মৃণাল মাহাত

ডিসেম্বর মাস পড়তে না পড়তেই শীতবিলাসীদের শীত উদযাপন শুরু হয়ে যায়। খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু বিভিন্ন মেলাপার্বণ আলাদা বৈচিত্র্য দিয়েছে শীতকালকে। এ সবের মধ্যে সব চেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট হল চড়ুইভাতি বা পিকনিক। পিকনিক আর শীতকাল যেন সমার্থক হয়ে গিয়েছে।সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, ড্যাম সম্ভব না হলেও, নিদেন পক্ষে পাড়ার পুকুর, ছোটো নদীটা হয়ে ওঠে পিকনিকের গন্তব্য।

এই নিবন্ধে কিন্তু আমরা অন্য ধরনের এক পিকনিকের গল্প শোনাব, যা জঙ্গলমহলের প্রাচীন সংস্কৃতি। পিকনিকের ধারণা আসার বহু আগে থেকেই এই প্রথা চলে আসছে জঙ্গলমহলের গ্রামগুলিতে। আপাতদৃষ্টিতে পিকনিক বা বনভোজন মনে হলেও, চেনা পিকনিকের সঙ্গে একটা বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, এই বনভুজিতে কোনো রকম চাঁদা তোলা হয় না। গ্রামের যে যার সাধ্যমতো নিজের থেকে আয়োজন করেন। দ্বিতীয়ত, যে কোনো ধরনের নেশা এখানে একেবারেই নিষিদ্ধ। মাইক বা অন্য কোনো সাউন্ড সিস্টেম এখানে ব্যবহার করা হয় না। মহিলারা সব শেষে সন্ধের সময় বাড়ি ফেরার আগে নিজেরাই ঝুমুর গান গেয়ে নাচ করেন। তৃতীয়ত, এই পিকনিকের সঙ্গে একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ জড়িত। যে দিন বনভুজিতে যান মহিলারা, সে দিন ওই গ্রাম বা পাড়ার প্রতিটি বাড়ি গোবরজল দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। বাড়িতে আর উনুন জ্বলে না সে দিন।

হাঁড়ি-কড়া, চাল-ডাল, সব বনভুজির নির্ধারিত জায়গায় বয়ে নিয়ে আসা হয়। শুদ্ধবস্ত্রে উপবাসে থেকে অস্থায়ী উনুনে আগুন জ্বালান মহিলারা। রান্না শেষ হলে সব ক’টি পদ বনদেবীর নামে আগে সমর্পণ করা হয়, তার পর বাড়ির সবাই খাওয়াদাওয়া করেন। যার যা রান্না হয় উপস্থিত সকলের মধ্যে তা পরিবেশন করা হয়।বাড়তি খাবার আর বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয় না।

মনে করা হয়, বনভোজন থেকে বনভুজি কথাটা এসেছে। যদিও এর প্রাচীন নাম ডিবুভাত। অতীতের অরণ্যচারী জীবনকে স্মরণ করার জন্য আদিবাসী কুরমিরা একটা দিনের জন্য ঘরসংসারকে তুলে আনেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে। স্মরণ করেন অতীতের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন। এই বনভুজি অনুষ্ঠানে মহিলাদের হাতে থাকে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব। মূলত পয়লা মাঘ থেকে শুরু হয়ে এক মাস ধরে ডিবুভাত করা যায়। তবে পুরুলিয়ার কোথাও কোথাও পৌষ মাসেও করা হয়। যে কোনো মঙ্গলবার বা শনিবার দেখে বনভুজি বা ডিবুভাতের দিন ঠিক করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যার আগে বাড়ি আসা যাবে না। কথিত আছে, শেয়ালের  ডাক না শুনলে বাড়ি ফেরা নিষিদ্ধ। বনভুজির জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় পাহাড় বা ডুংরির ঢাল, জঙ্গলের ধার, ফাঁকা মাঠ, নদীর ধার বা শাল-পলাশ বন।

বনভুজির পেছনে যা কিছুই কিংবদন্তি থাক না কেন, মূল উদ্দেশ্য হল নির্মল আনন্দ। সংসারের একঘেয়েমি থেকে একটা দিন একটু অন্য ভাবে কাটানো। তাই তো, পিকনিকের দাপটেও এখনও স্বমহিমায় জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের বনভুজি।

ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here