Naredra-Modi-and-Rahul-Gand
নরেন্দ্র মোদী, রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়ঙ্কা গান্ধী। প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
jayanta mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

আমেরিকার ডোনাল্ড থেকে ইভাঙ্কা ট্রাম্প, প্রতিবেশী বাংলাদেশের শেখ হাসিনা হোন বা তারেক রহমান, পরিবারতন্ত্রের ছোঁয়াচ রয়েছে সর্বত্রই। এই ক’দিন আগে রাজীব-সোনিয়া তনয়া প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ায় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নিয়ে সব থেকে বেশি ভাবিত হয়ে পড়েছে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি। কিন্তু গেরুয়া শিবিরের এই ভাবনাই কংগ্রেসকে খুচরো রাজনৈতিক ফয়দা তুলতে সব থেকে বেশি সাহায্য করছে।

প্রিয়ঙ্কার জেল্লা

নরেন্দ্র মোদী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই কংগ্রেস-বিরোধী দলগুলি দেশের প্রাচীনতম জাতীয়তাবাদী দলটির বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্র কায়েমের অভিযোগ তুলে এসেছে। এখন তো তিনি প্রধানমন্ত্রী। স্বাভাবিক ভাবে সংসদে বাজেট অধিবেশনের জবাবি ভাষণেও তাঁকে টেনে নিয়ে আসতে হয় সেই পরিবারতন্ত্রের কথাই। দিতে হয় বিসি (বিফোর কংগ্রেস) আর এডি (আফটার ডায়ন্যাস্টি) নিয়ে নতুন ব্যাখ্যাও। এটাকে যে তিনি তাঁর নিজের স্বভাবসিদ্ধ কটাক্ষ-তালিকার অংশবিশেষে পরিণত করেছেন, সেটা ২০১৭ সালে জাতীয় কংগ্রেস সভাপতির ব্যাটন রাহুল গান্ধীর হাতে ওঠার পর বেশ স্পষ্ট হয়েছিল। সে সময় তিনি যে কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন, তা বেশ ভালো ভাবেই বোঝা গিয়েছিল।

ফের পাচ্ছেন। পাচ্ছেন প্রিয়ঙ্কা সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে বিজেপির স্বস্তির জায়গা উত্তরপ্রদেশে অস্বস্তি বাড়ানোর জন্য। তবে হ্যাঁ, মোদী নিজে প্রিয়ঙ্কার নাম ধরে খুব বেশি আক্রমণ শানাননি। কারণ, তাতে প্রিয়ঙ্কা অ্যাডভান্টেজ পেয়ে যেতে পারেন। তাই বলে তাঁর সতীর্থ থেকে অধস্তনরা কিন্তু ক্ষান্ত দিচ্ছেন না। সমানে প্রিয়ঙ্কার বিরুদ্ধে একের পর মন্তব্য, কু-মন্তব্য করে যাচ্ছেন। অন্য দিকে মোদী পরিশীলিত ভাবে কংগ্রেসের পরিবারতন্ত্র নিয়ে বিষোদ্গার করে যাচ্ছেন। এতে আদতে কী হচ্ছে?

সম্প্রতি একটি রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, গত এক বছরে যেমন সব থেকে রাজনৈতিক অনুদান পেয়েছে বিজেপি, তেমনই গত ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে প্রচারে সব থেকে বেশি টাকা ঢেলেছিল তারাই। ফলে এ বারও ঢালাঢালির ব্যাপারে হিমশিম-গাজর-বিন খেয়েও কংগ্রেসের পক্ষে বিজেপির আশেপাশে পৌঁছোনো অসম্ভবই রয়ে যেতে পারে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়েই চলে আসে খুচরো রাজনৈতিক ফয়দার কথা। রাহুল সে অর্থে লাইমলাইটে থাকতে পছন্দ করেন না। নিতান্তই ইস্যুভিত্তিক সাংবাদিক বৈঠকেই তিনি সীমাবদ্ধ। কিন্তু ভোটের আগে বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের বহুবিধ অনুষ্ঠানে ঝলমল করতে চলেছে প্রিয়ঙ্কার মুখ। তাঁর ঠাকুরমা-বাবা-মায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তো ছিলই, তার সঙ্গেই জুড়ে গিয়েছে বিজেপির প্রতিকূল প্রচার। যা তাঁকে বাড়তি মাইলেজ দেবে, টিআরপি দেবে টেলিভিশন চ্যানেলকেও।

মোদীর থেকে টুইটারে অনেকটাই পিছনে রাহুল গান্ধী। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে রোড শোয়ের আগেই কংগ্রেস শিবিরে জুড়ে গেল আরও একটা জেল্লাদার টুইটার হ্যান্ডেল। সেটি খুললেন প্রিয়ঙ্কা। অনুগামীর সংখ্যাও ঝড়ের গতিতে বাড়ছে সেখানে। ঠিক যে ভাবে সোমবার লখনউয়ে প্রিয়ঙ্কার রোড শো ঢল নেমেছে মানুষের। যা দেখে অস্থির বিজেপি নেতা বিনয় কাটিয়ারকে বলতে হচ্ছে, উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসের শ্মশানভূমি। কেউ আসবেন, লোকে দেখবে। তিনি চলেও যাবেন। মানুষ ভুলে যাবে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি দেখে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, বিজেপি নেতত্ব ইদানীং মানুষের মন-রিডিংয়ে ততটা সফল হতে পারছেন না। ফলে প্রিয়ঙ্কাকে মানুষ ভুলে যাবে, না কি তুলে রাখবে, সেটা সময়ই বলবে।

মহাজোটের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী!

এ তো গেল প্রিয়ঙ্কা-পর্ব। এর পরেই চলে আসে মহাজোট আর মহাভেজালের দ্বৈরথ। এক দিকে বিরোধীদের মহাজোট অন্য দিকে মোদীর মস্তিষ্কপ্রসূত মহাভেজাল। এ দিকে কংগ্রেসকে মধ্যমণি রেখে মহাজোট অন্য দিকে কংগ্রেসকে পাশে পাওয়ার মহাজোট। সবেই কংগ্রেস। সারা দেশে জুড়েই ঝোলে-ঝালে-অম্বলে সেই কংগ্রেস। পরিবারতন্ত্রের দোহাই দিয়ে আপাতত কংগ্রেসকে অস্পৃশ্য করে রাখছে না কোনো বিরোধী দলই। এমনকি উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ যাদব-মায়াবতী কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে জোট ঘোষণার পরেও, বাংলায় প্রদেশ কংগ্রেস তৃণমূলের বিরুদ্ধে চরমবার্তা দেওয়ার পরেও, মঞ্চ ভাগ করছেন রাহুল গান্ধী।

সেই মহাজোটের ফরমুলা প্রয়োগ করতে গিয়েও চলে আসছে প্রিয়ঙ্কার নাম। কংগ্রেস যখন কেন্দ্র থেকে বিজেপিকে হঠাতে দেশের সমস্ত দলের সহযোগিতা চাইছে, তখন নিজের ঘরে মজুত ‘বারুদ’ কেন ব্যবহার করবে না? এখনও স্থির নয়, প্রিয়ঙ্কা লোকসভায় কোনো কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না? কিন্তু মধ্যে থাকা ঠাকুরমার অস্তিত্বকে প্রচারের কাজে লাগালে হিত ব্যতীত বিপরীত হওয়ার কোনো শঙ্কা নেই।

মহাজোটের ডাক কংগ্রেসের তরফে পৌঁছে গিয়েছে দেশের প্রায় সমস্ত বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলের কাছে। কেউ তাতে সাড়া দিয়েছে প্রত্যক্ষ ভাবে, কেউ-বা পরোক্ষে। কিন্তু দু’বছর আগের নোটবন্দির মতো জোরালো ইস্যুর পর বিরোধীদের হাতে তেমন কিছু ছিল না। জোগান দিয়েছে কংগ্রেস। কী ভাবে রাফালের মতো হাইপ্রোফাইল ইস্যুকে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে পৌঁছে দেওয়া যায় সেটাই করে দেখিয়েছে কংগ্রেস।

এত সহজে বিজেপির বিরুদ্ধে এই ইস্যুকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসতে রাহুলকে সর্বতো ভাবে সাহায্য করেছে অন্য বিরোধী দলগুলিও। যার ফলস্বরূপ রাফাল এখন সর্বজনীন। বিনিময়ে কংগ্রেসকেও ছোটোখাটো ত্যাগের দৃষ্টান্ত রাখতে হয়েছে। রাহুল নিজে না এলেও মমতার ‘ঐক্যবদ্ধ ভারতে’ কংগ্রেসের প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন প্রদেশ নেতাদের চরম আপত্তি সত্ত্বেও। আবার অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘ দিনের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা চাওয়ার দাবিতে দিল্লির ধরনাতেও যোগ দিতে হয়েছে রাহুলকে। কোনট বেশি ওজনদার আর কোনটা হালকা- সেই বাছবিচার করতে যাচ্ছেন না রাহুল।

ফল হিসাবে এখানেও হাতেনাতে মিলছে সেই খুচরো রাজনৈতিক ফয়দা। আর কিছু না হোক, একই মঞ্চে একাধিক হেভিওয়েট নেতার উপস্থিতি মিডিয়ার মারফত পাবলিকের কাছে বাড়তি মাইলেজ আদায় করে নিচ্ছে অনায়াসেই। বিশেষ করে ‘বিরুদ্ধ’ হলেও মোদীই যখন মহাজোটের জোর প্রচারে নেমেছেন!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here