arunava ghosh

রাজনীতি এখন জীবিকা-কেন্দ্রিক। অতীতে, মূলত সাতের দশকে যে ছাত্ররা কলেজ রাজনীতিতে যোগ দিতেন তাঁরা স্বপ্ন দেখতেন ‘হো-চি-মিন হব। অথবা নিদেনপক্ষে প্রমোদ দাশগুপ্ত, চারু মজুমদার বা প্রফুল্ল সেনের মতো জীবনযাপন করব’। যেখানে উচ্চচিন্তা অথচ সাধারণ জীবন। এটাই ছিল জীবনের লক্ষ্য। যার জন্য রাজনৈতিক ছাত্ররা নিজেদের পড়াশোনার বাইরেও সাধারণ সাহিত্য থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সাহিত্যকে নিজেদের নখদর্পণে আনার চেষ্টা করতেন।

এখন যেটা হয়েছে, রাজনীতিতে পড়াশোনার তেমন কোনো ব্যাপার নেই। শাসকের দলে নাম লেখাতে পারলে অথবা শাসকের সুনজরে থাকতে পারলে কলেজজীবন থেকে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা’ উপভোগ করা যায়, যেখানে ক্ষমতাই শেষ কথা এবং ‘চুরিচামারি’ কোনো লজ্জাজনক বা বিবেকের বিষয় নয়। তাই এখন যে কোনো শাসক দলেই দেখা যায় কলেজ থেকেই পয়সা রোজগারের চেষ্টা চলছে দুর্নীতির মাধ্যমে। এই ছাত্ররাই যখন পরবর্তীকালে সমাজের বিভিন্ন পদে বিনা মেধায় শুধু দলীয় সহায়তায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন তখনই হয় সমাজের বিপদ। এঁদের কাছে জীবনের স্লোগান হয়- ‘শাসকের ঝান্ডা, আমার ধান্ধা’। ফলে শাসকদলের তকমাধারী এই বুদ্ধিজীবীদের পয়সার জোর অথবা রাজশক্তির জোরে আনুগত্যের বহির্প্রকাশ ঘটে।

এই বুদ্ধিজীবী জগতের একটি বিশেষ অংশ দখল করে আছে সংবাদ মাধ্যম। আগে সংবাদপত্র চলত কাগজ বিক্রির টাকার উপর নির্ভর করে। সাধারণ মানুষ, যাঁরা দৈনন্দিন জীবনে নিজের এলাকায় ‘সরকারি সন্ত্রাস বা দুর্নীতি’র দ্বারা আক্রান্ত, তাঁদের কাছে প্রতিবাদী সংবাদপত্র হয়ে উঠত একটি সান্ত্বনার জায়গা এবং সেখান থেকে জন্ম নিত পড়াশোনা করা মানুষের প্রতিবাদের বহির্প্রকাশ।

বর্তমানে সংবাদ মাধ্যম নির্ভরশীল বিজ্ঞাপন বাবদ আয়ের উপর। যে আয়ের ৮০ শতাংশ আসে সরকার অথবা সরকারের উপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। সুতরাং কাগজ চালাতে সরকারের বদান্যতার উপর নির্ভর করতে হয় সংবাদপত্রের মালিককে। মালিকের কাগজ চালানোর বাধ্যবাধকতা হরণ করে নেয় ব্যক্তি সাংবাদিকের স্বাধীনতাকেও। ফলে বেশির ভাগ সংবাদ মাধ্যমকে হতে হয় সরকারের চাটুকার। যেমন যে সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলি দিল্লিতে অবস্থিত তারা কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখপত্র হয়ে ওঠে। অন্য দিকে রাজ্য-কেন্দ্রিক সংবাদ মাধ্যমগুলি হয়ে যায় রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা শাসক দলের মুখপত্র।

যেমন দিল্লির সংবাদ মাধ্যমগুলি হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখপত্র, একই ভাবে রাজ্যের সংবাদপত্রগুলিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আনুগত্য দেখাতে পারলেই বেঁচেবর্তে যায়। পশ্চিমবঙ্গের কাগজগুলি খুললেই বোঝা যায় এর সত্যতা। নিকট অতীতে আজ পর্যন্ত রাজ্যের প্রথম শ্রেণির কোনো সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয়তে আমার চোখে পড়েনি মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনামূলক কোনো লেখা।

মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে এমন কোনো সাংবাদিককে পাঠানো হয় না, যাঁর প্রশ্ন সংবাদপত্রটিকে মুখ্যমন্ত্রীর অপ্রীতিভাজন করে তুলতে পারে। এতে ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, মমতার কোনো দোষ নেই। কিন্তু এটা সংবাদ মাধ্যমের একটা অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক ভাবে বেঁচে থাকা বুদ্ধিজীবীদেরও একই অবস্থা। অনেকেই সরকারি ভাবে ‘এঁটো-কাঁটা’ খেয়ে বেঁচে আছেন। তাঁদের পক্ষে পেটের তাগিদে সরকারের বিরোধিতা করা সম্ভব নয়। আর বাকিদের অবস্থা হল ‘এমন কিছু করব না, যাতে আমাকে সরকারের রোষে পড়তে হয়’। এর কারণ হল সরকারি বদান্যতার উপর নির্ভরশীলতা।

বিজেপির নেতা অমিত শাহ কলকাতায় এসেছিলেন। বুদ্ধির বিচার করলে যাঁরা স্বাধীন চিন্তাবিদ, তাঁদের নরেন্দ্র মোদীর কাছ থেকে আর কিছু পাওয়ার নেই। ফলে তাঁরা কেন যাবেন অমিত শাহের সভায়? সেখানে আবার অমিতের বক্তৃতায় চিন্তাশীলতার থেকে পেশিশক্তির ছাপ বেশি। এ ছাড়া বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ধর্মান্ধতার ছাপ যাতে না পড়ে সে দিকেই একটা ছুঁৎমার্গ আছে। যদিও ব্যক্তিগত জীবনে বৈঠকখানায় বসে ধর্মান্ধতার বহির্প্রকাশ তাঁদের অনেকেই মাঝে মাঝে করে থাকেন। সুতরাং অমিত শাহকে দেখে তাঁর বক্তৃতা শুনতে যাবেন না। পশ্চিমবঙ্গের বুকে বিজেপির ক্ষমতায় না থাকার জন্য ধান্ধাবাজি করেও কোনো লাভ হবে না। তবে কোনো কারণে সেই সুযোগ এলে ওই বুদ্ধিজীবীরাই বিজেপির সমর্থনে এগিয়ে আসবেন। যেমন, সিপিএম ক্ষমতায় থাকার সময় যে সব শিল্পী-সাহিত্যিক ধান্ধার উপর নির্ভর করে চলতেন তাঁদের অনেকেই আজ তৃণমূলে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here