্রে প্রথম অকংগ্রেসি সরকারের নান্দীমুখের সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যে বামফ্রন্টের উত্থান ’৭৭-এ। যদিও ’৭৯-তে সিপিএম সমর্থিত সেই মোরারজি সরকারের পতনের সময় বাংলায় জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত পলিটব্যুরোয় সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন। মোরারজি সরকারকে সমর্থন দেওয়ার প্রশ্নে তাঁরা দু’ জন ভোট দিলেও ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ-সহ তাবৎ শীর্ষ নেতারা, এমনকি বাংলার সমর মুখোপাধ্যায়ও, সরকার ফেলার পক্ষে ভোট দেন। সিপিএমের গরিষ্ঠ অংশের সিদ্ধান্তের সুবাদেই কেন্দ্রে ফিরে আসেন ইন্দিরা। যদিও ’৮০-এর দশকে বিরল যে ক’টি রাজ্যে হার মেনেছিল কংগ্রেস, তার অন্যতম ছিল বাংলা।

basu, yechury and surjit’৮০-তেই বিজেপির জন্ম। এবং বিজেপির সেই অঙ্কুর দশাতেই মূল শত্রুর ব্র্যাকেটে রাখতে দলে সরব হন ইএমএস। সারা দেশের মধ্যে প্রথম কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী। তাঁরই মন্ত্রশিষ্য প্রকাশ কারাট দীর্ঘদিন দলের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে। কিন্তু ’৮৯-এর রাষ্ট্রীয় মোর্চা সরকারের বিদায়ের (’৯০-এ) পর থেকেই অযোধ্যার রামমন্দিরকে সামনে রেখে সিপিএম রণনীতি বদলায়। বাংলা, কেরল, ত্রিপুরায় কংগ্রেস বিরোধিতা তীব্র রেখেই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপিকে রুখতে কংগ্রেসের সঙ্গে অদৃশ্য সমঝোতা করে। ’৯১-তে রাও জমানায় কেন্দ্রের সংখ্যালঘু কংগ্রেস সরকারকে বাঁচিয়ে দেয় সিপিএম। ’৯৬-তে কংগ্রেসের সমর্থনে যুক্তফ্রন্ট সরকার গড়ার সময় সিপিএমের জ্যোতি বসু ও হরকিষেন সিং সুরজিৎ ছিলেন মূল কারিগর। রাওকে যেমন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনুরোধ নিয়ে ’৯১-তে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন কট্টর কংগ্রেস-বিরোধী নেতা ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ, তেমনই প্রথমে রাও ও পরে সীতারাম কেশরীকে দিয়ে যুক্তফ্রন্টকে সমর্থন করানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেন সুরজিৎ ও জ্যোতিবাবু। যুক্তফ্রন্টের বিদায়ের পর কেন্দ্রে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শামিল হলে সিপিএম-কংগ্রেস ঘনিষ্ঠতার পথ আরও প্রশস্ত হয়।

২০০৪ পর্যন্ত অটল-জমানায় এই রাজনীতি আরও ভিত্তি পায় সিপিএমে। এবং ২০০৪-এ ৬০ জন বাম এমপির সমর্থনে কেন্দ্রে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। এই সময়ে ইউপিএ-র নামকরণ থেকে গঠন ও আঞ্চলিক দলগুলিকে শামিল করার প্রক্রিয়ার নেতা ছিলেন বসু ও সুরজিৎ। এই জমানারই যুক্তিযুক্ত পরিণতি ছিল স্পিকারের পদে প্রথম কমিউনিস্ট সাংসদের নির্বাচন। সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে স্পিকার করার সময়েও চুলচেরা বিশ্লেষণের কামাই ছিল না সিপিএমে। এবং অনিল-বিমানকে, এমনকি সীতারাম ইয়েচুরিকে সঙ্গে নিয়ে যে প্রকাশ কারাট প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দোরগোড়ায় আটকে ছিলেন জ্যোতি বসুকে, তাঁকেই সোমনাথের স্পিকার হওয়ার প্রস্তাব গিলতে হয় বাধ্য হয়ে। বসু ও সুরজিৎ আগাগোড়া দলের সংখ্যালঘু লাইনের নেতা তখন। এবং তখনও প্রকাশ কারাট সংখ্যাগরিষ্ঠ কট্টরপন্থীদের শীর্ষে।

’৯৬-এর পর ২০০৪-এর মধ্যেই অবশ্য দলের শীর্ষে কেউ কেউ অবস্থান বদলেছেন, যাঁদের মধ্যে অবশ্যই উল্লেখ্য ইয়েচুরি। ২০০৮-এ পরমাণু চুক্তির অনড় ইস্যুতে মনমোহনের মরিয়া অবস্থানকে সামনে রেখে ফের কংগ্রেস-বিরোধিতা মাথা তুলল সিপিএমে। কারাটই তখন সাধারণ সম্পাদক। এবং সেই থেকেই তৃণমূলকে জমি ছেড়ে দেওয়া শুরু সিপিএমের। কেন্দ্রের শাসক ছেড়ে বেরোল তারা। শূন্যস্থান পূরণ করলেন বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে আসা মমতা। ২০০৯-এ বাংলায় সিপিএমের পাশা পালটে দিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় ফিরল কংগ্রেস, মমতার সমর্থনে। বাংলার সংখ্যালঘু সমর্থনে ধসের ষোলোকলা পূর্ণ হল। এগারোয় মমতার পূর্ণিমা এল বুদ্ধদেবের ঘোর অমাবস্যা সুনিশ্চিত করে। দলকে অর্থহীন করে তোলার নেশায় চুর কট্টরপন্থীরা ত্রিপুরার মানিককেও হারিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত কেরল দিয়ে ভাঙন আটকাতে ব্যর্থ কারাটকে ২২তম কংগ্রেসে পিছু হটতেই হল। বসুর পথে দলের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে জয়ী হলেন ইয়েচুরি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here